বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১
logo
পবিত্র ঈদুল ফিতর
প্রকাশ : ১৯ জুলাই, ২০১৫ ১৮:৫৪:৫৯
প্রিন্টঅ-অ+
ধর্ম ওয়েব

পবিত্র ইসলাম বিশ্বমানবের ধর্ম, বিশ্বধর্ম এবং ইসলামের সব আনন্দোৎসবই বিশ্বজনীন ও সার্বজনীন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সুন্দর চরিত্র মাধুরী বিশ্বমানবের বিশেষ করে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য পরম আদর্শ। তাঁর প্রদর্শিত মত ও পথই মুসলমানদের একমাত্র পাথেয় এবং ইহ ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র সোপান। এ কারণেই তো মুসলমানদের প্রতিটি পর্ব ও আনন্দোৎসবই আধ্যাত্মিকতার মহিমায় মহিমান্বিত। যার মধ্যে আল্লাহপাকের সানি্নধ্য পাওয়ার জন্য রয়েছে বহু সিঁড়ি। এমনকি মুসলমানদের সব পর্ব ও আনন্দোৎসবের সঙ্গে রয়েছে রোজা ও নামাজের গভীর সম্পর্ক। মুসলমান নামাজ ও রোজা আদায় করার পর যে খুশি প্রকাশ করে, দুনিয়ার অন্য কোনো বস্তু হাসিল হলেও এমন খুশি সে প্রকাশ করে না। ঈদ শব্দটি আরবি। যা 'আউদুন' শব্দ থেকে নির্গত। অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। সাধারণত আনন্দোৎসবের দিনকে ঈদ বলা হয়। তবে শরিয়তের পরিভাষায়, বছরে যে দুটি দিনকে আনন্দোৎসবের দিন হিসেবে পালন করা হয়, তাকে ঈদ বলা হয়। দীর্ঘ একটি মাস রোজা রাখার পর, রোজাদারদের জন্য আগমন করেছে খুশির দিন বা ঈদুল ফিতর। 'ঈদুল ফিতর' অর্থ রোজা খোলার আনন্দ। রোজা খোলার খুশি। তবে খেয়াল রাখতে হবে, আনন্দ এ জন্য নয় যে আমাদের আর রোজা রাখতে হবে না বা রোজা রাখার কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। সুতরাং এখন আর কষ্ট করতে হবে না। বরং এ আনন্দের অর্থ হলো আমরা দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম-সাধনা পালন করার মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক ৫টি রুকনের একটির ওপর আমল করতে পেরেছি, একটি মাস আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি, এটা বড়ই একটি আনন্দের বিষয়। আমরা আল্লাহপাকের এত বড় একটি বিধানের ওপর আমল করতে পেরেছি, তার জন্য শুকরিয়া স্বরূপ দুই রাকাত নামাজও ওয়াজিব করা হয়েছে। ঈদের নামাজকে তাই শুকরিয়ার নামাজও বলা হয়। এক ইবাদতের শুকরিয়া অপর ইবাদতের মাধ্যমে করাটাই পরম আনন্দের বিষয়। আমরা যদি পবিত্র কোরআনের দিকে লক্ষ করি, তাহলে সেখানে দেখতে পাব, আল্লাহতায়ালা ঈদুল ফিতর ও সাদাকাতুল ফিতর সংক্রান্ত আয়াত নাজিল করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, 'সফল সে, যে নিজের আত্মিশুদ্ধি করে এবং তার প্রতিপালকের জিকির করে ও নামাজ আদায় করে। (সূরাতুল আ'লা ১৪) হজরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (র.) ও আল্লামা আবুল আলিয়া (র.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন, নিশ্চয় সাফল্য অর্জন করেছে সে ব্যক্তি, যে সাদাকাতুল ফিতর দান করেছে এবং ঈদের নামাজ আদায় করেছে। (আহকামুল কোরআন খ.