সোমবার, ২১ জুন ২০২১
logo
তথ্য নেই সিআইডিতে, হোতারা সব জামিনে
প্রকাশ : ২৯ জুন, ২০১৫ ১০:০৫:০১
প্রিন্টঅ-অ+
দেশ ওয়েব

ঢাকা: যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। এর আগে মামলাটির তদন্ত ও চার্জশিট দিয়েছে র‌্যাব। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিকতর তদন্তে নেমে বিপাকে পড়েছে সিআইডি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো নথিই তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
এর মধ্যে র‌্যাবের হেফাজতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত এসএম জাহিদ সিদ্দিক তারেকের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি, রিয়াজুলের ব্যবহৃত মোবাইলের সিজারলিস্ট এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়িগুলোর মালিকানার নথি পায়নি সিআইডি। ফলে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরেও সিআইডি এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারছে না। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নথি চেয়ে র‌্যাব ও বিআরটিএকে চিঠি পাঠিয়েছে তারা।
২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দেয় র‌্যাব। কিন্তু মামলার বাদী মেজর রশিদুল হক খান মিল্কী না-রাজি দিলে আদালত ওই বছরেরই ৬ জুন পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেন সিআইডিকে।
সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের ২৩ তারিখে র‌্যাবের মহাপরিচালকের বরাবর চিঠি দিয়েছে সিআইডি। ওই চিঠিতে মিল্কীর ব্যবহৃত মোবাইলের সিজার লিস্ট, মামলার মূল আসামি ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া তারেকের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ও র‌্যাবের কাছে বাদীর মোবাইল জমা দেয়ার তথ্য চাওয়া হয়েছে।
মিল্কীর ব্যবহার করা মোবাইল ফোনটি নিজ হাতে র‌্যাব-১ এর তৎকালীন অধিনায়ক কিসমত হায়াতের কাছে দিয়েছেন বলে সিআইডির কাছে দাবি করেছেন মামলার বাদী।
সিআইডি জানায়, মিল্কীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। মামলার মূল অভিযুক্ত তারেক র‌্যাবের হেফাজতে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। তার মৃত্যুকালীন জবানবন্দির নথিও ওই চিঠিতে চাওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিআইডির সূত্রটির দাবি, আসামির মৃত্যুকালীন জবানবন্দি আদালতে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। ওই সময় আসামি সাধারণত মিথ্যা বলে না।
তবে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খানকে গত শুক্রবার বিকেলে ফোন করলে তিনি চিঠির বিষয়ে বাংলামেইলকে কিছু জানাতে পারেননি।
সিআইডি জানিয়েছে, র‌্যাবের দেয়া চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে- খুনিরা দুইটি পাজারো, একটি প্রাইভেট কার ও একটি মোটর সাইকেলে করে হত্যামিশন সম্পন্ন করে। ওই গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কারা এই বিষয়ে বিআরটিএ এর কোনো নথি র‌্যাব সিআইডিকে দেয়নি। ওই গাড়িগুলোর মালিক, বিআরটিএ-তে কার নামে রেজিস্ট্রেশন করা আছে তা জানা গেলে আরো অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।
এই তথ্যগুলো জানার জন্য সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তা ওই গাড়িগুলোর তথ্য চেয়ে বিআরটিএ-কেও একটি চিঠি দিয়েছে।
উল্লেখ্য, রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যাকাণ্ডের পর দায়ের করা মামলার এজহারভুক্ত ৭ আসামিকে বাদ দিয়ে ১১ জনকে অভিযুক্ত করে এক বছর আগে চার্জশিট দেয় র‌্যাব। তবে নতুনভাবে আরো ৮ জনের নাম যুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ৫ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার এজহারে ১১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল যাদের মধ্যে মূল অভিযুক্ত এসএম জাহিদ সিদ্দিক তারেক র‌্যাবের হেফাজতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।
র‌্যাবের দেয়া চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন- সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, ফাহিমা ইসলাম লোপা, মো. জাহাঙ্গীর মন্ডল, মো. শাহীদুল ইসলাম, মো. আমিনুল ইসলাম হাবিব, মো. সোহেল মাহমুদ, মো. চুন্নু মিয়া, মো. আরিফ, মো. ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ও মো. শরীফ উদ্দিন পাপ্পু।
