সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
logo
রিওতে বোল্ট, ইতিহাসের হাতছানি
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট, ২০১৬ ১১:২৬:২০
প্রিন্টঅ-অ+
ক্রীড়া ওয়েব

চাঁদপুর: জ্যামাইকার ত্রেলনি শহরের রাস্তায় সময় পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট আর ফুটবলেই মেতে থাকত সে। ১২ বছর বয়সে উইলিয়াম মেমোরিয়াল স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটারে চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু তখনো স্প্রিন্টার হওয়ার স্বপ্ন জেকে বসেনি। লক্ষ্যটা ছিল ক্রিকেটেই। কিন্তু তাতে সমস্যা দেখা দিল। আর তা হলো প্রবল গতি। ক্ষিপ্র গতিতে রান নিতে পারত সেই কিশোর। এক রানের জায়গা দুই রান, যদিও সতীর্থ ব্যাটসম্যান তখন রান আউটের কবলে। ‍এমন অবস্থায় দলের কোচ বললেন, ‘ক্রিকেট তোমার জায়গা না, তুমি বরং ঝড় তোলো ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে, গতির ঝড়।’
লক্ষ্যটা বেঁকে গেল। সঙ্গে নাম, যশ খ্যাতির দুয়ারও যেন খুলে গেল। তখনও হয়তো সেই কিশোর জানত না, একদিন ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে তিনিই কাঁপাবেন গোটা বিশ্ব, এক নামেই চিনবে সবাই, হয়ে যাবেন ইতিহাসের অংশ। ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে যিনি থাকবেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিপক্ষ তাড়া করবে তাকে, আর তিনি তাড়া করবেন ইতিহাসকে। ২০০১ সালে স্কুল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এতকিছু কি ভেবেছিলেন উসাইন বোল্ট? মিডিয়াতে যিনি লাইটিনিং বোল্ট, বর্তমানে গ্রহের সবচেয়ে দ্রুততম মানব, অজেয় এক দৌড়বিদ।
তবে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের শুরুটা কিন্তু বোল্টের ছিল বেশ হতাশার। ১৪ বছর বয়সে ২০০১ সালে বৈশ্বিক কোন টুর্নামেন্টে প্রথম অংশগ্রহণ তার। বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশীপ তখন বসেছিল হাঙ্গেরিতে। ১০০ মিটারে যাননি বোল্ট, নাম লিখিয়েছিলেন ২০০ মিটারে। কিন্তু হায়, হিটেই বাদ, খেলা হয়নি ফাইনাল। অঝোরে কেঁদেছিলেন তরুণ বোল্ট, মাথায় হাত দিয়ে সান্তনা দিয়েছিলেন মা জেনিফার। হয়তো বলেছিলেন, ‘হারের মধ্যেই সাফল্যের বীজ লুক্কায়িত থাকে’।  
ফলে এক বছর পরই কিনা দেখা মিলল প্রথম সাফল্যের। সেটা ঘরের মাঠেই। ২০০২ সালে জ্যামাইকার কিংসটনে বসেছিল বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশীপ। বোল্ট মাতালেন ২০০ মিটারে। ২০.৬১ টাইমিংয়ে জিতলেন প্রথম বৈশ্বিক স্বর্ণ। বয়স তখন মাত্র ১৫, তবে শরীর দেখে তা বুঝার উপায় ছিল না। কারণ উচ্চতা তখনই ৬ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। বোল্ট ইতিহাসের নবম অ্যাথলেট, যিনি জিতেছেন ইয়ুথ, জুনিয়র, সিনিয়র লেভেলে বৈশ্বিক স্বর্ণ।
বোল্টের প্রথম অলিম্পিক ২০০৪ সালে অ্যাথেন্সে। তবে ভাগ্য সহায় হয়নি। ১০০ মিটারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ২০০ মিটারে করার ইচ্ছা থাকলেও ইনজুরি সব ভণ্ডুল করে দেয়। শেষ মুহূর্তে চোট হতাশ করে তাকে। তবে বোল্টের উত্থান বেইজিং অলিম্পিক থেকেই। স্কুল লাইফে প্রথম ১০০ মিটারে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বেইজিংয়ে দেখান এই ইভেন্টে আধিপত্য। ৯.৬৯ সেকেন্ডে অলিম্পিক রেকর্ড গড়ে জেতেন ১০০ মিটারে স্বর্ণ। ২০০ মিটারেও অলিম্পিকে নতুন রেকর্ড। ১৯.৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে জেতেন ডাবল। এরপর আসে ৪০০ মিটার দলগত রিলেতেও স্বর্ণ। শুরু হয় বোল্ট বন্দনা। বাকিটা ইতিহাস।
