সোমবার, ২১ জুন ২০২১
logo
মেসিও কি ঝরে যাবেন!
প্রকাশ : ১২ জুলাই, ২০১৫ ১১:২২:৫৭
প্রিন্টঅ-অ+
ক্রীড়া ওয়েব

কোপা আমেরিকার সেরা ফুটবলারের পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেছেন মেসি। সত্যিই তো, তার দল যখন ব্যর্থ। তখন কিভাবে অধিনায়ক নিজে সেরার পুরস্কার নিতে পারেন! প্রথমে বিশ্বকাপ, তারপর কোপা আমেরিকা। একবছরের ব্যবধানে দুটি বড় প্রতিযোগিতা। খেতাবের এত কাছে গিয়েও ফিরে এসেছেন। একটুর জন্য আর্জেন্টিনা ট্রফি ফসকেছে। তাই প্রথমবার ব্রাজিলের মঞ্চে সোনার বল হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বার! আয়োজকদের সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মেসির এই মহানুভবতা তার সতীর্থ, দেশবাসীকে ছুঁয়ে যাবে নিশ্চয়। ইতিহাস তবু অপূর্ণই থেকে যাবে। ব্যক্তি ফুটবলার মেসিকে নিয়ে সবাই ধন্য ধন্য করবেন। বার্সেলোনার মেসি সবার বাহবা কুড়োবেন। কিন্তু দেশের জন্য! প্রতিযোগিতা শুরুর সময়েই অদম্য একটা ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। ‘একবার অন্তত দেশের জার্সি পরে একটা ট্রফি জিততে চাই।’ সেই সাধ অপূর্ণই থেকে যাচ্ছে। মধ্যগগনে মেসির নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। ফুটবলের সেরা সময়ে ক্লাবকে একের পর এক ট্রফি উপহার দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হয়ে একটি সাফল্যের মুখও দেখলেন না। ফুটবল বসন্ত ঘুরে গিয়ে আবার শীতের রুক্ষতা ফিরে আসে। শ্রেষ্ঠ সময় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। প্রতিভা ঝরে যায় ক্ষণিকে। মেসির পরিণতিও কি তাই হবে! মেসি যে মহান ফুটবলার তা নিয়ে মতভেদ থাকার কথা নয়। কিন্তু কিংবদন্তিদের পঙক্তিতে বসানো যায় কিনা তা নিয়েই তর্ক চলতে পারে। আবার মেসি তো এই তালিকায় একা নন। ক্লাব ফুটবলে শীর্ষ ছুঁয়েছেন এমন ফুটবলারও কম নন। তারা কেউই হয়তো দেশের জন্য ট্রফি জিততে পারেননি। তবুও তাকে মনে রেখেছে ফুটবল বিশ্ব। সেরাদের তালিকায় তারাও এসে পড়েন অহরহ। সেরকমই কয়েকজন :
যোহান ক্রুয়েফ, নেদারল্যান্ডস (১৯৬৬-৭৭: ৪৮ম্যাচ, ৩৩ গোল)
যোহান ক্রুয়েফ কিংবদন্তি। তাকে যতটা বার্সেলোনার তিকিতাকা ফুটবল শৈলীর জন্য মনে রাখা হয়, ততটা বোধ হয় দেশের জন্য নয়। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডকে বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেলেও, চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। পশ্চিম জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৭৬ যুগোস্লাভিয়ায় ইউরো কাপের তৃতীয় স্থান পর্যন্তই পৌঁছতে পারেন। দেশকে বিশ্বের আসরে এগিয়ে দিতে ব্যর্থ। অথচ আয়াক্স, বার্সেলোনা, ফেয়েনুর্ডের জন্য ট্রফির পর ট্রফি জতেছেন। কিন্তু নেদারল্যান্ডের জন্য? একটিও নয়। ক্লাব পর্যায়ে লা লিগা এবং এরেডিভিসিতে ১০টি ট্রফি জিতেছেন এবং এবং তিনটি ইউরোপিয়ান কাপ।
ফেরেঙ্ক পুসকাস, হাঙ্গেরি (১৯৪৫-৫৫ : ৮৫ ম্যাচ, ৮৪ গোল), স্পেন (১৯৬১-৬২: ৪ ম্যাচ, ০ গোল)
পঞ্চাশের দশকে বিশ্ব ফুটবলে দাপিয়ে বেড়িয়েছে হাঙ্গেরি। মেসির মতই, পুসকাসও ১৯৫২ অলিম্পিকে দেশের হয়ে সোনা জিতেছিলেন। হাঙ্গেরির হয়ে বলকান কাপও ১৯৪৭ সালে। অলিম্পিকে সোনা জয়ের পর অপরাজিত থেকেই ১৯৫৪ বিশ্বকাপে পৌঁছন। সান্দর কোসিসের সঙ্গে জুটি করে ফাইনালে যান। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে শুরুতে গোল করে ২-০তে এগিয়ে গেলেও, শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হার স্বীকার করেন। দেশের জার্সি গায়ে ৮৫ ম্যাচে ৮৪ গোল করলেও, খেতাবের সামনে থেকে ফিরে আসতে হয়। হাঙ্গেরির হয়ে সাফল্য আসেনি। শেষ বয়সে স্পেনের হয়ে খেললেও, সেখানেও একইভাবে অধরা থেকে যায় স্বীকৃতি। যদিও মাত্র চার ম্যাচই খেলতে পারেন।
ইউসেবিও, পর্তুগাল (১৯৬১-৭৩: ৬৪ ম্যাচ, ৪১ গোল)
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আগে পর্তুগালের ফুটবল আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। পর্তুগিজ ফুটবলারদের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বেনফিকার হয়ে এগারোবার লিগ এবং একটি ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন। ১৯৬৫তে ব্যালন ডি’অর জিতলেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। দেশকে আন্তর্জাতিক স্তরে কোনো খেতাবই উপহার তুলে দিতে পারেননি। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপে দুরন্ত ফুটবল খেললেও, তৃতীয় স্থানেই শেষ হয়ে যায় পর্তুগালের দৌড়। ইউসেবিও সতীর্থদের থেকে এগিয়ে থাকলেও, তার সতীর্থরাও তাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেননি। তাই দেশের হয়ে কিছুই জেতার সুযোগ আসেনি।
