বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২০
logo
নৌকা প্রতীকে জামায়াত!
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল, ২০১৬ ১৩:২৭:৩১
প্রিন্টঅ-অ+
বিশেষ ওয়েব

চাঁদপুর: মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়ন পরিষদের জামায়াত সমর্থক এক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশ নেবেন তিনি। এ নিয়ে এলাকায় চলছে আলোচনা-সমালোচনা। জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে পরিচিত ওই ব্যক্তি নিজেকে আওয়ামী লীগের নেতা বলে দাবি করেছেন। তিনি বর্তমান চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হক সেলিম।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ থেকে ৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করার উদ্যাগ নেয়া হয়। এসময় বর্তমান চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হক সেলিম মোটা অংকের টাকায় ভোট কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ৩৩টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মৌলভীবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আব্দুর রব পান ২০ ভোট। আর অপর প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আতাউর রহমান সুহেল পান ১৯ ভোট।
এম সাইফুর রহমানের ছেলে নাছেরের সঙ্গে সেলিম
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হক সেলিম ছাত্রজীবন থেকেই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার বাবা সুন্দর আলী ও চাচা ফয়জুর হক সিদ্দিকী জামায়াতে নিয়মিত চাঁদা দেন। পুরো পরিবারই জামায়াতের সক্রিয় সমর্থক তবে দলীয় কোনো পদে নেই। এই পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড কাজে লাগিয়ে নাজমুল হক সেলিম ২০০১ সালে বিএনপিতে জড়িয়ে পড়েন। এসময় তিনি প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে সাবেক এমপি এম নাছের রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশও নিতেন।
এছাড়াও এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় নাছির রহমানও সেলিমকে তার সহযোগী হিসেবে নেন। নাছিরের সহযোগিতায় তিনি বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিজয়ীও হোন।
কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেলিম ভোল পাল্টান। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এক পর্যায়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে একটি পদও বাগিয়ে নেন। বর্তমানে উপজেলা স্বেচ্ছাসেব লীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জামায়াত আয়োজিত বিভিন্ন তাফসির মাহফিল, সরকার বিরোধী আন্দোলনে জামায়াতকে সহযোগিতাও করেন। এমন একাধিক ঘটনার সত্যতাও পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক জামায়াত নেতা জানান, সেলিম ছোটবেলা থেকে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে জামায়াত ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠন হওয়াতে তার ভাগ্যে কোনো পদপদবী জোটেনি। তাই ২০০১ সালে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তবে সবসময় জামায়াতকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন।
জামায়াতের তাফসির মাহফিলে সেলিম
জামায়াতের ওই নেতা আরো জানান, সেলিম এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারপরও জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। চলতি বছর স্থানীয় হরিপাশা বাজারে জামায়াত ইসলামী আয়োজিত একটি তাফসির মাহফিলেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সেলিম ওই মাহফিল কমিটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। এসময় তিনি পুলিশকে ম্যানেজ করে তাফসির মাহফিল আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন।
ওই জামায়াত নেতা দাবি করেন, সেলিম আওয়ামী লীগ করলেও স্থানীয় জামায়াতের অভিভাবক।
এদিকে, মো. নাজমুল হক সেলিম আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সদস্য ও সাবেক মেম্বার আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমরা সারা জীবন আওয়ামী লীগ করেছি। ছোট বেলা থেকে দেখেছি কে আওয়ামী লীগ আর কে বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আসার পর জানতে পারলাম সেলিম আওয়ামী লীগ হয়ে গেছেন। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
তবে মো. নাজমুল হক সেলিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে য্গোদান করায় কিছু মানুষের হিংসা হচ্ছে। তাই আমার বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নিয়েছে।’
তবে মো. নাজমুল হক সেলিমের এমন বক্তব্য মানতে নারাজ তার মৌলভীবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি আব্দুর রব। তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ছোট বেলা থেকে আমরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। স্কুলে খেলাপাড়া করা অবস্থায় আমি কামারচাক ইউনিয়নের ছাত্রলীগের কর্মী হই। পরে আমি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করি।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাস দমন আইনে আমার বিরুদ্দে মামলা করা হয়েছে।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে থাককালীন আব্দুর রব ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার ডাকে কামারচাক ইউনিয়নের খাসপ্রেম নগর ও পঞ্চনন্দপুর ভোট কেন্দ্রে দলবল নিয়ে অবস্থান করেন এবং সেই ভোট সেন্টারের কোনো ভোট গ্রহণ করতে দেননি তিনি। এর জের ধরে এবং ছাত্রলীগ করায় ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার উপর একের পর এক মামলা, হামলা শুরু হয়। তারাপাশা বাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। পুলিশি হয়রানির কারেণে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে আওয়ামী লীগ নামধারী সেলিম সেই সময় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে নাছের রহমানের ইশারায় তাকে অনেকবার হুমকিও দিয়েছিল। এ ভয়ে তিনি গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করেন। পাঁচ বছর বিএনপি সরাকর ক্ষমতায় থাকাকালীন একদিনও তিনি বাড়িতে ঘুমাতে পারেননি।  
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ ওই নেতা আফসোস করে বলেন, মৌলভীবাজার শহরে আত্মগোপনে থাকার সময় প্রয়াত সমাজক্যালমন্ত্রী মহসিন আলীর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি তাকে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি বলেন, ‘আজ যদি সমাজক্যালণ মন্ত্রী মহসিন ভাই বেঁচে থাকতেন তা হলে আমাদের ইউনিয়নের এমন অবস্থা হত না।’
এ ব্যাপারে শুক্রবার বিকেলে রাজনগর উপজেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজবাহুদ্দোহা বেলাই’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘যারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একটি তালিকা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তবে দুয়েক দিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ উপজেলার সকল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করবেন।’
এদিকে, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিজবাহুদ্দোহা বেলাই এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই তিনি ইউপি নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীতের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দিচ্ছেন।
এমন অভিযোগ অস্বীকার করে বেলাই বলেন, ‘আমি কখনোই জামায়াত করিনি। কিছু দুষমন রয়েছে, তারা সব সময়ই আমার বিরুদ্ধে নানা অপ্রচার চালায়।’
প্রসঙ্গত, আগামী ৭ মে চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ধাপে রাজনগর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ধাপে মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন ৭ এপ্রিল, যাচাই-বাছাই ১০-১১ এপ্রিল, মনোনয়ন প্রত্যাহার ১৮ এপ্রিল ও ১৯ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দের দিন ধার্য করা হয়েছে।

বিশেষ সংবাদ এর আরো খবর