৩য় পৃ:৪৭৩) বোখারি ও মুসলিম শরিফে এসেছে, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন। রোজাদারদের জন্য দুটি খুশি, একটি হলো রোজা রাখতে পারার জন্য ঈদের দিনের খুশি, আর একটি খুশি হবে যখন রোজাদার ব্যক্তি তাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করবে। তখন আল্লাহপাক ডেকে বলবেন, হে আমার বান্দা! তুমি আমার জন্য দিবসে পানাহার বর্জন করে আমাকে পাওয়ার জন্য রোজা রেখেছিলে, তুমি শুনে রাখ, আজ আমি মাওলাই তোমার পুরস্কার। তখন আল্লাহতায়ালা স্বয়ং নিজের কুদরতি হাতে রোজাদারদের কাছে রোজার পুরস্কার উঠিয়ে দেবেন। সুবহানাল্লাহ। এ ঈদের রয়েছে সামাজিক গুরুত্ব। দল-মত, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, ফকির-ভিখারি নির্বিশেষে সবাই মিলে ঈদগাহে সমবেত হয়ে সমবেতভাবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানায়। কি সুন্দর এক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। সামাজিক জীবনের তামাম ঘৃণা, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানি সবকিছু ভুলে এক প্যান্ডেলের নিচে কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে মনের সঙ্গে মন মিলিয়ে দাঁড়ায়। নামাজের পর পরস্পর কুশল বিনিময় করে। মোটকথা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে সম্পর্ক নিবিড় করা, মানুষের ওপর মানুষের যে কর্তব্যবোধ ও খেদমতে খালকের নিষ্ঠা ও চেতনাকে জাগ্রত করার মাঝেই মূলত রয়েছে ঈদের তত্ত্ব, তাৎপর্য ও হেকমত। এটাই হলো সংক্ষেপে ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য। ইসলাম একটি প্রাকৃতিক ধর্ম। যেমন আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, 'তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখ। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' (সূরাতুর রুম: ৩০) অর্থাৎ পবিত্র কোরআনের উক্ত আয়াতে মানুষের প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে। ইসলাম কখনো মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদাকে অস্বীকার করে না। কিছুটা বাহ্যিক আনন্দ-ফুর্তি করাও মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা। সারাক্ষণ একজন মানুষের মনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে চলতে পারে না। রাত-দিনে ২৪ ঘণ্টা কেউ গোমড়া মুখ করে থাকতে পারে না। মানুষের জীবনে মাঝে মাঝে আনন্দ-ফুর্তির প্রয়োজন আছে। হাসি-খুশির প্রয়োজন আছে। মাঝে মাঝে চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন আছে। তবে আনন্দ-ফুর্তি, হাসি-খুশি সব কিছু হতে হবে ইসলামের সীমানার ভিতরে। লাগামহীনভাবে নয়। যেমন ইচ্ছা তেমন আনন্দ-ফুর্তি করা যাবে না। যেমন ইচ্ছা তেমন চিত্তবিনোদন করা যাবে না। আমাদের মহানবী (সা.) তিনিও মাঝে মাঝে আনন্দ-খুশি প্রকাশ করতেন। মুচকি হাসি দিতেন। তবে মহানবীর আনন্দ-খুশি কখনো বাস্তবতা বহির্ভূত কিংবা দীন-ইসলামের চাহিদা বিরোধী ছিল না। আমার এ ক্ষুদ্র প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোকপাত করা সম্ভব নয়। তবে মুসলিম ভাইদের কাছে আবেদন থাকবে আমরা আনন্দোৎসব করব। তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন কোনোভাবেই ইসলামের গণ্ডির বাইরে না যায়।
অন্যথায় সফলতার পরিবর্তে ব্যর্থতা, রহমতের পরিবর্তে গজব এবং পুণ্যের পরিবর্তে শাস্তি অর্জন হয়ে যাবে। আল্লাহপাক সব মুমিন-মুসলমান ভাইদের সঠিকভাবে ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চালার তৌফিক দান করুন। আমিন
মুফতি আমজাদ হোসাইন
লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব, বারিধারা, ঢাকা।

ধর্ম এর আরো খবর