রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় নূরজাহান বেগম
প্রকাশ : ২৪ মে, ২০১৬ ১৩:৪২:২৫
প্রিন্টঅ-অ+
জাতীয় ওয়েব

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম। নিজ বাড়িতে প্রথম জানাজার পর নূরজাহান বেগমের মরদেহ নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে গুলশানে জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
 
সোমবার সকালে ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান বেগম ৯১ বছর বয়সে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ পুরান ঢাকার শরৎ গুপ্ত রোডের ৩৮ নম্বর বাড়িতে নেয়া হয়। দুপুরের মধ্যে বাড়ি ভর্তি হয়ে যায় মানুষে।  
 
৫ মে অসুস্থ অবস্থায় নূরজাহান বেগমকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৭ মে তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার চিকিৎসার যাবতীয় দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
 
শহীদ মিনারে বিকেল চারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নূরজাহান বেগমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য শোক সভার আয়োজন করে। মন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এখানে তার দুই মেয়ে ফ্লোরা নাসরীন খান ও রিনা ইয়াসমিন আহমেদ মায়ের ‘বেগম’কে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলে জানান। এ জন্য সবার সহযোগিতাও চান তারা।
 
ফ্লোরা নাসরীন খান বলেন, “আম্মা যে মশাল জ্বালিয়েছেন তা যেন কখনো নিভে না যায়, তাই তিনি চেয়েছেন সব সময়। আম্মা হাসপাতালে অচেতন ছিলেন। ভেবেছিলাম ঈদ সংখ্যা তার হাতে দিলে চোখ খুলে তাকিয়ে হাসবেন। তা আর হলো না।”
 
সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর খবর পেয়ে শরৎগুপ্ত রোডের মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্মৃতি ভবনটিতে গিয়ে নূরজাহান বেগমের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও বেগমের যাত্রা যাতে অব্যাহত থাকে এবং বেগমের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে।
 
বেগমের প্রথম সম্পাদিকা কবি সুফিয়া কামালের মেয়ে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, নূরজাহান বেগমের মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলো। বেগম ক্লাবের মাধ্যমে ওই সময়ে নারীদের এক সঙ্গে বসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। সুফিয়া কামাল বা নূরজাহান বেগমদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নারীরা এগিয়ে যাবে বলে আশা করেন তিনি।
 
শহীদ মিনারে একটি টুলের ওপর বসে ছিলেন বয়সের ভারে নুব্জ দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাংবাদিক সাইদা খানম। তিনি বেগম পত্রিকার জন্য ছবি তোলা, গল্প লেখা শুরু করেন ১৯৫৬ সাল থেকে। তিনি বললেন, সেই যুগে প্রকাশিত মেয়েদের জন্য বেগম পত্রিকায় সংসার, রাজনীতির খবরসহ সবই থাকত।
 
নূরজাহান বেগমের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে ‘বিরল সৌভাগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম।
 
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মফিদুল হক বলেন, পারিবারিক বেগম পত্রিকাটি যে জায়গায় পৌঁছেছে সেরকম দ্বিতীয় আর কোনো উদাহরণ নেই। তার উত্তরসূরিরা তার গুরুত্ব অনুধাবন করলেই তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
 
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সায়েরা বেগম জানালেন, তার মা সুফিয়া বেগম শুধু বানান করে করে লিখতে পারতেন। সেই মা বেগম পত্রিকা পড়ে পড়ে একদিন সুন্দর একটি কবিতা লিখে ফেললেন। মায়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে বেগমের সঙ্গে নিজেও সম্পৃক্ত হন। নূরজাহান বেগমের ধমক খেয়ে তখন খারাপ লাগলেও এখন বোঝেন, এই বকাই তাকে লেখিকা করে গড়ে তুলেছে।
 
নূরজাহান বেগমের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েই কবি লিলি হক এখন ‘চয়ন’ ও ‘দশ দিগন্ত’ নামক দুটি প্রকাশনার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার সাহস পেয়েছেন বলে জানালেন। লিলি হকের মতে, বেগম শুধু একটি পত্রিকার নাম নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের জীবন পাল্টে দেয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম।
 
বাংলার প্রথম সচিত্র মহিলা সাপ্তাহিক বেগম
বেগম বাংলার প্রথম সচিত্র মহিলা সাপ্তাহিক। সাহিত্যক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে আনার লক্ষ্যে সাহিত্যচর্চার পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় বেগম। ১৯৫০ সালে বেগম চলে আসে ঢাকায়। বেগম-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এবং প্রথম সম্পাদিকা ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। তবে চার মাস পর থেকেই পত্রিকাটির সম্পাদনা শুরু করেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সুযোগ্য মেয়ে নূরজাহান বেগম।
 
বেগম-এর প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি। মূল্য ছিল চার আনা। প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল বেগম রোকেয়ার ছবি। এখন আর সাপ্তাহিক নয়, এটি মাসিক পত্রিকা হিসেবে বের হচ্ছে। শুধু বয়সের কারণে পত্রিকাটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছিলেন তার বড় মেয়ে ফ্লোরা নাসরীন খান। তবে এই পত্রিকায় কার লেখা যাবে, কার ছবি যাবে, কোন কোন বিষয় থাকবে, তার সবই ঠিকঠাক করতেন নূরজাহান বেগম। বাবা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও মা ফাতেমা খাতুনের একমাত্র কন্যা ছিলেন নূরজাহান বেগম।
 
নূরজাহানের জন্ম
১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুর জেলার চালিতাতলী গ্রামে নূরজাহান বেগমের জন্ম। বাবা ১৯১৮ সালে কলকাতা থেকে মাসিক সওগাত পত্রিকা বের করেন। নূরজাহান বেগম বিএ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। বাবার পরে নূরজাহান বেগমের পাশে দাঁড়ান তাঁর স্বামী কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা রোকনুজ্জামান খান। তিনি দাদাভাই নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫২ সালে বিয়ে হয় দাদাভাইয়ের সঙ্গে। নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবি সুফিয়া কামালসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি থেকে বড় হয়েছেন নূরজাহান বেগম। ২০১১ সালে নূরজাহান বেগম সাংবাদিকতায় একুশে পদক পান।

জাতীয় এর আরো খবর