শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯
logo
৫০ বছর বিএনপির নেতৃত্বে থাকবে জিয়া পরিবারই!
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল, ২০১৬ ১৬:২৯:০৭
প্রিন্টঅ-অ+

খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, স্ত্রী জোবাইদা রহমান, তাদের সন্তান জাইমা রহমান

বিশেষ ওয়েব

ঢাকা : আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিটকে পড়তে পারেন পাশাপাশি দলে জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব নিয়ে সংশয় জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। তবে এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নেতাকর্মীরা বলছেন, আগামী অন্তত ৫০ বছর বিএনপির রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।  
২০১৫ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে গত বুধবার প্রকাশিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভূমিকায় বলা হয়েছে, পার্লামেন্টের সদস্য ও তাদের স্টাফদের নিরপেক্ষভাবে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি জানানোর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিষয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এটি ‘কমন্স ব্রিফিং পেপার’ নামে পরিচিত। তবে এ নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
ব্রিটিশ সংসদীয় এ প্রতিবেদনের একটি অংশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘ভবিষ্যতে কোনো একদিন বিএনপিতে তিনি তার মায়ের উত্তরাধিকারী হওয়ার আশা ধরে রেখেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রয়েছে। আর সে কারণে তিনি বর্তমানে লন্ডনে আছেন এবং সেখানেই তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় চাচ্ছেন।’
ব্রিটিশ প্রতিবেদনের ‘সারমর্ম’ অংশে বলা হয়েছে, বিএনপি ব্যাকফুটে চলে গেছে। দলটি ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধর্মঘট ও অবরোধের মাসগুলো পার করে ২০১৫ সালে দলটির আন্দোলন মরে গেছে। শুধু তাই নয়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে পৌরসভা নির্বাচন বর্জনের পরও দলটি গত ডিসেম্বরে এ ধরনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে খারাপ ফল পায়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে ২০১৯ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সংকল্প দেখা যাচ্ছে। সমালোচকরা সরকারের বিরুদ্ধে ‘ক্রমেই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার’ অভিযোগ করছে। কিন্তু সরকার তা নাকচ করছে।
‘বিএনপি ব্যাকফুটে’র এমন পর্যবেক্ষণ শুধু ব্রিটিশ প্রতিবেদনটির সারমর্মতেই নয়, মূল প্রতিবেদনের একটি অনুচ্ছেদের শিরোনামেও বলা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলন ২০১৫ সালে ক্রমান্বয়ে স্থিমিত হয়ে আসে। আর এটিকেই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আন্দোলনের সময় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে।
দি ইকনোমিস্টও বিএনপিকে ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাড়া দিতে অক্ষম’ দল হিসেবে বর্ণনা করেছে। ‘কৌশল পরিবর্তন?’ শিরোনামে এক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি খালেদা জিয়া ২০১৫ সালে প্রায়ই সংলাপের প্রয়োজনিয়তার কথা বলেছেন। পরবর্তী সংসদীয় নির্বাচন দুই বছর এগিয়ে আনার দাবিও তিনি তুলতে শুরু করেছিলেন। ২০১৯ সালে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যতোদ্রুত সম্ভব নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন সংসদ নির্বাচনের যে দাবি বিএনপি করছে তা মানা হলে দলটি তার অবস্থানে ছাড় দিতে পারে বলে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। তবে এ দাবি পূরণের সম্ভাবনা বাস্তবে অনেক দূরে। কারণ সরকার বিভিন্ন সময় সংলাপের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বললেও নির্বাচনকালীন পুরনো সরকার ব্যবস্থা (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) পুনর্বহাল করার আগ্রহের কোনো লক্ষণ দেখায়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি গত ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে দেশজুড়ে পৌরসভা নির্বাচন বর্জন করতে পারে বলেও জল্পনা-কল্পনা ছিল। তবে নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হবে না— এমন দাবি করেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত এতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ পদে জয়ী হয়।
‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাসে হামলায় একজন নিহত ও ২৭ জন আহত হওয়ার ঘটনার মামলায় গত বছর মে মাসে খালেদা জিয়া ও বিএনপির আরো ৩৭ নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। এটি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ নেই। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া ও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
গত বছর এপ্রিল মাসে খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কিত এক মামলায় জামিন পেয়েছেন। গত বছরের আগস্ট মাসে তার কয়েকটি মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবীর দায়ের করা মামলা হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়ে মামলা চলার পক্ষে রায় দেন। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকও খালেদা জিয়ার সঙ্গে মামলার আসামি। খালেদা জিয়া জামিনে মুক্ত আছেন। তবে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাও আছে। এসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড পেতে পারেন এবং রাজনীতির বাইরে ছিটকে পড়তে পারেন।
এদিকে ব্রিটিশ প্রতিবেদনটির বিএনপি অংশ নিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের দাবি, বিএনপি থেকে খালেদা জিয়া ছিটকে পড়ার কোনো প্রশ্নই উঠে না। বিএনপির নেতৃত্বে আরো ৫০ বছর থাকবে জিয়া পরিবার!
বিএনপির রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব প্রসঙ্গে কথা হয় ছাত্রদলে বিদ্রোহী নেতা হিসেবে পরিচিত সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রয়েলের সঙ্গে। তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমান, তারপর জোবাইদা রহমান, তাদের সন্তান জাইমা রহমান রয়েছে। সুতরাং বিএনপিতে জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব আগামী ৫০ বছরের জন্য স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত।’
 
যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াস উদ্দিন আল মামুন বলেন, ‘জিয়া পরিবার জাতীয়বাদী শক্তির ঐক্যের প্রতীক। জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব মানেই বিএনপি। যারা বলেন বেগম খালেদা জিয়া ছিটকে পড়বেন উল্টো তাদেরই পালাতে হবে।’  
ছাত্র থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা বর্তমানে দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. নাজিম উদ্দিন আলম। দলের পক্ষে সরকার বিরোধী কর্মসূচি পালনকালে তিনি রাজপথে গুলিবিদ্ধও হয়েছেন। ব্রিটিশ এই প্রতিদেনটির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার কাছে জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন আলম বাংলামেইলকে বলেন, ‘প্রশ্নই আসে না। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। বিএনিপর সকল পর্যায়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। দল এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। উনি ছিটকে পড়ার প্রশ্নই আসে না। কোথায় ছিটকে পড়বেন? বরং যারা জনবিচ্ছিন্ন তারাই ছিটকে পড়বে।’  
এ বিষয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান বাংলামেইলকে বলেন, ‘ব্রিটিশ একটি বিদেশি রাষ্ট্র। তারা একটা রিপোর্ট প্রকাশ করতেই পারে। তবে আমি মনে করি এ রিপোর্ট একপেশে। এ রিপোর্টে বাস্তবতার প্রতিফলন নেই।’
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সঙ্কট চলছে, রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। খালেদা জিয়া ছিটকে পড়লে কি এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?’
সাবেক এই সেনা প্রধান বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষায় আন্দোলন চলছে, বেগম খালেদা জিয়া সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’
তবে দলের শীর্ষ নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সরকার নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। আর সে কারণেই তাদের বিরুদ্ধে নানা রকম হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হচ্ছে।

বিশেষ সংবাদ এর আরো খবর