জিকো, ব্রাজিল (১৯৭৬-৮৬: ৭১ম্যাচ, ৪৮ গোল)
সাম্বা ফুটবলের এক অধ্যায়। তর্কাতীতভাবে ১৯৭০-৮০’র দশকের ব্রাজিলের সেরা ফুটবলার। ক্লাব ফুটবলে তার সম্মানের তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু দেশের হয়ে সেই তালিকা একেবারেই অসম্পূর্ণ। ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের সঙ্গে তুলনা করে জিকোকে ‘সাদা পেলে’ বলা হয়। কিন্তু তার ভাঁড়ার যে একেবারেই শূন্য। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে জিকোর ব্রাজিল তৃতীয় স্থানে শেষ করে। ১৯৮৬তে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেও যায়। কিন্তু কখনোই দেশকে ট্রফি দিতে পারেননি।
পাওলো মালদিনি, ইতালি (১৯৮৮-২০০৪: ১২৬ম্যাচ ৭ গোল)
এসি মিলানের হয়ে সাতবার সিরি এ এবং পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপ চ্যাম্পিয়ন। তবে যখনই দেশের কথা ওঠে তখনই শূন্যতা ভেসে ওঠে। আজ্জুরিদের জন্য একটি ট্রফিও জিততে পারেননি এই ডিফেন্ডার। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ এবং ২০০০ ইউরো কাপের রানার্স। ১৯৮৮ ইউরো কাপের ফাইনালিস্ট এবং ১৯৯০ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থানাধিকারী। প্রতিবার ট্রফির কাছ থেকেও ফিরে এসেছেন। অথচ ৩৪ বছর বয়সে যখন ২২ সালে অবসর ঘোষণা করলেন। তার ঠিক চারবছর পরেই ২০০৬ সালে ইতালি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। ব্যক্তি মালদিনি শ্রেষ্ঠ হলেও, দেশের জন্য তার শ্রেষ্ঠত্ব বিকশিত হয়নি।
মাইকেল বালাক, জার্মানি (১৯৯৯-২০১০: ৯৮ ম্যাচ ৪২ গোল)
২০০২ সালে একাই জার্মানিকে বিশ্বকাপ ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে একটা সামান্য ফাউলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন। ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে পারেননি। সেখানেই স্বপ্নের সমাধি ঘটে। ব্রাজিলের উত্থান হয়। ২০০৮ ইউরো কাপের ফাইনালে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তখন স্পেন ফুটবলে সুবর্ণ যুগ। স্পেনের কাছে হার স্বীকার করেন। বেয়ার লেভারকুসেন,বায়ার্ন মিউনিখ, চেলসির হয়ে মনোরম সময় কাটালেও, আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি নিঃস্ব।
মাইকেল ল’ড্রপ, ডেনমার্ক (১৯৮২-৯৮: ১০৪ ম্যাচ, ৩৭ গোল)
অনেকের বিশ্বাস ১৯৭০দশকে ক্রুয়েফের প্রতিবিম্ব হলেন ১৯৯০ সালের ল’ড্রপ। জুভেন্টাস, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, আয়াক্সের জন্য একের পর এক ট্রফি জিতেছেন। কিন্তু ডেনমার্কের জন্য ইতিহাস লিখতে পারেননি। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের গ্রুপের বাধা অতিক্রম করলেও, স্পেনের কাছে ৫-১ গোলে হেরে ফিরে যায়। আর ১৯৯২ সালে ডেনমার্ক যখন ইউরো জিতলো তখন তিনি অবসর নিয়েছেন।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, পর্তুগাল (২০০৩ চলছে: ১২০ ম্যাচ, ৫৫ গোল)
মেসির সব থেকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। যেখানেই যে তুলনা হয় মেসির পাশে অজান্তেই চলে আসে রোনাল্ডোর নাম। ক্লাবের হয়ে ই পি এল, লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে চলেছেন। ব্যক্তিগত দক্ষতায় মেসির সমকক্ষ হয়ে ব্যালন ডি’অরও জিতেছেন বার দুয়েক। কিন্তু দুঃখের সরণিতে তিনিও মেসির সঙ্গী। একবার মাত্র, ২০০৪ সালে ইউরো কাপের ফাইনালে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তখনও তো গ্রিস সকলকে চমকে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। রোনাল্ডোর বয়স ৩০। সামনে এখনও সময় পড়ে। যেভাবে ২৮ বছরের মেসির এখনও সময় আছে। ঝরে যাওয়ার আগে যদি একবার আঁচড় কেটে যান। একটা ট্রফি দেশকে উপহার দিয়ে যান। কিন্তু তা কি পারবেন! যে অলিখিত দ্বন্দ্ব আর অদৃশ্য গাঁটছড়া আছে দুয়ের মধ্যে তা ভাঙে কিনা তাই এখন দেখার।– সংবাদ সংস্থা

খেলা এর আরো খবর