রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১
logo
অংকুর কচি-কাঁচার মেলার উদ্যোগে নূরজাহান বেগমের স্মরণ সভায় বক্তারা
চাঁদপুরে যদি নারীদের নিয়ে কিছু করা হয়, তাহলে নূরজাহান বেগমকে নিয়ে করতে হবে
প্রকাশ : ০৫ জুন, ২০১৬ ১৪:৫৩:১৪
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব ডেস্ক

চাঁদপুর: চাঁদপুরের কৃতী সন্তান, তৎকালীন পাক-ভারত উপমহাদেশের নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ এবং এই উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী সাংবাদিক বেগম পত্রিকার সম্পাদক মরহুমা নূরজাহান বেগমের স্মরণ সভা ও দোয়ার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। চাঁদপুরের সুপরিচিত শিশু সংগঠন অংকুর কচি-কাঁচার মেলার আয়োজনে গতকাল ৪ জুন শনিবার সকালে চাঁদপুর প্রেসক্লাব কমিউনিটি সেন্টারে এ স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
অংকুর কচি-কাঁচার মেলার পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খানের সভাপ্রধানে এবং সংগঠক শহীদ পাটোয়ারীর সঞ্চালনায় মরহুমা নূরজাহান বেগম সম্পর্কিত স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য রাখেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি বিএম হান্নান, সাবেক সভাপতি ইকরাম চৌধুরী, সাহিত্য একাডেমীর মহাপরিচালক অংকুর কচি-কাঁচার মেলার উপদেষ্টা রোটাঃ কাজী শাহাদাত, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডঃ মোঃ জহিরুল ইসলাম, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রুশদী, মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার সাহা ও লেডী দেহলভী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইলিয়াছ। এছাড়া মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন চাঁদপুর অংকুর কচি-কাঁচার মেলার উপদেষ্টা গৌরাঙ্গ সাহা ও মোস্তফা কামাল উদ্দিন আহমেদ।
সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন চাঁদপুর অংকুর কচি-কাঁচার মেলার সাথী ভাই মানিক দাস, মুহাম্মদ আলমগীর, আহ্বায়িকা তাসমিয়া তাসনিম তানি, যুগ্ম আহ্বায়িকা নুসরাত জাহান তন্বী। সহযোগিতায় ছিলেন সাংবাদিক শেখ আল মামুন, আশিক বিন রহিম ও এসএম সোহেল। দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনায় ছিলেন প্রভাষক মাওঃ জাকির হোসেন।
ডাঃ সৈয়দা বদরুন নাহার তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, চাঁদপুরের মেয়ে নূরজাহান বেগমকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করি। তিনি ছিলেন পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলিম নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তাঁকে স্মরণ করে আমরা নিজেরাই স্মরণীয় হচ্ছি। তিনি ছিলেন নারী সমাজের পথদ্রষ্টা। আমরা তাঁর পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করবো।
চাঁদপুর প্রেসক্লাব সভাপতি বিএম হান্নান তাঁর সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণে বলেন, নারী জাগরণের পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম চাঁদপুরের গর্ব, তেমনি আমরা তাঁকে স্মরণ করে নিজেরা হচ্ছি ধন্য। নূরজাহান বেগমের জন্ম একবারই হবে, বার বার নয়। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দিয়েছেন নারী সমাজের প্রতি। বেগম পত্রিকার মাধ্যমে তিনি এ দেশের নারীদের জাগ্রত করেছেন।
চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমীর মহাপরিচালক, চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রোটাঃ কাজী শাহাদাত বলেন, বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগমকে আমি কখনো সরাসরি দেখিনি এবং কথাও হয়নি। কিন্তু তাঁর গর্বিত পিতা সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিনকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামালের পর যে নামটি ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে, তিনিই নূরজাহান বেগম। আমরা বহুবার চেষ্টা করেছিলাম নূরজাহান বেগমকে চাঁদপুরে আনতে। কিন্তু তিনি আসেননি। নূরজাহান বেগম ছোটবেলায় চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিণা চালিতাতলী গ্রামে থাকতেন। শিশু বয়সে দু'বার তিনি পানিতে পড়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে যান। তখন তাঁর পিতা নূরজাহান বেগমকে কোলকাতায় নিয়ে যান। সেখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। নূরজাহান বেগম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের সানি্নধ্য পেয়েছিলেন। তিনি নারীদের জাগ্রত করতে চলি্লশ দশকের শেষে বেগম পত্রিকা প্রকাশ করেন। আর সেই সময় শিক্ষিত নারীরা এ পত্রিকাটি পড়তেন। চাঁদপুরে যদি নারীদের নিয়ে কিছু করা হয় তাহলে নূরজাহান বেগমকে নিয়ে করতে হবে। দোকানঘর থেকে হরিণা পর্যন্ত এ সড়কটি যেনো নূরজাহান বেগমের নামে করা হয়। এছাড়া সওগাত সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ ও তাঁর মেয়ে নূরজাহান বেগমকে নিয়ে অংকুর কচি-কাঁচার মেলার উদ্যোগে স্মারক গ্রন্থ বের করা যেতে পারে। ওই স্মারক গ্রন্থে দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের এ দু' কৃতী সন্তান সম্পর্কে লেখা সংগ্রহ করা হলে স্মারক গ্রন্থটি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে।
