মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০
logo
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ
সরকারি বিদ্যালয়ে প্রক্সি শিক্ষক-শিক্ষার্থী!
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১৫:৫০:৪৫
প্রিন্টঅ-অ+
বিশেষ ওয়েব

রংপুর: প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিদিনের হাজিরা খাতায় উপস্থিতি ১৩৮ জন শিক্ষার্থীর। অথচ পরীক্ষার হলে ৭৮ জনের বেশি উপস্থিত নেই। বাকিদের ব্যাপারে কিছুই জানেন না প্রধান শিক্ষক। এতো গেল শিক্ষার্থীদের কথা। অন্যদিকে শিক্ষকরাও হাজিরার খাতায় নিয়মিত উপস্থিত থাকলেও বিদ্যালয়ে দেখা মেলে না স্বশরীরে।
প্রধান শিক্ষক অভিভাবকদের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্থানীয় দু’টি কোচিং সেন্টার থেকে ‘প্রক্সি’ শিক্ষক -শিক্ষার্থী এনে চালাচ্ছেন বিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, সুযোগ বুঝে স্বাক্ষর জাল করে হাতিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকাসহ বিভিন্ন অনুদান। অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।
অভিযোগের এ ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার নিভৃতপল্লীর ইমাদপুর চরকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী সুশীল চন্দ্রের বিরুদ্ধে। এদিকে প্রধান শিক্ষকের এমন দুর্নীতি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী গণ-স্বাক্ষরে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, জনতা ব্যাংক শঠিবাড়ি শাখার ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি তদন্তে ২ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিঠাপুকুর উপজেলার ইমাদপুর চরকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী সুশীল চন্দ্র ‘প্রক্সি’ শিক্ষার্থী দেখিয়ে এবং উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের স্বাক্ষর জাল করে শঠিবাড়ী জনতা ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে আতাত করে দীর্ঘদিন থেকে সরকারি অর্থ আত্মসাত করে আসছে। নিয়মিত শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখিয়ে কোচিং সেন্টারের ‘প্রক্সি’ শিক্ষক দিয়ে কোনো রকমে বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে। আর এতে করে প্রত্যাশিত শিক্ষাব্যবস্থা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইমাদপুর চরকাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় শনিবার প্রথম শ্রেণিতে হাজিরা খাতায় ৪০ জন নিয়মিত ছাত্রছাত্রী থাকলেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়েছে ২৮ জন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪৪ জনের মধ্যে পরীক্ষার হলে উপস্থিত ২২ জন, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩১ জন থাকলেও অংশ নিয়েছে ১৬ জন এবং চতুর্থ শ্রেণিতে ২৩ জনের মধ্যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ১২ জন। তাদের মধ্যেও বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী ওই এলাকার বিভিন্ন শিশু নিকেতন এবং রুপসী বাংলা কোচিং সেন্টার থেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে অকপটে স্বীকার করেছে ওই পরীক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে পরীক্ষার খাতা বিতরণ এবং পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করছে কোচিং সেন্টার ও শিশু নিকেতনের শিক্ষকরা। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রক্সি দিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার কাজে সহযোগিতা করছে। পরে তারা ওই বিদ্যালয় থেকে দ্রুত সটকে পড়ে।
এদিকে প্রধান শিক্ষক সুশীল চন্দ্র জানান, চলতি বছর তার বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণিতে উপবৃত্তি পেয়েছে ৩৫ জন।  ২য় শ্রেণিতে ৩৪, ৩য় শ্রেণিতে ২৯, ৪র্থ শ্রেণিতে ২১ এবং ৫ম শ্রেণিতে ২১ জন।
পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হওয়ার ব্যাপারে তিনি বাংলামেইলকে বলেন, ‘ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা উপবৃত্তির সময় শতভাগ উপস্থিত হলেও পরীক্ষার সময় অনীহা দেখায়। অনেককে আবার পরীক্ষার জন্য মোবাইল করেও আনা হয়। এখানে রাস্তাঘাট ও যাতায়াত ব্যবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষাতে নিয়মিত আসতে পারছেন না।’
 
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহানাজ পারভীনের মা হাসিনা বেগম বাংলামেইলকে জানান, মেয়ের উপবৃত্তির টাকা দীর্ঘদিন থেকে প্রধান শিক্ষক জাল স্বাক্ষর দিয়ে আত্মসাত করে আসছে। বিষয়টি তিনি টের পাওয়ার পর এনিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে প্রধান শিক্ষক ও ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে দু’দফায় উপবৃত্তির নামে পাঁচশত টাকা ফেরত দেয়।
বিদ্যালয়ে এই অনিয়ম চান না এমনটা দাবি করে সহকারী শিক্ষিকা শাহানাজ পারভীন বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী কম থাকায় অন্য প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারের ‘প্রক্সি শিক্ষার্থী’ দিয়ে পরীক্ষা নেয়া হয়। আমরাও এ অনিয়ম করতে চাই না। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি সংখ্যা কম হলে এই কাজটি বাধ্য হয়ে করতে হয়।’
এদিকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি আইজার রহমান বলেন,‘আগে শুধু শুনেছি। কিন্তু আজ বাস্তবে দেখতে পেলাম।’
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্লাস্টার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব পেয়েছি। তাই অনেক কিছুই ভালোভাবে জানি না। কোনো অনিয়ম থাকলে অবশ্যই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মিঠাপুকুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্বাস আলী ভূঁইয়া বলেন,‘মিঠাপুকুর উপজেলাটি বড় হওয়ায় আমি সবকিছু সঠিকভাবে খোঁজ খবর নিতে পারি না। অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সেখানে একটি তদন্ত টিম করে দেয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

বিশেষ সংবাদ এর আরো খবর