শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১
logo
চকবাজারেই দৈনিক অর্ধকোটি টাকার ইফতার বিক্রি
প্রকাশ : ২৪ জুন, ২০১৫ ১৩:১৮:০৬
প্রিন্টঅ-অ+
ব্যবসা ওয়েব

ঢাকা: বছর ঘুরে আবার এসেছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংযমের মাস রমজান। সিয়াম-সাধনার মধ্যে দিয়ে মাসটি কাটায় এ ধর্মের মানুষেরা। ধর্মীয় বিধান অনুসারে ফজরের নামাজের আগে সেহেরি খেয়ে রোজা শুরুর পর সন্ধ্যায় ইফতারি খেয়ে একটি রোজা শেষ করেন সারা বিশ্বের মোসলমানরা।
ইফতার যেহেতু রোজার মাসের একটি প্রধান অনুষঙ্গ তাই এটি নিয়ে আয়োজনের কমতি থাকে না মোসলমানদের মাঝে। রাজধানী ঢাকার ইফতার আয়োজনে বরাবরই নেতৃত্ব দেয় চকবাজার। এ বছরেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। প্রথম রোজা থেকেই ঐতিহ্যবাহী এ ইফতার বাজারে বেচাকেনার ধুম পড়েছে। প্রতিদিন এ বাজারে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ইফতার বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে এ বাজারের ইফতার সামগ্রী বিক্রিতে মাসিক লেনদেন প্রায় ১৫ কোটি টাকা দাঁড়াবে বলে মনে করছে চকবাজার বণিক সমিতি।
অন্যান্য বছরের মতো এবারও রোজার প্রথম দিন থেকে ছোট বড় ২ শতাধিক দোকান বসেছে ইফতারসামগ্রী নিয়ে। এর বেশির ভাগই অস্থায়ী দোকান। তবে আনন্দ বেকারি, আরমানিয়া, আলাউদ্দিন সুইটস, বোম্বে সুইটসসহ প্রায় ৩০টির মতো স্থায়ী দোকানে ইফতার বেচাকেনা হচ্ছে। এছাড়া বাকিগুলো অস্থায়ীভাবে দোকান বসিয়ে ইফতার বিক্রি করছে।
চকবাজারে বাংলাদেশ মনিহারী বণিক সমিতির খসড়া হিসাব অনুযায়ী, ২ শতাধিক দোকানের মধ্যে বড় দোকান রয়েছে ৩০টি। এসব বড় দোকানের প্রতিটিতে দৈনিক গড়ে এক লাখ টাকার ইফতার সামগ্রী বিক্রি হয়। এতে ৩০টি দোকানে দৈনিক ৩০ লাখ টাকার ইফতার বিক্রি হচ্ছে। বাকি ১৭০ থেকে ১৮০টি ছোট অস্থায়ী দোকানের প্রতিটিতে দৈনিক ১০ হাজার টাকার ইফতার বিক্রি হচ্ছে।
বাংলাদেশ মনিহারী বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আনিসুর রহমান নাসের বাংলামেইলকে জানান, চকবাজারে দুই শতাধিকের উপরে দোকান রয়েছে, যারা ইফতার সামগ্রী বিক্রি করেন। বড় দোকানগুলোতে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিক্রি হয়। অনেক দোকানে দুই লাখ টাকার উপরেও বিক্রি হয় রোজ। সে হিসেবে ইফতার বাজারে দৈনিক গড়ে লেনদেন ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আসলে চকবাজারের ইফতারের একটা নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইফতার সামগ্রীর গুণগত মান বাড়ছে না। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের ইফতার সামগ্রীর গুণগত মান খুবই ভালো। এ কারণে দূর দূরান্ত থেকে লোকজন ইফতার সামগ্রী নিতে চকবাজারে আসেন। ফলে ইফতার বাজারের লেনদেন ক্রমেই বাড়ছে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চকবাজার বড় শাহী মসজিদের সামনে বিশাল গলিতে জমে উঠেছে ইফতার বাজার। রাস্তার মাঝখানেই সারি সারি দোকান। দোকানগুলোর উপরে পলিথিন বা বৃষ্টিরোধক পর্দা টানিয়ে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি দোকানে দুপুরের আগেই থর থরে করে সাজানো হয় ইফতার সামগ্রী। দুপুর থেকেই শুরু হয় ক্রেতাদের ভিড়। সময় যতই গড়াতে থাকে ততোই বাড়তে থাকে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সমাগম। ইফতারের আগের মুহূর্তে মানুষের কোলাহল বেড়ে যায়। দোকানগুলোতে সাজানো রকমারি ইফতার বিক্রির ধুম পড়ে যায় তখন। এতো বেশি ইফতার সামগ্রী নিয়ে বাজার বসতে রাজধানীর আর কোথাও দেখা যায়না।