রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১
logo
চবিতে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের ওপর হামলা-নির্যাতন
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল, ২০১৬ ১৪:২৯:৫৩
প্রিন্টঅ-অ+
শিক্ষা ওয়েব

চবি : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানেন না এমন অনেকেই থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনেননি এমন লোক হয়তো হাতেগোনা। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক এবং বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি। যাদের জন্য এ স্বাধীন দেশ, তারাসহ তাদের পরিবারের সন্তানদের ‘কেমন রাখা উচিত ছিল? অথচ আজ কোন অবস্থায় আছে তারা?’ এমন হাজারো প্রশ্ন ঘোরপাক খায় নিজেদের মধ্যে। যদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের নিরাপত্তাসহ সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধাসহ তাদের পরিবারকে সম্মান দিলেও বাকিরা কি করছেন?
বলছি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মত একটি মহান বিদ্যাপীঠের বস্তিতে কেমন আছে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানরা। এর খোঁজ নিতে বেশি দূরেও যেতে হবে না। গত ফ্রেবুয়ারি থেকে এপ্রিল এ চারটি মাসের হিসাক কষলেই তাদের অবস্থা জানা যাবে। আসলে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক এ বিদ্যাপীঠে তারা ভাল নেই। শুধুমাত্র এ মাসে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোপানো হয়েছে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানদের। তার আগে ফ্রেবুয়ারি মাসেও রগকাটা হয়েছে আরেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানকে।
আরাফাত, শরীফ, আফিফ। এ তিনজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের আরেক পরিচয়, তারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। এই তিনই ভয়াবহ হামলার শিকার। একজনের কেটে দেয়া হয়েছে দুই পায়ের রগ। আরেকজনকে করা হয়েছে জবাই। একজনের মাথায় কোপানো হয়েছে চাপাতি দিয়ে। চবিতে হঠাৎ করেই রগকাটা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের! এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রগতিশীল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী বাংলামেইলকে বলেন, ‘সবগুলো ঘটনার তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট দিলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে। আমরা তদন্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি।’
ইতিহাস বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী আরাফাত রহমান। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় সোহরাওয়ার্দী হলে নিজের কক্ষে পড়াশুনা করছিলেন তিনি। ওইদিন রাত ১০টার দিকে হঠাৎ শাহ আমানত হলে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আলমগীর টিপু ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজনের অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দী হলে ফজলে রাব্বী সুজনের অনুসারী বায়েজিদ আহমেদ সজলের নেতৃত্বে ৭-৮ জন ছাত্রলীগ কর্মী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আরাফাতের কক্ষে প্রবেশ করে। চাপাতি দিয়ে তার দুই পায়ের রগ কেটে দেয় তারা। আরাফাত দীর্ঘ দুই মাসেও সুস্থ হয়নি। তিনি এখন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ প্রসঙ্গে আরাফাত বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমি ওইদিন রাতে পড়াশুনা করছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার রুমের দরজার কড়া নাড়ছে কয়েকজন। আমি দরজা খুলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বায়েজিদ আহমেদ সজল, ইশতিয়াক তানভির এবং সনেট  চাপাতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। কোনো কথা বলা ছাড়াই তারা আমাকে প্রথমে মেঝেতে শোয়ায়। এরপর চাপাতি দিয়ে ইচ্ছে মতো কোপায়। আমি নিস্তেজ হয়ে পড়লে আমার দুই পায়ের রগ কেটে দেয় তারা। ডাক্তার বলেছে আমার পক্ষে স্বাভাবিক ভাবে হাঁটাচলা করা আর সম্ভব নয়।’
এ ঘটনায়  বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটিং বিভাগের ২০০৯-১০ সেশনের শিক্ষার্থী বায়েজিদ আহমেদ সজল, উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক তানভির, পদার্থ বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী সনেট ও জাহাঙ্গির রাসেলের নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে ছাত্রলীগ কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আরাফাতের বোন। তবে প্রধান আসামি বায়জিদ সজলসহ অন্য আসামিদের এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
