মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯
logo
চুপচাপ পাহাড় দখলের ঘুঁটি সাজাচ্ছে তৃণমূল
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৫:৩০:১৭
প্রিন্টঅ-অ+
পশ্চিম ওয়েব

নয়া দিল্লি: পৃথক রাজ্যের আবেগ কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে৷ মোর্চার শেষ অস্ত্র ওই আবেগে যেন মরচে ধরেছে৷ উন্নয়নের বাস্তবতার মুখে ওই অস্ত্রে আর জাগানো যাচ্ছে না পাহাড়কে৷ সেই সুযোগে গোকুলে বাড়ছে তৃণমূল৷ সমতল বিজয়ের পর অতি সন্তর্পণে চলছে শাসকদলের পাহাড় অভিযান৷ বড় জনসভা নয়৷ সংবাদপত্রে ঘন ঘন বিবৃতি পাঠানো নয়৷ মোর্চা ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেয়া জিটিএর চেয়ারম্যান প্রদীপ প্রধান এখন ঘাসফুল শিবিরের তুরুপের তাস৷
প্রতিদিনই পাহাড়ের কোনো না কোনো প্রান্তে দৌড়াচ্ছেন৷ কোথাও ঘরোয়া বৈঠক৷ কোথাও ছোট মাপের সভা৷ কোনো দিন তার সঙ্গে প্রাক্তন জিএনএলএফ বিধায়ক শান্তা ছেত্রী৷ কোনো দিন সঙ্গী তৃণমূলের পাহাড় কমিটির আহ্বায়ক রাজেন মুখিয়া৷
কাউকে মোর্চা ছাড়ার কথা বলছেন না প্রদীপ৷ গল্প করছেন৷ বলছেন মোর্চা নেতাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা৷ জিটিএ কিংবা মোর্চা পরিচালিত পুরসভাগুলির সঙ্গে যে উন্নয়নের কোনও সম্পর্ক নেই, তার কথার সঙ্গে সেই বাস্তবতাকে মিলিয়ে নিচ্ছেন পাহাড়ের বাসিন্দারা৷
অন্যদিকে, চোখের সামনে দেখছেন বাস্তবে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পাহাড়ে চলছে পর্যটন বিকাশের কর্মযজ্ঞ৷ তাতে দু'হাতে টাকা ঢালছে রাজ্য সরকার৷ অথচ পাহাড়বাসী ভুগছেন জলকষ্টে৷
প্রত্যন্ত এলাকায় রাস্তাঘাটের বালাই নেই, নেই বিদ্যুতের সংযোগ৷ শহরগুলিতে পুর পরিষেবা বলতে যা বোঝায়, তার চিহ্নমাত্র নেই৷
কিন্তু ৫০ কোটি টাকা খরচ করে যামুনিতে লেক তৈরি করছে পুরসভা, যাতে সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না৷ বরং বাজিমাত হচ্ছে ঠিকাদারদের৷ জিটিএর তত্ত্বাবধানে যদি কারও লাভ হয়ে থাকে, তা হচ্ছে ঠিকাদারদের৷ প্রদীপ যত বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলছেন, তত মোর্চার প্রতি রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন পাহাড়বাসী৷ তাতেই কিস্তিমাত করছে তৃণমূল৷ দলের পাহাড় কমিটির আহ্বায়ক রাজেন মুখিয়া বলেন, 'মোর্চার দুর্নীতি নিয়ে এতদিন আমরা যা বলতাম, সেটা এ বার লোকে ওদেরই লোক প্রদীপ প্রধানের মুখে শুনছেন৷ আর তৃণমূল যে উন্নয়ন চায়, সেটা মানুষকে আরো সহজে বোঝাতে পারছি আমরা৷'
পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব বলেন, 'রাজ্য সরকার পাহাড়ের সামগ্রিক উন্নয়ন চাই, সেটাই আমরা সাধারণ মানুষকে বলছি৷'