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিফ সাসলিক কাবাব, চিকেন সাসলিক কাবাব, জালি কাবাব, টিকা কাবাব, কোয়েল ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই, চিকেন চপ, কিমা পরোটা, শাক ফুলঝুরি, মোঘলাই পরোটা, ফালুদা, পান্তোয়া, পাটিসাপটা, রুস্তম মিয়ার শাহী সূতি কাবাব, গরুর সূতি কাবাব, বটি কাবাব, রেশমি জিলাপি, শাহী হালিম, কাশ্মিরী শরবত, অ্যারাবিয়ান কাবাব, কচুরি, ফুল্লরি, শাকপুলি, টিক্কা কাবাব, ডিম চপ, কাচ্চি, তেহারি, মোরগ পোলাও, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, মোল্লার হালিম, নূরানি লাচ্ছি, পনির, পেস্তা বাদামের শরবত, লাবাং, ছানামাঠা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ, পিঁয়াজুসহ নানা পদের খাবার সাজিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়িরা। এছাড়া অসংখ্য মুখরোচক খাদ্যদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে চকবাজারের ইফতারির দোকানগুলোতে।
আলাউদ্দিন সুইটসের মালিক আমির উদ্দিন জানান, চকবাজারে তাদের দুটি শাখা রয়েছে। দুই শাখা মিলে রোজায় প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার ইফতারসামগ্রী বিক্রি হয়।’
ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডে তার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে- এমন অভিযোগ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা আমাদের ব্যবসার সুনাম নষ্ট করছে। তাই আমাদের অনুরোধ জরিমানা করার পূর্বে ভালো করে যেন যাচাই-বাছাই করা হয়।’
আনন্দ বেকারীর মালিক সালাউদ্দিন বলেন, ‘চকবাজার ঐতিহ্যবাহী একটি ইফতার বাজার। আমাদের পণ্যের গুনগত মান অনেক ভালো থাকায় অনেক দূর দূরান্ত থেকে কাস্টমার আসে। আমরা কাস্টমারদের সেবায় যথেষ্ট আন্তরিক।’
পুরান ঢাকার ইফতার বাজারের একটি বিখ্যাত আইটেমের নাম- বড় বাপের পোলায় খায়। ইফতারের সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই এ খাবার বিক্রেতাদের হাঁকডাক বেড়ে যাচ্ছিল। বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায়- ছন্দ মিলিয়ে এমন কথা বলতে বলতে বিক্রেতাদের ঐতিহ্যবাহী এ খাবারটি বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছিল।
বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি করে এমন একটি দোকানের কর্ণধার সালেহীন বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে এটা আমাদের বাপ-দাদায় বিক্রি করতো। এখন আমরা এই বড় বাপের পোলায় খায় বিক্রি করি। পাকিস্তানে আমলে এটার নাম ছিল সাসলিক ভর্তা। আর বাংলাদেশ হওয়ার পর এটার নাম হয়েছে বড় বাপের পোলায় খায়। আর এটা ঠোঙায় ভরে নিয়ে যায়। এজন্য আমরা বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙায় ভইরা লইয়া যায় স্লোগান ঠিক করেছি।’
তিনি জানান- ডিম, কলিজা, আলু, মরিচ, গরুর মগজ, খাসির মগজ, মুরগির মাংসের কুচি, গিলা, কলিজা, সুতি কাবাব, চিড়া, বুটের ডালসহ প্রায় ৩২ পদের খাবার ও মশলা দিয়ে বড় বাপের পোলায় খায় বানানো হয়।
চলতি বছর এ খাবারটি গতবছরের চেয়ে একটু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ বছর এ খাবারটি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
সালেহীন বলেন, ‘আমাদের দোকানে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকার ইফতার সামগ্রী বিক্রি হয়।’
 

ব্যবসা-অর্থনীতি এর আরো খবর