মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০
logo
বাসের আগেই হেঁটে পৌঁছাচ্ছে মানুষ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই, ২০১৫ ২২:১২:৫৮
প্রিন্টঅ-অ+
বিশেষ ওয়েব

ঢাকা: উপর্যুপরি খোঁড়াখুঁড়ি, ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপ, বৃষ্টি আর ঈদের কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গন্তব্যে পৌঁছাতে বাসে-রিকশায় ওঠা মানুষগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে হচ্ছে রাস্তায়ই। বাঁদড়ঝোলা হয়ে বাসে ঝুলতে ঝুলতে, মানুষের চাপে পিষ্টপ্রায় হয়ে, একে-অন্যের ঘাম মেখে অতিষ্ট হয়ে যারা বাস থেকে নেমে যাচ্ছেন অনেক ক্ষেত্রেই তারা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছেন বাসের আগেই। আক্ষরিক অর্থে যারা বাসের আগে পৌঁছাতে পারছেন না, তাদের সঙ্গে বাসযাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়ের ব্যবধান ধর্তব্যের মধ্যে আনাটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ থেকে যাচ্ছে।
শুক্র, শনি ও রোববার কাকরাইল, শান্তিনগর, মৌচাক, রামপুরা, বাড্ডা, গুলিস্তান, নয়াপল্টন, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, ফার্মগেট, পান্থপথ, মগবাজার, মহাখালী, গুলশান, ধানমণ্ডি এলাকার রাস্তাগুলোতে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভয়াবহ যানজট দেখা গেছে; মাঝে কেবল ইফতারের সময়টাতে ফাঁকা থেকেছে রাস্তাগুলো। রাত ১০টা পর্যন্ত নিয়মিত যানজটের বর্ধিত রূপ দেখা গেলেও কোনো কোনো রাস্তায় সকাল-বিকেলের মতোই জট থেকে গেছে রাত ১২টা পর্যন্ত। যানজট সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছেন ট্রাফিক পুলিশরা।
১৫ রোজার পর থেকেই ঈদের কেনাকাটার জন্য বিভিন্ন মার্কেটে ছুটছেন নগরবাসী। দিনভর যানজটের কারণে তারা ঠিকমতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। দুপুরের পর যানজট আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। এর মধ্যে বৃষ্টি। সবমিলে যানজট এখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় অনেকে ঠিক মতো ইফতারও করতে পারছেন না।
শান্তিনগর মোড়ে ফাল্গুন পরিবহনের বাসচালক আশরাফ আলী বলেন, ‘রামপুরা থেকে এ পর্যন্ত আসতে সোয়া ঘণ্টা লাগছে। এখানেও দাঁড়িয়ে আছি ১৫ মিনিট, এর মধ্যে গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ছে না।’
প্রচেষ্টা পরিবহনের সুপারভাইজার কামাল হোসেসের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘তীব্র যানজটের কারণে গাড়ির ট্রিপ অর্ধেকে দাঁড়িয়েছে। কয়েকদিন ধরে দৈনিক আয় দিয়ে গাড়ির খরচ ওঠে না, কোনো রকম ড্রাইভার-হেলপারের বেতন দেয়া যায়। তাই মালিক সমিতি ঈদের কয় দিন ভাড়া বাড়নোর চিন্তা ভাবনা করছে।’
এমইপি ক্যাবল কোম্পানির বিক্রয় ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, ‘গুলিস্তান অফিস থেকে ডেমরার বাসায় যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ির অপেক্ষায় থাকতে হয় দীর্ঘক্ষণ। যানজটে পড়ে প্রায় দিনই ইফতার সারতে হয় রাস্তায়।’
ব্যাংকার রেজা আদনান বলেন, ‘বাড্ডা থেকে সকালে বের হয়ে যানজটের কবলে পড়ে মতিঝিল অফিসে যেতে আমার তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে। অথচ হেঁটে-হেঁটেও এর চেয়ে অনেক আগে যাওয়া যায়।’
রোববার যানজটের কারণে পল্টন অফিস থেকে পায়ে হেঁটে মেরুল বাড্ডার বাসায় গেছেন জেক্স টেক্সটাইলসের হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলম।
আশরাফ, কামাল, মিজানুর, রেজাদের অভিযোগের সত্যতা অক্ষরে অক্ষরে পাওয়া গেল রোববার দুপুরেই কাকরাইল মোড়ে। সেই সঙ্গে স্পষ্ট দেখা গেল ট্রাফিক পুলিশের অসহায়ত্বও। একদিকে যান চলার সঙ্কেত দিতেই অন্যদিকে মুহূর্তের মধ্যে জট লেগে যাচ্ছে, আর তা ছাড়তে ছাড়তে আবার অন্যদিকে। যেন ‘যানজটের দুষ্টচক্রে’ ঘুরপাক খাচ্ছে সবকিছু।jam3
সেখানে কথা হয় কর্মরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আবদুল সালামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের কেনাকাটার জন্য সকাল থেকেই অনেক মানুষ মার্কেট যাওয়া শুরু করেছেন। তাই রাস্তার ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত গাড়ি নেমে পড়েছে। তার ওপর দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে পায়ে হেঁটেও যেতে পারছেন না তারা। যার ফলে তারাও রিকশা-অটো রিকশা নিয়েছেন। আর এসব কারণেই রাস্তায় অতিরিক্ত যানজট তৈরি হয়েছে।’
মগবাজার মোড়েও পাওয়া গেল মানুষের ভোগান্তির একই হাল। সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. মামুন নামে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট। তিনি যা জানালেন তা হলো- তেজগাঁওয়ের দিকের রাস্তা একটু বেশি সময় ছাড়লে মিন্টো রোডে যানজট লেগে যায়। এদিকে মিন্টো রোড ‘ক্লিয়ার’ করতে গেলে মগবাজার থেকে মৌচাক পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট লেগে যায়। আবার এরমধ্যে কম জনবল নিয়ে যানবাহন চেক করতেও হচ্ছে। সব মিলিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
রাজধানীর তীব্র যানজটের ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার (ট্রাফিক) পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এমনিতেই ধারণ ক্ষমতার তুলনায় রাজধানীর রাস্তায় অনেক বেশি গাড়ি চলাচল করে। এরমধ্যে কার পার্কিং করে রাস্তাগুলোর বেশির ভাগ দখল হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, ‘রাজধানীর বড় বড় মার্কেট ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত কার পার্কিংয়ের জায়গা নেই। অনেকে কার পার্কিংয়ের জায়গাও ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। যার ফলে এসব মার্কেটে আসা প্রাইভেট কারগুলো এলোপাতাড়ি রাস্তায় রাখা হয়। এতে মূল রাস্তার আয়তন কমে গেছে। সিগন্যাল ছাড়া হলে গাড়িগুলো দ্রুত সরে যেতে না পাড়ায় যানজট দীর্ঘ হয়।’
ঈদের কেনাকাটা করতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি হয়ে রাস্তায় পানি জমে গেলে যানজট আরো তীব্র রূপ নেবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
 

বিশেষ সংবাদ এর আরো খবর