এদের মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, মো. জাহাঙ্গীর মন্ডল ও মো. সোহেল মাহমুদের নাম ছিল মামলার এজহারে।
এজহারে উল্লেখ ৭ আসামি যাদের যাদের বিরুদ্ধে র‌্যাব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পায়নি তারা হলেন- তুহিনুর রহমান ফাহিম, সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি, মো. রাশেদ মাহমুদ, সাইদুল ইসলাম নুরুজ্জামান, মো. সুজন হাওয়ালাদার, জাহিদুল ইসলাম টিপু ও ওয়াহিদুল আলম আরিফ।
সিআইডির বলছে, মামলার বাদী সিআইডিকে জানিয়েছে, র‌্যাবের দেয়া চার্জশিটে মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রকৃত আসামিরা শনাক্ত হয়নি। র‌্যাব প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের শনাক্তকরণ মহড়া (টিআই প্যারেড) না করেই মামলার চার্জশিট দিয়েছে। বাদীর যুক্তি শপার্স ওয়ার্ল্ডের দারোয়ান এবং মিল্কীর গাড়িচালক বলেছে, তারা খুনিদের দেখলে চিনতে পারবে। কিন্তু র‌্যাব টিআই প্যারেড করেনি।
মামলা সিআইডিতে আসার পর গত ১৩ মে টিআই প্যারেডের জন্য কোর্টে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে আদালতও তা মঞ্জুর করেননি।
বাদীর না-রাজি দেয়ার সপক্ষে আরো একটি অভিযোগ ছিল- সব আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই চার্জশিট দিয়েছে র‌্যাব। সব আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরো অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতো।
মামলার বাদী যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে তাদের মধ্যে মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপুকে রিমান্ডে নিয়ে সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু টিপুকে র‌্যাব কোনো জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। বাদী না-রাজিতে এনামুল হক ও টমেড বাবু নামে দুইজন জড়িত আছে বলে দাবি করেছে যাদের নাম র‌্যাবের দেয়া চার্জশিটে নেই। এই দুই জনকেও সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
শুধু তা-ই নয়, র‌্যাবের দেয়া চার্জশিটে উল্লেখ আসামিদের যারা এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত। যে ৫ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল তারাও জামিনে। এদের মধ্যে লোপা পলাতক রয়েছে। আর আগে থেকেই পলাতক ছিলেন- সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও মো. আরিফ।
মামলার বাদী রশিদুল হক খান মিল্কী বলেন, ‘র‌্যাবের তদন্তে অনেক তথ্য বের হয়ে আসেনি। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীদেরও নামও র‌্যাব চার্জশিটে রাখেনি। তাই না-রাজি দিয়েছিলাম।’
তিনি বাংলামেইলের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছে তারাও জামিনে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন আসলে কিছুই বলার নেই।’
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উত্তরা ইউনিটের সহকারী পুলিশ সুপার উত্তম কুমার দাশ বলেন, ‘অধিকতর তদন্তের স্বার্থে র‌্যাব ও বিআরটিএ এর কাছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চেয়ে সিআইডির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই তথ্যগুলো পাওয়া গেলে মামলার অধিকতর তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘মূল আসামিদের শনাক্ত করে একটি গ্রহণযোগ্য তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য সিআইডি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
২০১৩ সালের ২৯ জুলাই রাতে গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ড শপিং মলের সামনে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর মিল্কীর ভাই মেজর রাশেদ বাদী হয়ে জাহিদ সিদ্দিকী তারেক ওরফে কিলার তারেকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনার রাতেই র‌্যাবের হাতে আটক হন তারেক। দু’দিন পর তিনি র‌্যাবের হেফাজতেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
এই হত্যাকাণ্ডে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাও দলীয় নেতাকর্মী। এ কারণে অন্যান্য রাজনৈতিক খুনের মতো এ ঘটনাটিও আদালতে তদন্ত, শুনানি, অধিকতর তদন্ত এই বৃত্তেই বন্দি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
 

দেশ এর আরো খবর