বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১
logo
ভোগান্তিতে শুরু একাদশে ভর্তি কার্যক্রম
ফলের পর এবার ভর্তিতে হ-য-ব-র-ল
প্রকাশ : ২৯ জুন, ২০১৫ ২১:১৩:৫১
প্রিন্টঅ-অ+
শিক্ষা ওয়েব

ঢাকা: একাদশ শ্রেণীর ভর্তি আবেদনের পর এবার ভর্তি কার্যক্রমেও লেজেগোবরে অবস্থা। মেয়েকে ছেলেদের কলেজে আসন, জিপিএ-৫ পেয়েও কোন কলেজে সুযোগ না পাওয়া, এসএমএসে পছন্দ মাফিক কলেজ পেলেও কলেজের তালিকায় নাম না থাকাসহ নানা অভিযোগের স্তুপ জমেছে এখন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের টেবিলে।
মধ্যরাতে ফল প্রকাশের পর সোমবার থেকে শুরু হয়েছে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি কার্যক্রম। শুরুর পর থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ নিয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিবাবকরা প্রথমে কলেজের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন। সেখান থেকে কোনো সদুত্তর না পেয়ে তারা ভিড় জমান ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে। সেখানেও তারা সোমবার পর্যন্ত কোনো জবাব পাননি।
এদিকে, বড় কলেজগুলোও পড়েছে বিপাকে। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে তাদের স্কুল বিভাগের শিক্ষার্থীদের থেকে বাইরের স্কুলের শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য অধিক মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। আর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের আসনের অর্ধেকও শিক্ষার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কলেজ প্রধানরা।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের কলেজ বিভাগে প্রায় দেড় হাজারের মতো আসন রয়েছে। অনলাইনে আমাদের কলেজকে প্রথম পছন্দ দিয়েও প্রচুর আবেদন করেছে। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য আসনের অর্ধেক শিক্ষার্থীকেও মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এখন আমরা কি করবো, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমরা কি দ্বিতীয় মেধাতালিকার জন্য অপেক্ষা করবো না নিজেরাই নিজেদের মতো করে ভর্তি করে নেবো?’
ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমরা কলেজের ভর্তির ক্ষেত্রে সব সময়ই স্কুল বিভাগের ছাত্রীদেরকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু শিক্ষাবোর্ড অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তি আবেদন করে আমাদের আসনের বেশিরভাগই বাইরের স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে ভর্তির জন্য মনোনয়ন দিয়েছে। এটা কিভাবে সম্ভব? আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদেরকেই ভর্তি করাবো।’
তিনি জানান, ভিকারুননিসার অন্তত ২০ ছাত্রীর নাম তালিকায় আসেনি, কিন্তু এসএমএসে এসেছে। এসব বিষয় তিনি বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও জানান।
এদিকে, সোমবার সকাল থেকে ভর্তি কার্যক্রমে ভোগান্তির শিকার শিক্ষার্থী ও তাদের অভিবাকরা ভিড় জমাতে শুরু করেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শকের কক্ষের সামনে। সেই সঙ্গে নানা অভিযোগ নিয়ে আসতে থাকেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকরাও।
কলেজ পরিদর্শকের কক্ষের সামনে কথা হয় মোহাম্মদপুর প্রিপাইটেরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই সহকারী অধ্যাপক দিলরুবা বেগম ও নাজমা পারভীনের সঙ্গে। অভিযোগ করে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমাদের কলেজে মানবিক বিভাগে ৫০টি আসন রয়েছে। যার বিপরীতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৮৮ শিক্ষার্থী। যাদের বেশিরভাগেরই প্রথম পছন্দ ছিল আমাদের কলেজ। কিন্তু তাদের কাউকে আমাদের এখানে ভর্তির জন্য মনোনিত না করে তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের কলেজে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে। এই অবস্থায় তো মনে হচ্ছে, আমাদের কলেজ থেকে মানবিক বিভাগটি বাতিল হয়ে যাবে।’
সেখানেই কথা হয় গাজীপুরের সফিপুর আইডিয়াল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এরশাদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমদের কলেজে ২০০টি আসন রয়েছে, যার বিপরীতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ২৪৪ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১০০টি করে আসন রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে ভর্তির জন্য দুই বিভাগে ৫০ জন করে ১০০ জনকে মনোনিত করা হয়েছে।’
কলেজ পরিদর্শকের কার্যালয়ের বাইরে কথা হয় টঙ্গীর পাইলট স্কুলের ছাত্রী আফিয়া খাতুনের সঙ্গে। সে বলে, ‘আমি আমার পছন্দমাফিক পাঁচটি কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে একটি ছেলেদের কলেজে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে। আমি ওই কলেজটির নামও কোনোদিন শুনিনি।’ একই সমস্যা নিয়ে বোর্ডে অভিযোগ করেছেন শাফি কালিমা নামের আরেক ছাত্রী। তাকেও ছেলেদের কলেজে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ এমইউ সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী ফারিয়া হোসেন বলে, ‘আমি জিপিএ-৫ পেয়েছি। কিন্তু আমাকে কোনো কলেজেই ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়নি। আমি আসলে জানতে চাই, এর চেয়ে ভালো ফল করা কি সম্ভব?’