এতদিন কাজ না হলেও প্রদীপের মুখে শুনে শুনে পাহাড়বাসীর ধারণা হচ্ছে, উন্নয়ন হতে পারে রাজ্য সরকারের হাত ধরে৷ সেজন্য শাসক শিবিরে যোগ দেয়াই শ্রেয়৷ ফলে ধস নামছে মোর্চার ভোটব্যাঙ্কে৷ পৃথক রাজ্যের দাবি কিংবা রাজ্যের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগও সেই ধসকে আরো ঠেকাতে পারছে না বলে দাবি করছেন জিটিএর চেয়ারম্যান প্রদীপ৷ পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে পূজার পর্যটন মরসুম শেষ হতেই গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন শুরু করার হুমকি দিয়ে রেখেছেন মোর্চা সভাপতি বিমল গুরুং৷ পাহাড়বাসীর মন জয়ে এতদিন এই দাবিটাই ছিল স্পর্শকাতর৷ কিন্তু এ বার তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না৷ বরং দলবদলের চোরাস্রোত সমতল থেকে ঠেলে উঠছে পাহাড়ে৷
তৃণমূল যেদিন যেখানে সভা করছে, পরদিন সেখানে পাল্টা সভা করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না মোর্চা নেতারা৷
তৃণমূল সূত্রের খবর, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে নভেম্বর-ডিসেম্বরে পুর নির্বাচনের আগে একঝাঁক মোর্চা নেতা তৃণমূলে যোগ দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না৷ দলে ভাঙন অবশ্য প্রকাশ্যে মানেন না মোর্চা নেতারা৷
বরং প্রসঙ্গ এড়াতেই ব্যস্ত তারা৷ দলের সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি শুধু বলেন, 'পাহাড়ে মোর্চাই শেষ কথা৷' বুধবার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর তিন দিনের পাহাড় সফর তৃণমূলের অভিযানে আরো গতি আনবে বলে মনে করা হচ্ছে৷ মুখ্যমন্ত্রী তিন দিনই কালিম্পংয়ে থাকবেন৷ সেখানে পাহাড়ের সমস্ত তৃণমূল নেতাকে থাকতে বলা হয়েছে, যাতে মুখ্যমন্ত্রী প্রয়োজন হলে তাদের ডেকে নিতে পারেন৷
প্রদীপ প্রধান বলেন, 'মুখ্যমন্ত্রী কালিম্পংয়ে আসছেন৷ আমিও যাচ্ছি৷ তিনি সময় দিলে সংগঠন নিয়ে কিছু প্রস্তাব দিতে চাই৷' তৃণমূল সূত্রে খবর, পাহাড়ের জন্য তৃণমূলের পৃথক জেলা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেবেন প্রদীপ৷
তার মতে, না-হলে মোর্চায় ভাঙন ধরিয়ে দলের স্ফীতি সামাল দেয়া যাবে না৷ এতদিন একটি কমিটি থাকলেও তার নিয়ন্ত্রণ থাকত শিলিগুড়ির নেতাদের হাতে৷ পাহাড়কে নিয়ন্ত্রণে নিতে গত দু'বছর ধরে কার্যত প্রতি মাসেই পাহাড় সফর করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ পর্যটনের উন্নতির জন্য টাকা ঢালার পাশাপাশি মোর্চাকে দুর্বল করতে জনজাতিদের নিয়ে একের পর এক উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করে দিয়েছেন, বাকি ছিল তৃণমূলের নিজস্ব ভিত তৈরি৷
শান্তা ছেত্রী, সারদা রাই সুব্বা, রাজেন মুখিয়াদের দিয়ে এতদিন সেই চেষ্টার পর এ বার কফিনের শেষ পেরেকটা পুঁতে দিতে তৃণমূল অস্ত্র করেছে প্রদীপ প্রধানকে৷ নভেম্বর-ডিসেম্বরে পুর নির্বাচনের পর জিটিএ নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷
সরকারিভাবে মুখ্যমন্ত্রীর কালিম্পংয়ের কর্মসূচি শুধু লেপচা ও তামাং উন্নয়ন পর্ষদের বার্ষিক অনুষ্ঠান৷ কিন্তু তৃণমূল সূত্রের খবর, সংগঠনের খুঁটিনাটি বুঝতেই তার এ বারের পাহাড় সফর৷ উত্তরবঙ্গের প্রায় সমস্ত মন্ত্রীকেই সেখানে হাজির থাকতে বলা হয়েছে৷

পশ্চিম বাংলা এর আরো খবর