শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
logo
থানায় আগুন, জঙ্গল পালাল পুলিশ
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৮:৩৫:২৪
প্রিন্টঅ-অ+
পশ্চিম ওয়েব
বর্ধমান: সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে, শুক্রবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই বর্ধমানের আউশগ্রামে দফায়-দফায় থানায় ঢুকে ভাঙচুর করে আগুন লাগাল জনতা। বেধড়ক মার খেয়ে দুই সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই)-সহ ছয় পুলিশকর্মী জখম হন। তাঁদের মধ্যে এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রাণ বাঁচাতে পুলিশকর্মীরা কেউ থানার লক-আপে, কেউ মালখানায়, কেউ পাঁচিল টপকে পিছনের জঙ্গলে আশ্রয় নেন। রাতে ওই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গুসকরার প্রাক্তন পুরপ্রধান তথা তৃণমূল কাউন্সিলর চঞ্চল গড়াই-সহ ১১ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

হামলার পরে সে সময় থানার ‘ডিউটি অফিসার’ এসআই দীপককুমার পাল প্রকাশ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘‘(জনতা) এমন ধাক্কা মারল পড়ে গেলাম। তার পরে গোড়ালি দিয়ে মারল। বড়-বড় পাথর মারছিল। ওই পাথরের মুখে দাঁড়াতে পারি!’’

ঘটনায় ‘দুর্লক্ষণ’ দেখছেন বিরোধীরা। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর কথায়, ‘‘পুলিশ ও প্রশাসন পুরোদস্তুর তৃণমূলের দলদাসে পরিণত হওয়ায় বাংলায় নৈরাজ্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশের উপরে মানুষের সার্বিক অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। সেটাই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়, রসপুঞ্জ এবং বর্ধমানের আউশগ্রামের ঘটনায় প্রমাণিত।’’

মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এ দিন বলেন, ‘‘এ সব বরদাস্ত করা হবে না। যে-ই দোষী হোক, ধরা হবে। গুন্ডামি সহ্য করা হবে না।’’ আউশগ্রামের পর্যবেক্ষক তথা তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘‘চঞ্চলবাবু গ্রেফতার হওয়াতেই স্পষ্ট, তৃণমূল জমানায় পুলিশ রাজনৈতিক রং না দেখেই কাজ করছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আরও যা খবর পেলাম, এর পিছনে সিপিএম-ও রয়েছে। আরও কেউ থাকতে পারে।’’ পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার আউশগ্রামে তিনি বড় সভা করবেন।

বর্ধমানের সিপিএম নেতা অমল হালদার পাল্টা বলেন, ‘‘তৃণমূলের এক গোষ্ঠীর মদতেই হামলা হয়েছে। এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই।’’ বর্ধমানের জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন বলেন, ‘‘কেন এমন হামলা, তা পরিষ্কার নয়।’’

আউশগ্রাম হাইস্কুলের পাশে নিকাশির জায়গায় এক সিভিক ভলান্টিয়ার অবৈধ নির্মাণ করছেন, এই অভিযোগ জানাতে শুক্রবার কিছু শিক্ষক ও পড়ুয়াকে নিয়ে থানায় যান স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতি

চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদে অভিভাবকেরা পথ অবরোধ করলে আইসি ইমতিয়াজ খানের নেতৃত্বে ফের লাঠি চালায় পুলিশ। পাল্টা মারে জখম হন আইসি-সহ দু’জন পুলিশকর্মী।
চন্দ্রনাথবাবু ও এক শিক্ষক-সহ তিন জনকে আটক করা হয়। শিক্ষককে সে রাতে ও চন্দ্রনাথবাবুকে এ দিন সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রের খবর, এ দিন সকাল ১১টা নাগাদ স্কুলে জড়ো হন কয়েকশো বাসিন্দা। চন্দ্রনাথবাবু ও শিক্ষকেরাও পৌঁছন। কী ভাবে পুলিশ তাঁদের মারধর করেছে, বাসিন্দাদের সেই বিবরণ দেন তাঁরা। স্কুলের তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়, অন্তত ১০ হাজার লোকের সই সংগ্রহ করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পুলিশের ‘বর্বরতা’র প্রতিবাদ জানানোর। তবে সে সব শুনে জনতার একাংশ খেপে ওঠে। স্কুলের এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘আমরা তাঁদের শান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলি। কিন্তু তাঁরা তাতে কান দেননি। সোজা থানায় চলে যান।’’