জিপিএ ৫ পেয়েও কোনো কলেজে ভর্তির জন্য মনোনয়ন পায়নি ফারিয়া হোসেন
ধামরাইয়ের লর্ড হার্ডিলন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার বলে, ‘আমি জিপিএ ৪.৬০ পেয়েছি। আমি ভর্তির জন্য আমার পছন্দমাফিক ৫টি কলেজে আবেদন করেছিলাম। এর মধ্যে কোনোটিতেই আমাকে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়নি। অথচ আমাকে সরকারি ইয়ামিন কলেজ নামের একটি কলেজে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে। কিন্তু এই কলেজ কোথায় অবস্থিত সেটাও আমি জানি না। আর আমি তো ওই কলেজে ভর্তির জন্য আবেদনও করিনি।’
মনিপুর হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী এসএম আলিম নাহিদ বলে, ‘আমি ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এসএসসি পাস করেছি। অথচ আমাকে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে সরকারি বিজ্ঞান কলেজে। কিন্তু সেই কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায়ই নেই।’
এই সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য মনোনিত করার সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। এ অভিযোগ পড়েছে প্রায় ৫০টি। এসএ সরকারি হাই স্কুলের ছাত্রী ফারিয়া হোসেন জানা, সেসহ ওই স্কুলের ৪৮ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজে আবেদন করেছে। এদের প্রত্যেককেই ব্যবসায় শিক্ষায় ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞান কলেজে যোগাযোগ করা হলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানান, দুই বছর আগেই সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাদের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতেও এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। এখানে যে ভুল হয়েছে, তার জন্য বোর্ড দায়ী।
মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থী মোস্তাকিম হোসেন বলে, ‘আমি এসএসসিতে জিপিএ ৪.৪০ পেয়েছি। আমি নিজের পছন্দ মতো ৫টি কলেজে আবেদন করেছি। কিন্তু এগুলোর কোনটিতেই না হয়ে আমাকে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে মিরপুরের শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজে। কিন্তু সেখানে আমি আবেদনই করিনি।’
একই স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী শান্ত চৌধুরী বলে, ‘অনলাইনে আমার ভর্তি আবেদন ভৌতিকভাবে করা হয়েছিল। পরে আমি বোর্ডে এসে ঠিকঠাক করেছি। আমি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অথচ কমার্স সিটি কলেজে আমাকে ভর্তির জন্য মনোনিত করা হয়েছে। এগুলো কিভাবে, কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।’
সব সমস্যার সমাধান করা হবে
শিক্ষার্থী ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সব সমস্যার সমাধান করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কলেজ পরিদর্শক ড. আসফাকুস সালেহীন। বাংলামেইলকে তিনি বলেন, ‘আসলে এবারই প্রথম অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিছু ভুল-ত্রুটি আছে, এটা আমি অস্বীকার করবো না। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান করা হবে। আর শিক্ষার্থীরাও আবেদনে প্রচুর ভুল করেছে। তার জন্য তারা এখনো আবেদন করছে।’
এদিকে ভর্তি কার্যক্রমে এ দুরবস্থার বিষয়ে কথা বলতে শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান ও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিককে কয়েকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। এর মধ্যে আবু বক্কর ছিদ্দিক এই সঙ্কটের কারণে সোমবার শিক্ষাবোর্ডে নিজের কক্ষে আসেননি বলেও জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, সোমবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে চার দফা পেছানোর পর একাদশ শ্রেণীর ভর্তি আবেদনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে প্রথম মেধাতালিকায় নাম এসেছে ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থীর। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এ ভর্তি কার্যক্রম চলবে ২ জুলাই পর্যন্ত। এই কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই ১ জুলাই থেকে একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।
গত ৩০ মে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর গত ৬ জুন থেকে অনলাইন ও এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। ২১ জুন রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত সারাদেশে কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করে ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭৪ শিক্ষার্থী।
   
 

শিক্ষাঙ্গন এর আরো খবর