বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
কাছে আসার গল্প
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১২:৫৬:১৪
প্রিন্টঅ-অ+
লাইফ ওয়েব

চাঁদপুর: আমার একুশ বছরে পা দেয়া জন্মদিনে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটে। কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদের বারান্দায় একুশ রকমের অসাধারণ সুন্দর কিছু ফুল রেখে যায়। এতো ফুল ছিল যে বারান্দার প্রায় পুরোটা ফুলে ফুলে ঢেকে গিয়েছিল। সকালে ঘুম ভেঙে এই দৃশ্য দেখে আমার সেদিন কতটা ভালো লেগেছিল তা আজ বুঝিয়ে বলা যাবে না। কয়েক রকম গোলাপ, জবা, বেলি, অর্কিড থেকে শুরু করে নীল ঘাসফুল ও ছিল সেই তালিকায়! সেদিন অনুভব করেছিলাম, ফুল সত্যি কতো অনুভূতিশীল একটা আবেদন। তারপর থেকে মনে হতো, যে আমার পাশে থাকবে সে হয়তো আমাকে কারণে-অকারণে ফুলের সঙ্গে, ফুলের পাশে আমার হাত ধরে থাকবে!!!
আমার বিয়েটা ছিল পারিবারিক। কেউ কাউকে চিনি না। একে অপরের পছন্দ অপছন্দের কিছুই আমরা জানি না। এমনকি নিজের জেলার পাশের জেলা হলেও তার এলাকার কৃষ্টি, সংস্কৃতি সবকিছুই আমার অজানা! তাই বলা যায় সম্পূর্ণ অজানা এক পরিবেশে, সম্পূর্ণ অচেনা এক মানুষের সঙ্গে আমার সংসার জীবনের শুরু! সেই সঙ্গে শুরু এক নতুন গল্পের! এই অচেনা, অজানা মানুষটাকে আমার ভালো লাগতে হবে, ভালোবাসতে হবে,তার প্রতি মুগ্ধ হতে হবে, তার ভালো লাগা-মন্দ লাগায় পাশে থাকতে হবে। তার পছন্দ-অপছন্দ মাথায় রাখতে হবে। এক কথায় সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসতে হবে। আর এটা আসলেই সম্ভব কি না আমার তা জানা ছিল না।
বিয়ে ঠিক হবার পর শুরু হয় বন্যা। একদিন বাসার সামনে বন্যার পানিতে নেমে হইচই করছি। এমন সময় সেই ব্যক্তির ফোন। পানিতে নেমেছি শুনে আম্মুকে কিসব বলল। নোংরা পানি, এটা হবে, ওটা হবে...! আমার রাগ লাগলো। অপরিচিত মানুষটা কেন এতো অধিকার দেখায়? বিয়ের শপিং করতে গিয়ে আমাকে ফোন দেয় আমার পছন্দের রঙ জানতে! আমি আমার পছন্দের রঙ মনে করতে পারি না। স্কুল বান্ধবী সাজুকে জিজ্ঞেস করে রঙের নাম বলি। সেই রঙের শাড়ি কেনা হয় এবং একটা সাদা কাতান শাড়ি দেখে আমার মনে হয়, সাদা আমার প্রিয় রঙ। কাকতালীয় ভাবে সাদা আমাদের দুজনেরই প্রিয় রঙ!
বিয়ের দুই সপ্তাহ পর ঢাকায় আসি। ওর বাসা তখন জিগাতলা। আমার মাথায় তখন দুনিয়ার চিন্তা। খালি বাসায় গিয়ে হয়তো ঘর গোছাতে হবে। রান্না করতে হবে, আমিতো কিছু পারি না। বাসায় এসেতো আমি অবাক। আমার ছোট ভাই শাহী দরজা খুলে দেয়। ঘর ভর্তি অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ। ভেতরে গিয়ে দেখি, সমস্ত ঘর লাল শাপলায় সাজানো। আমি এর আগে একসঙ্গে এতো শাপলা কখনো দেখিনি। আনন্দে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসে! আমি জানি না, কেউ তার সম্পূর্ণ অপরিচিত স্ত্রীর জন্য এতো শাপলা দিয়ে ঘর সাজিয়েছে কিনা।
সে খুব বেশি আবেগী নয়। বলা যায় একটু বেশি বাস্তববাদী। সে কখনো দিনভর গান শুনে না। তবু যখন কোনো টিভি চ্যানেলে দেখে,"পারীণীতা" মুভির পিয়া বলে, পিয়া বলে কিংবা তার পছন্দের রাগ মিশ্রিত কোনো গান, সে আমাকে গভীর ঘুম ভাঙিয়ে গান শোনায়।সারাদিন বিভিন্ন কাজের পর হয়তো কোনোদিন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, মশারিটা টানটান করে টানানো।এই মানুষটাই আবার যখন ঘুম ভাঙিয়ে দাঁতব্রাশ করতে বাধ্য করে, তখন ঘরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।
বিয়ের পাঁচবছর আমার ঘরে কোনো আয়রন ছিল না। তার ধারণা ছিল, হয়ত খালি ঘরে আয়রন করতে গিয়ে আমি ইলেক্ট্রিক শক খাবো! পরে এই শর্তে আয়রন কিনে, খালি ঘরে আয়রন করতে পারব না। দুইমাস পর ভাগিনার বিয়ে। গত পনেরদিন যাবত আমরা শাড়ি নিয়ে ঝগড়া করছি। আমি নেটে একটা শাড়ি পছন্দ করেছি। এটা ওর পছন্দ না। দোকানে ও শাড়ি পছন্দ করে আসছে। ওটাই আমাকে কিনতে হবে। এগার বছর পরও আমি নিজের পছন্দে কোনো শাড়ি কিনতে পারি না।
আমাদের চিন্তা, আমাদের সংস্কৃতিতে অনেক ব্যবধান। আমার খুব ঘুরতে ইচ্ছে করে, সে ঘরকুণো মানুষ। আমার পাহাড় ভালো লাগে, ওর পাহাড়ে ভয়। আমার আজও খুব ইচ্ছে করে খোলা চুলে মোটর বাইকে ঘুরে বেড়াই, বাইক মানেই ওর কাছে বিরক্তির আরেক নাম। সে কখনো জিন্স পরতো না। বিয়ের পর থেকে এটা নিয়ে আমাদের কত ঝগড়া! এখন সে জিন্স ছাড়া অন্যকিছু পরে না।
এভাবে ছোট ছোট ভালোলাগা, মুগ্ধতা, ঝগড়া, মান অভিমানে এগারোটা বছরে কেমন করে আমরা কাছে চলে এলাম তা সত্যি আজ আমার কাছে চিরবিস্ময়কর!!!
চিরাচরিত কাছে আসার গল্পগুলো হয়তো এমনই হয়।

লাইফস্টাইল এর আরো খবর