স্কুলের দু’পা দূরেই থানা। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হুড়মুড় করে থানা চত্বরে ঢুকে ইট-পাটকেল ছুড়তে শুরু করে জনতা। থানার নাম লেখা বোর্ড ভাঙা হয়। সামনে পড়ে কয়েক জন পুলিশকর্মী বেধড়ক মার খান। গুরুতর আহত হন সজল মল্লিক নামে এক পুলিশকর্মী। সিভিক ভলান্টিয়ার, কনস্টেবল, ডিউটি অফিসার  থেকে থানায় হাজির এক ডিএসপি— যে যে দিকে পারেন পালান। এক পুলিশকর্মীর কথায়, ‘‘চেয়ার-টেবিল উল্টে, নথিপত্র তছনছ করে হামলাকারীরা। গাড়ি ভাঙচুর করে।’’ তাঁর আক্ষেপ, ‘‘ওরা অন্তত শ’তিনেক লোক আর আমরা কয়েক জন। কী আর করা যাবে!’’

স্থানীয় সূত্রের খবর, সে সময় স্কুলের শিক্ষক, পরিচালন সমিতির সদস্যেরা বুঝিয়েসুঝিয়ে তখনকার মতো জনতাকে সরিয়ে দেন। কিন্তু খানিক পরেই ফিরে আসে এক দল লোক। থানা লাগোয়া পুলিশ ব্যারাকে ঢুকে ভাঙচুর চালায় তারা। রান্না করা খাবার নষ্ট করে। খাট, ক্যারম বোর্ড, টিভি ভেঙে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে ফের কিছু লোক এসে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। গেটের কাছে অস্থায়ী বিশ্রামঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পৌঁছন জেলা পুলিশের কর্তারা। র্যাফ নামে। জেলার পুলিশ সুপার কুণাল অগ্রবাল বলেন, ‘‘ঘটনায় কারা জড়িত ও কারা ইন্ধন জুগিয়েছে, দেখা হচ্ছে।’’ আরও জনা পনেরোকে আটক করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে গিয়ে এ দিন দেখা গিয়েছে, থানা-পুলিশ ব্যারাক— সর্বত্রই তাণ্ডবের চিহ্ন।  উল্টে রয়েছে টেবিল, ভাঙা কাচের টুকরো ছড়ানো এখানে-ওখানে। অস্থায়ী বিশ্রামঘরের পোড়া কাঠামো তখনও জ্বলছে।

জেলা পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, শুক্রবারের অবরোধে সিপিএমের মদত ছিল। এ দিনের হামলায় সিপিএম এবং তৃণমূলের একাংশের ইন্ধন রয়েছে। স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব অবশ্য বলছেন, স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি তথা এলাকার তৃণমূল নেতা চন্দ্রনাথবাবু ছাড়া পাওয়ার পরেই তাঁর কিছু অনুগামী অবৈধ নির্মাণে অভিযুক্তের বাড়িতে চড়াও হয়। তা থেকেই অশান্তির শুরু।

অভিযোগ অস্বীকার করে চন্দ্রনাথবাবু বলেন, ‘‘উত্তেজিত অভিভাবকদের বাড়ি চলে যেতে বলেছিলাম। তার পরেও এমন কেন ঘটল জানি না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকছে।’’ তৃণমূল সূত্রের খবর, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ঘটনায় স্থানীয় বিধায়ক অভয়ানন্দ থান্দারের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর আরও উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছেন তাঁরা। বিধায়ক শুধু বলেন, ‘‘আইন আইনের পথে চলবে।’’

 নবান্ন সূত্রের খবর, ঘটনার জেরে আউশগ্রাম থানার আইসি-কে মালদহে বদলি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশমতো থানা ভাঙচুরে জড়িতদের কাছ থেকে কি ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে? জেলাশাসক বলেন, ‘‘রিপোর্ট পাওয়ার পরেপদক্ষেপ করা হবে।’ সংবাদ পক্ষ্য

পশ্চিম বাংলা এর আরো খবর