এ ব্যাপারে হাটহাজারী থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বাংলামেইলকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’বার গিয়েছি তাদের ধরতে কিন্তু ধরতে পারিনি। কারণ তারা পলাতক রয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘আমাদের যখন ব্যস্তটা থাকে তখন ক্যাম্পাসে আসে আসামিরা। এখন উপজেলা কেন্দ্রিক নির্বাচনে সময় দিচ্ছি তাই আমাদের সব ফোর্স এখানে ব্যস্ত। ওই সুযোগে তারা ক্যাম্পাসে আসে হয়তো।’ তারপরও তাদের ধরার অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।
হাটহাজারীর সার্কেল এএসপি মশিউদ্দৌলাহ রেজা বাংলামেইলকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। অনুমিত ছাড়া অভিযান চালিয়ে আমরা কোনো আসামিকে ধরতে পারি না। তারপরও বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হবে। দ্রুত আসামিদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করছি।’
এদিকে গত ২৬ এপ্রিল ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী শরীফুল ইসলামকে শাহ আমানত হলে গলায় ছুরি দিয়ে জবাই করার চেষ্টা চালায় একই গ্রুপের ফজলে রাব্বী সুজনের অনুসারী ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ডেনিয়েল। এ সময় শরীফের গলার দুটি রগ কেটে যায়। চাপাতির কোপে তার ডান হাতের হাঁড় তিন ভাগে কেটে যায়। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তুলে নেয়া হয় শরীফের পিঠের মাংস। শরীফ বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় হাটহাজারী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ গ্রেপ্তার করে ডেনিয়েলকে।
শরীফুলের বড় ভাই মো. শফিকুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমার বাবা মদনহাট থানার মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডার। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও আজ আমাদের কোনো নিরাপত্তা নাই। আমার ছোটোভাই শরীফের উপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যদি শাস্তি না হয় তাহলে আমি ঢাকায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনকে বিষয়টি জানাব। তারপর সংবাদ সম্মেলন করব। এর বিচার অবশ্যই করতে হবে।’
সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল রাতে ৯টার দিকে ছাত্রলীগের স্থগিত হওয়া কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপুর অনুসারীরা ইংরেজি বিভাগের ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পেয়ার আহমেদ আফিফকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। তার মাথায় গুরুতর জখম হয়। এ সময় তাকে বেধড়ক মারধরও করা হয়। এ ঘটনায় আফিফ বাদী হয়ে আলমগীর টিপুর আট অনুসারীর নামসহ অজ্ঞাতনামা ২০-২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
এদিকে একের পর একক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের রগকাটা ও কোপানোর ঘটনার পরপর চবি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে চরম সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই তিনটি ঘটনায় চবি ছাত্রলীগের ইমেজও চরম সঙ্কটে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চবি ছাত্রলীগের স্থগিত হওয়া কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপুর সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’ চবি শাখার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ফজলে রাব্বী সুজন বাংলামেইলকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। আর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সেই মুক্তিযোদ্ধার রক্ত বহন করে চলেছে। একটি সুন্দর ও সফল দেশ বির্নিমাণে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের উপর যারা এসব হামলার ঘটনার সাথে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
‘আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান’ চবি শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বাংলামেইলকে বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পরিকল্পিতভাবে হামলা করছে। এরা ছাত্রলীগের ভিতরে শিবিরের অনুপ্রবেশকারী কিনা তা তদন্ত করে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
চবি ছাত্রলীগের এমন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বাংলামেইলকে  বলেন, ‘এ ঘটনাগুলো ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে ছাত্রলীগে নিয়ে আসা হয়। এগুলো ব্যক্তিগত সমস্যা। তাছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি নেই, তাই ছাত্রলীগের নাম কেউ ব্যবহার করার অধিকার নেই। যেহেতু এ ঘটনাগুলো ঘটছে, তাই বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

শিক্ষাঙ্গন এর আরো খবর