মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১
logo
শতবর্ষে কারমাইকেল কলেজ
প্রকাশ : ০৭ মে, ২০১৬ ১২:৫৬:৩৮
প্রিন্টঅ-অ+
শিক্ষা ওয়েব

রংপুর : সবুজ শ্যামল প্রকৃতির বুকে দিগন্তজোড়া মাঠ। মনোরম পরিবেশ। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংগ্রামে সমৃদ্ধ। আছে পড়ালেখার চাপ। কমতি নেই শিক্ষার্থীদের আড্ডার। গান বাজনার সঙ্গে পাখপাখালির কিচিরমিচির। মাঝে মাঝে প্রতিবাদীদের আওয়াজ ভাসে মিছিল-স্লোগানে। সব মিলিয়ে সারাক্ষণ প্রাণোচ্ছ্বল উত্তরের অক্সফোর্ডখ্যাত প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কারমাইকেল কলেজ।  


 


আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার পতন আন্দোলনসহ এদেশের প্রত্যেকটি ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস রচনায় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উঠে আসে, তেমনি করেই এই কারমাইকেল কলেজ নিজেই একটি ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে বাংলাসহ ভারতবর্ষে। সেই আলো যেন আজো অফুরান। 


 


 


দৃষ্টিনন্দন এই কলেজের দেয়াল মাটি আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে কত শত ইতিহাস। ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড টমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল এই ঐতিহাসিক কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। আর তার নামানুসারেই কলেজের নামকরণ করা হয় ‘কারমাইকেল কলেজ’। 


 


১৯১৭ সালের জুলাই মাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই কলেজে ‘আইএ’ ও ‘বিএ’ ক্লাস খোলার অনুমতি দেয়। সেই সময় থেকে প্রায় দুই বছরের জন্য কলেজটির পঠনপাঠনের কাজ চলে রংপুরের বর্তমান জেলা পরিষদ ভবনে। ১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজের মূল ভবনের উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ৮০০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই প্রাঙ্গণ বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ভীষণ আপন! 


 


 


 


বয়সের হিসাবে, এ বছর নভেম্বরে এই প্রতিষ্ঠানের শত বছর পূর্ণ হবে। ‘শতবর্ষে শতপ্রাণ-ঐতিহ্যের জয়গান’ স্লোগানে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে শতবর্ষপূর্তি উদযাপনে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম। তিন ক্যাটাগরিতে এই রেজিস্ট্রেশন চলবে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। 


 


এদিকে, নতুন-পুরাতন শিক্ষার্থীরা প্রিয় কলেজের সেঞ্চুরির পথে কী কী আয়োজন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের উচ্চমাধ্যমিক, অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিসহ ২১টি বিষয়ের প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন থেকেই বিরাজ করছে চাপা রোমাঞ্চ! যেন অন্যরকম অনুভূতি প্রকাশের আয়োজন চলছে। 


 


কয়েক দিন আগে, ভরদুপুরে ক্যাম্পাস ঘুরে কথা হলো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। কেউ তখন জোট বেঁধে আড্ডায় মগ্ন। চলছে হাসাহাসি, খুনসুটি। কারও আবার ক্লাসের তাড়া।


 


ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম আপন বললেন, ‘অল্প কিছুদিন পরেই আমরা শতবর্ষপূর্তি পালন করব। সত্যি এই অনুভূতি কতো স্মৃতির হবে ভাবা যায় না। আমাদের সবাইকে প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে। আশা করি আমাদের প্রিয় এই কলেজে প্রতিদিনের পরিবেশ এখনকার মতো আগামীতেও উৎসবমুখর থাকবে।’ 


 


 


 


পড়ালেখার ফাঁকে সংস্কৃতিচর্চাসহ নানামুখী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নতুন শিক্ষার্থীরা মেতে উঠুক এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন কাকাশিস এর সভাপতি ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী চন্দন সাহা বাপ্পী। একই সুরে কথা বলেছেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম।


 


ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী খাইরুল ইসলাম খোকনের সঙ্গে কথা হল। বলছিলেন, ‘শত বছরের ঐতিহ্যের এই প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো মানুষ হয়ে বের হতে চাই। দেশ গড়তে চাই। স্বপ্ন দেখতে চাই, দেখাতে চাই।’ 


 


আড্ডার ফাঁকে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রাক্তণ শিক্ষার্থী সব্যসাচী সাহা বলে উঠলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের কলেজের মাঠে দাঁড়িয়েই সবচেয়ে সুন্দর আকাশ দেখা যায়! নতুন পুরোনো ভবনগুলোতে একা একা ঘুরতেও ভালো লাগে!’ 


 


 


 


আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী চ্যানেল আই'র রংপুর স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক মেরিনা লাভলী বলেন, ‘আমাদের কলেজ প্রাঙ্গণ সব সময় উৎসবমুখর ছিলো, আছে আগামীতেও থাকবে। শত বছরের আয়োজনে সেই উৎসবের রঙ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। এসময় তিনি বেশ উচ্ছস্বিত কণ্ঠে বলেন, ‘শতবছরে আমাদের গৌরব ও ঐতিহ্যের মিলন মেলা হবে।’ 


 


 


 


কারমাইকেল কলেজে পড়েছেন রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বর্তমানে সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিতে নামকরা আরও অনেকে। যাদের পদচারণায় সেঞ্চুরির আয়োজনকে ইতিহাস হিসেবে বর্ণিল করতে এখন শুধুই অপেক্ষা। 


 


শতবর্ষপূর্তি উদযাপনে কলেজ প্রশাসন এরই মধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু বলেন, ‘ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কারমাইকেল কলেজ নিজেই একটি ইতিহাস। এই কলেজের সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশ-বিদেশে। তাই আমরা শতবর্ষপূর্তি উৎসব নিয়ে অনেক কিছু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আশা করছি সবার সহযোগিতা পেলে শান্তিময় পরিবেশে আরেক ইতিহাস রচনা হবে।’

শিক্ষাঙ্গন এর আরো খবর