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরাম চৌধুরী বলেন, চাঁদপুর অংকুর কচি-কাঁচার মেলার আয়োজনে আজকের স্মরণ সভায় বেগম পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম সম্পর্কে যে সকল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত হয়েছে, আমি মনে করি এখানে উপস্থিত স্কুল ছাত্রীরা সেগুলো মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে। উপস্থিত সকল ছাত্রীর মধ্যে যদি একজনও নূরজাহান বেগম সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে তাহলেই এ আয়োজন সার্থক। তিনি আরো বলেন, নূরজাহান বেগম একজন মহীয়সী নারী। তিনি জীবদ্দশায় নারীদের অধিকারের জন্যে যে সংগ্রাম করে গেছেন, তার ফলে আজকে নারী সমাজ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামালের পর নূরজাহান বেগমের স্থান। নারীদের জাগ্রত করে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই তিন সাহসী নারীর অনেক অবদান রয়েছে। নূরজাহান বেগমের সম্পাদিত বেগম পত্রিকা পড়ে নারী জাতি অনেক দূর এগিয়ে ছিলো।
চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রুশদী বলেন, নূরজাহান বেগম বহু গুণে গুণান্বিত ছিলেন। একজন নারী হিসেবে নূরজাহান বেগম আজ থেকে প্রায় ৬১ বছর আগে বেগম পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। আমরা চাঁদপুরবাসী গর্ববোধ করি নূরজাহান বেগমকে নিয়ে। কারণ তিনি চাঁদপুরের সন্তান। এ বেগম পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নারী জাতিকে জাগ্রত করেছেন। এখন সেই বেগম পত্রিকার হাল ধরেছেন তাঁর বড় মেয়ে। আজ আমরা এ মহীয়সী নারী নূরজাহান বেগমের স্মরণসভায় মিলিত হতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করছি।
মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার সাহা বলেন, চাঁদপুরে কচি-কাঁচার অনুষ্ঠানকে ঘিরে নূরজাহান বেগম চাঁদপুরে এসেছেন। বাংলাদেশের সুপ্রতিষ্ঠিত শিশু সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সাংবাদিক রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই একজন জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী নূরজাহান বেগম তিনিও দাদা ভাইয়ের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকতা এবং বেগম পত্রিকার সম্পাদনায় তিনি সবচে' জনপ্রিয় ছিলেন। যে পত্রিকাটি আমাদের বেশির ভাগ পরিবারের মা-বোনরা পড়ে থাকতেন।
লেডী দেহলভী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ ইলিয়াছ বলেন, আমাদের এখনকার নারীদের জন্যে যারা প্রেরণার বীজ বপণ করে গেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম নূরজাহান বেগম। তিনি শুধু চাঁদপুরের গর্বিত নারী নন, তিনি বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত নারীর মর্যাদা লাভ করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেন খান বলেন, ১৯১৮ সালে নূরজাহান বেগমের পিতা নাছির উদ্দিন আহমেদ সওগাত পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর কন্যা হয়ে নূরজাহান বেগম প্রকাশ করেন বেগম পত্রিকা। মুসলমান সমাজে এক সময় কুসংস্কার ছিলো। তা থেকে নারীদের মুক্ত করতে চেষ্টা করেছিলেন নাসির উদ্দিন। নূরজাহান বেগম ছোটবেলায় খুব চঞ্চল ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ হলে বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যাপীঠে নূরজাহান বেগম ভর্তি হন। কবি নজরুল নূরজাহানদের বাসায় যাতায়াত করতেন বলে তিনি তাঁর সানি্নধ্য লাভ করেন। কোলকাতায় থাকাবস্থায় বেগম পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৫২ সালে নূরজাহান বেগম কোলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি আরো বলেন, চাঁদপুরে আমরা তাঁকে আনতে পারিনি। চাঁদপুর ফাউন্ডেশন থেকে তাকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়।
 

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর