শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১
logo
দেশে মোবাইল ব্যাংকিং বিপ্লব, আছে ঝুঁকিও
প্রকাশ : ২৬ জুন, ২০১৫ ২২:১৩:০৩
প্রিন্টঅ-অ+
ব্যবসা ওয়েব

ঢাকা: মোবাইল ব্যাংকিং চালুর চার বছরের মাথায় এটা যেমন জনপ্রিয় হয়েছে, তেমনি এই ব্যাংকিং সেবায় প্রাতারণা এবং অবৈধ অর্থ পাচারেরও অভিযোগ উঠেছে৷ তবে ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো ব্যবস্থাকেই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত বলা যায় না৷
দেশে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয় ২০১০ সালে৷ ২৮টি ব্যাংক অনুমোদন দেয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের৷ এর মধ্যে ১৯টি ব্যাংক মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে৷ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের ভিত্তিতে সাড়ে চার লাখেরও বেশি এজেন্ট এই নগদ টাকা লেনদেনের কাজ করছেন৷ আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এখন গড়ে প্রতিদিন ৩৩৩ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই মোবাইলের মাধ্যমে৷ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে দুই কোটি ৩০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫ ভাগ৷
মোবাইল ফোন থাকলেই যে কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন আর টাকা লেনদেন করতে পারেন বাংলাদেশের যে কোনো স্থান থেকে৷ তাকে ব্যাংকের শাখায় যেতে হয় না৷ মোবাইল ফোনের কল রিচার্জ বা ‘ফ্লেক্সিলোড' করেন যারা, তারাই অ্যাকাউন্ট খুলে দেন, ব্যাংকের হয়ে তারাই টাকা-পয়সা লেনদেন করেন৷
মোবাইল ফোন নম্বরটিই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট নম্বর৷ এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারেন তিনি৷ নগদ টাকা তুলতে মাঝখানে থাকেন একজন এজেন্ট৷ তারা মূলত ছোট ব্যবসায়ী, যারা নিজের দোকান-ঘরেই লাইসেন্স নিয়ে থাকেন ব্যাংকের কাছ থেকে৷ অর্থাৎ মোবাইল ব্যাংকিং মানুষের সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে, কমিয়েছে ভোগান্তি৷ এ কারণেই এ পদ্ধতি এত দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে৷
তবে বাংলাদেশে যারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করেন, তাদের বেশিরভাগেরই নিজেদের কোনো অ্যাকাউন্ট নেই৷ তারা এজেন্টদের মাধ্যমেই টাকা লেনদেন করেন৷ এক হিসেবে দেখা গেছে ৮০/৯০ শতাংশ টাকা লেনদেন নিজস্ব অ্যাকাউন্ট ছাড়া৷
গড় হিসেবে দেখা যায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ৬০০-৭০০ টাকা থেকে শুরু পাঁচ হাজার টাকার লেনদেনই বেশি৷ সাধারণত যারা অল্প আয়ের মানুষ এবং যারা ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার মতো দক্ষ নন, তাদের একটি বড় অংশ এই ব্যাংকিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন৷ তাছাড়া এই সেবায় যখন তখন টাকা পাঠানো এবং গ্রহণ করা যায়, যা এই সেবা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ৷
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা লেনদেনে শতকরা দুই টাকা খরচ হয়৷ এতে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা লেনদেন করা যায়৷ তবে কেউ চাইলে একাধিক এজেন্ট বা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরো অনেক বেশি টাকা লেনদেন করতে পারেন৷ এছাড়া এই লেনদেনের তেমন কোনো তথ্য থাকে না৷ এজেন্টের মাধ্যমে করলে যার কাছে টাকা পাঠান হয়, তার মোবাইল নম্বর ছাড়া আর কোনো তথ্যই থাকে না৷ একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি৷ মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে অবৈধ কাজে টাকা ব্যবহার অনেক সহজ হয়েছে৷ কারণ কে টাকা পাঠাচ্ছেন, কার কাছে পাঠাচ্ছেন এবং কেন পাঠাচ্ছেন তা জানা সম্ভব নয়৷''
তিনি জানান, ‘‘এর বাইরে এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারণার অভিযোগও আজকাল পাওয়া যাচ্ছে৷ ভুয়া মেসেজের মাধ্যমে এজেন্টরা যেমন টাকা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি গ্রাহকের টাকাও তুলে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে৷''
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মোবাইল ব্যাংকিং শুরু করে ডাচ বাংলা ব্যাংক৷ ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আবুল কাশেম মো. শিরিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘এজেন্টরা বেশ কিছু বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে৷ যিনি টাকা পাঠাচ্ছেন এবং যিনি তা গ্রহণ করছেন, তার কোনো রেকর্ড রাখেন না তারা, যা অবৈধ৷''
বাংলাদেশে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ' মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সবচেয়ে আলোচিত নাম৷ এই বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা লেনদেন হয়৷ তাই বিকাশ-এর লেনদেনে প্রতারণার অভিযোগও সবচেয়ে বেশি৷ ব্র্যাক ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশে নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে৷ এত বড় কার্যক্রমে হয়ত কিছু দুর্বলতা রয়েছে৷ তবে আশা করছি খুব শিগগিরই এ সব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে৷''
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যমকে৷ তিনি বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা বাংলাদেশে বিকশিত হচ্ছে৷ একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে না৷ এজেন্টদের মাধ্যমে যেটা হচ্ছে, সেটাকে আমরা নিরুৎসাহিত করছি৷ আমরা ব্যাংকগুলো বলছি প্রতিনিয়ত তদারকি করতে৷''
বাংলাদেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং বিল গেটস৷ তিনি বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ে তথ্য-প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় আর্থিক সেবা এখন গরীবের কাছে পৌঁছে গেছে৷ ধনীরা ঋণ মঞ্জুর এবং ইনস্যুরেন্সসহ অন্যান্য আর্থিক সেবা ব্যাংক থেকে নিতে পারেন, কিন্তু গরীবদের সেখানে সুযোগ একেবারে কম৷ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে টাকা আদান-প্রদান আর্থিক সেবার ব্যয় কমায়৷''
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশে রীতিমত বিপ্লব হয়েছে৷ তবে এটাকে সত্যিকার অর্থেই ব্যাংকিং করে তুলতে হবে৷ নয়ত বড় রকমের ঝুঁকি আছে৷ যদি এখনই মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা না হয়, তাহলে এটা দেশের ভেতরে অবৈধ অর্থ লেনদেনের বড় মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে৷''
প্রসঙ্গত, মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের মধ্যে গ্রাহকদের পছন্দের সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থ স্থানান্তর (পিটুপি), নগদ জমা (ক্যাশ ইন) এবং নগদ উত্তোলন (ক্যাশ আউট)৷ একই সঙ্গে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস ব্যবহার করে বেতন-ভাতা প্রদানও ইউটিলিটি বিল পরিশোধের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে৷- ডিডব্লিউ।

ব্যবসা-অর্থনীতি এর আরো খবর