১০০ ও ২০০ মিটারে বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী বোল্ট। তবে সেটা অলিম্পিকে নয়, বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশীপে। দুটি রেকর্ডই তিনি গড়েছিলেন ২০০৯ সালে বার্লিনে। ১৬ আগস্ট, ১০০ মিটারে স্প্রিন্টে বোল্ট স্বর্ণ জিতলেন ৯.৫৮ সেকেন্ডে। ২০ আগস্ট, ২০০ মিটার জিতলেন ১৯.১৯ সেকেন্ডে। এই ‍দুটি রেকর্ডের ধারের কাছে শুধু মাত্র বোল্টই যেতে পেরেছেন কয়েকবার। বাকিরা যোজন যোজন দূরে।
চার বছর পর লন্ডন অলিম্পিক গেমসেও স্বরুপে বোল্ট। তিন ক্যাটাগরিতেই স্বর্ণ জিতলেন (১০০, ২০০, ৪ গুনিতক ১০০)। ৯.৬৩ সেকেন্ডে জিতলেন ১০০ মিটার, যা বোল্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টাইমিং। তবে এবার ৪০০ মিটার রিলেতে গড়লেন বিশ্বরেকর্ড, ৩৬. ৮৪ সেকেন্ডে। টানা দুই অলিম্পিকে ছয়টি স্বর্ণ, নিজেকেই ছাড়িয়ে যেতে লাগলেন বোল্ট।  
সেই বোল্ট এবার ব্রাজিলের রিও অলিম্পিক গেমসে। কেমন করবেন, তা নিয়ে চলছে আগাম আলোচনা। উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট নিয়ে। গত দুই অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতেছেন ছয়টি। তার পরও নাকি নিজের সেরাটা দেওয়া বাকি উসাইন বোল্টের! নিজেকে উজাড় করে দিতে এবার এসেছেন রিওতে। আগের আসরের জেতা কোনো সোনাই হারাতে চান না এবারের অলিম্পিকে। বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই জ্যামাইকান এই গতি দানব বলেছেন, ‘আশা করছি রিওতে নিজের জীবনের সেরাটা দেব। ফুটবলের সেরা খেলোয়াড় নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু  দ্রুততম মানব একজনই, উসাইন বোল্ট। চেষ্টা করব নতুন বিশ্বরেকর্ডের। ২০০ মিটারে ১৯ সেকেন্ডের কম টাইমিং করার স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। সেটা না পারলেও বলতে পারি আমার আগের গড়া রেকর্ডগুলো টিকে থাকবে অনেক দিন।’
ব্যাট হাতে বোল্ট যখন ক্রিকেটার
তবে শংকা জাগছে তার চোট নিয়ে। কিছুদিন ধরেই তিনি চোটের সঙ্গে লড়ছেন। পারবেন কি নিজের সেরাটা দিতে? তবে বোল্টের ভাষায়, ‘আমি শুধু সেরা নই, কিংবদন্তি হতে চাই। এ জন্য হারলে তো চলবে না। একের পর এক জয়ে অন্যদের চেয়ে এতটা এগিয়ে যেতে চাই যেন সবাই কিংবদন্তি মেনে নেয় আমাকে।’
রিওতে এবারও বোল্টের প্রতিদ্বন্দ্বী জাস্টিন গ্যাটলিন। যিনি আগাম হুমকি দিয়ে রেখেছেন। স্বদেশী ইয়োহান ব্লেকও আছেন এই তালিকায়। তবে ট্র্যাকে নামলে সবকিছুই যেন বদলে যায়, পিছিয়ে থাকলেও কেমন করে যেন এগিয়ে যান বোল্ট। বেশী এগিয়ে থাকলে জগিংয়ের ভঙ্গিতে টাচলাইন স্পর্শ করেন। যা দেখে অন্য অ্যাথলেটদের চোখ ছানা বড়া। বোল্ট মানেই যেন বিদ্যুত গতি, মুহূর্তের মধ্যে পেছনে ফেলেন সবকিছুকে।
এখন শুধু অপেক্ষা ও দেখার বিষয়, রিওতে অলিম্পিকে হ্যাটট্রিক স্বর্ণ জয়ের নতুন ইতিহাস গড়তে পারেন কী না বোল্ট?

খেলা এর আরো খবর