শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০
logo
স্কুলে ইসলাম শিক্ষা বইয়ের আরবি পড়ানো হয় না!
প্রকাশ : ০৫ মে, ২০১৬ ১৫:৩৫:৪১
প্রিন্টঅ-অ+
বিশেষ ওয়েব

ঢাকা : ষষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের আরবি বানানে অসংখ্য ভুল রয়েছে। সেই ভুলেভরা ধর্মীয় বইটি বিগত চার বছর ধরে শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করানো হচ্ছে। বইয়ে কোনো ভুল পেলে তা জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) জানানোর নির্দেশনা থাকলেও এ পর্যন্ত কোনো শিক্ষকই ভুল সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে কিছু জানাননি।
এ বিষয়ে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক প্রীতিশকুমার সরকার বাংলামেইলকে বলেছেন, ‘বই বিতরণ করে আমরা শিক্ষকদের বলে দেই, বইয়ে কোনো প্রকার ভুল চোখে পরলে আপনারা তা এনসিটিবিকে জানাবেন। এতোদিন বইটি পড়ানো হলেও দুঃখের বিষয় কোনো শিক্ষক আমাদের কিছুই জানাননি।’
প্রধান সম্পাদকের দেয়া তথ্যের ওপর ভর করে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ইসলাম ধর্মের শিক্ষকদের আরবি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং দায়িত্বহীনতার বিষয়টি। তবে শিক্ষকরাও স্বীকার করেছেন যে, ক্লাসে ইসলাম শিক্ষা বইয়ে থাকা আরবি শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয় না।
এ বিষয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের কয়েকজনে শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দুই চারটি ভুল কারো কারো নজরে পড়েছে। তবে ভুলের বিষয়টিকে তারা কোনোভাবেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি।
বিগত ১০ বছর বিভিন্ন শ্রেণিতে ইসলাম শিক্ষা পড়াচ্ছেন মিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক আবদুর শাকুর। ষষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইটি ২০১৩ অর্থাৎ নতুন সিলেবাস অনুযায়ী বইটি প্রকাশের গোড়া থেকেই পড়াচ্ছেন তিনি। বইটিতে ৫৮টি ভুল আছে শুনে আঁতকে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘এতো ভুল তো আমার চোখে পড়েনি। তিন, চারটে ভুল পেয়েছি, সেগুলো শুদ্ধ করে ক্লাসে পড়িয়েছি।’
উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে আবদুর শাকুর জানতে চাইলেন, ‘এতো বড় বড় মাপের মানুষজন বই লেখেন, সম্পাদনা করেন, কীভাবে এতো ভুল থাকে? যোগ্যতর ভেবেই তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের ওপর বই লেখার মতো গুরুভার দিয়েছেন।’ তবে শিক্ষক হিসেবে সঠিক পাঠদান এবং ভুলগুলো এনসিটিবিকে জানানোর যে নৈতিক দায়িত্ব ছিল, সে ব্যাপারে নিশ্চুপ এ ধর্মীয় শিক্ষক।
মীরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ধর্মীয় শিক্ষক মো. খলিলুর রহমান। তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সরকার বই দেয়। যেমন বই দিবে তেমনই তো পড়াবো।’ এনসিটিবির নির্দেশনার কথা তুলে ধরলে তিনি বলেন, ‘এনসিটিবির বিষয়টি আমি জানি না।’
অবশ্য বিষয়টি না জানার জন্য ভুল স্বীকার করে খলিলুর রহমান বলেন, ‘এটা আমার জেনে নেয়ার দরকার ছিল। আসলে এরকম ভুল ধরিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি নেই। আমাদের এখানে ১৬ জন ধর্মীয় শিক্ষক আছেন। আমার চেয়ে প্রায় সবাই সিনিয়র। কেউ করে না, তাই আমারও আগ্রহ ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার্থীদেরকে আরবি পড়ানো হয় না। বাংলা অর্থ বা বাংলা উচ্চারণগুলো পড়ানো হয়। কারণ তারা আরবি পড়তে পারে না। এ কারণে আরবি যা আছে থাকুক। কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই।’
মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্যনুসারে সারা দেশে ১৬ হাজারের বেশি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন, যেসব স্কুলে দুই শিফটে পড়ানো হয় সেখানে দুজন, ক্ষেত্র বিশেষ (যেসব স্কুলে দুই শিফট এবং একই সঙ্গে চারটি করে শাখার ক্লাস নেয়া হয়। বালক-বালিকা অলাদা শাখা থাকে) প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী ইসলাম ধর্মের শিক্ষক রয়েছেন। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাবে, প্রতিবছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। সে হিসাবে, ১৬ হাজার প্রতিষ্ঠানে যদি ১৮ হাজার ইসলাম ধর্মের শিক্ষকও থাকেন, তাহলে ৩৬ হাজার অভিজ্ঞ চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ৪ বছর ধরে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীকে ভুল পড়ানো হয়েছে?
প্রশ্ন রেখেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে। তিনি জানালেন, শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়টি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান এবং সে জ্ঞান বিতরণের মনমানসিকতা থাকলেই কেবল শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা পেতে পারে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, ‘শিক্ষক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো- সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্যক জ্ঞান, সে জ্ঞান শেখানোর মানবিকতা। শেখানোটা অবশ্যই মানবিক বিষয়। যা উন্নত মন-মানসিকতা থাকলে কেবল সম্ভব। এবং সে বিষয় সম্পর্কে জানার কৌতুহল। শেখানোর মন-মানসিকতা না থাকলে অগাত জ্ঞানীও যেমন শেখাতে পারবেন না, তেমনি জ্ঞান নেই, আছে মানসিকতা, ফলাফল আগের মতোই। তিনিও শেখাতে পারবেন না।’
‘একজন শিক্ষক যখন ভুল পড়ান, সেটা বইয়ের ভুল বা না জানার কারণে, তখন সে শিক্ষকের মানসিকতার সঙ্গে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাটাও পরিষ্কার হয়ে যায়। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বাংলার শিক্ষক বাংলায়, ইংরেজির শিক্ষক ইংরেজিতে, গণিতের শিক্ষক গণিতে তেমনই ধর্মের শিক্ষক ধর্মে জ্ঞান রাখবেন। সেটা ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ- যে ধর্মই হোক। খুবই স্বাভাবিক ইসলাম ধর্মের শিক্ষক আরবি জ্ঞানে দক্ষ হবেন। হিন্দু ধর্মের শিক্ষক সংস্কৃত জ্ঞানে, বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক পালি জ্ঞানে জ্ঞানী হবেন। কারণ প্রত্যেকটি ধর্মের নিজস্ব একটা ভাষা আছে। ভুল শেখানোটা না শেখানোর চেয়ে মারাত্মক।’ যোগ করেন সিরাজুল ইসলাম।
এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা। শিক্ষকরা বলবেন আমরা টাকা পাই না। তবে সত্যি হচ্ছে আমরা যোগ্য শিক্ষক পাই না। যারা আছেন সবাই দায়সারা কাজ করছেন। এখনকার শিক্ষকদের মধ্যে জানার আগ্রহ-কৌতুহলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে আমাদের শ্রেণি কক্ষের পড়াশোনার দু’টি চিত্র ফুটে ওঠে। এক. ভুল পড়ানো হচ্ছে। দুই. পড়ানো হচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষকরা ভুল পড়াচ্ছেন অথবা পড়াচ্ছেন না। ফলাফল দাঁড়াচ্ছে শিক্ষকদের অজ্ঞতা অথবা দায়িত্বহীনতার কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষ সংবাদ এর আরো খবর