শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০
logo
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ
প্রকাশ : ১১ আগস্ট, ২০১৬ ১৯:৩৯:৫৬
প্রিন্টঅ-অ+
আইন ওয়েব

ঢাকা: বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেয়েছে।
তিন বিচারপতির স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের অপর বিচারপতি কাজী রেজাউল হক। তবে কণিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আরেকটি রায় দিয়েছেন।
হাইকোর্টের রুলস অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে যে রায় দেয়া হয়, সেটাই চূড়ান্ত।
 
গত ৫ মে হাইকোর্টের এই বৃহত্তর বেঞ্চ সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। প্রকাশিত রায়টি ১৬৫টি পৃষ্ঠার।
 
রায়ে সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ওই অনুচ্ছেদের কারণে দলের সংসদ সদস্যরা হাইকমান্ডের কাছে জিম্মি। নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না। রায়ে আরো বলা হয়, বিভিন্ন উন্নত দেশে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আমাদের দেশের সংসদ সদস্যদের দলের অনুগত থাকতে হয়। বিচারপতি অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তাঁরা দলের বাইরে যেতে পারেন না। রায়ে বলা হয়, এই সংশোধনী থাকলে বিচারপতিদের সংসদ সদস্যদের করুনাপ্রার্থী হয়ে থাকতে হবে। যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।
 
বৃহত্তর বেঞ্চের এই রায়ের ফলে সংসদের হাতে বিচারক অপসারন ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেলো। একইসঙ্গে পুনঃর্বহাল হলো পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আনীত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।
 
রায়ে আরো বলা হয়, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ৬৩ শতাংশ দেশেই বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে নেই। শ্রীলঙ্কা ও ভারত দুটি ক্ষেত্রে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখলেও তার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এটর্নি জেনারেল এবং অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর কিছু কিছু দেশে সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণনের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ওইসব দেশের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আমাদের সংসদ সদস্যদের মেলানো ঠিক হবে না। ওইসব দেশের সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৯৫(২) সি অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগে আইন প্রনয়ণের কথা বলা আছে। ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, কোন সরকার এই আইন করেনি। এ ব্যপারে আমরাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় একমত পোষণ করি। ড কামাল হোসেন বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে হেয় করা হয়েছে এবং নাজুক অবস্থায় ফেলা হয়েছে। আদালত এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে একইসঙ্গে বলেন, বিচারপতি অপসারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির  নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি উত্তম পন্থা।
 
রায়ে বলা হয়, আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হলো বড় দলগুলোর মধ্যে বিভেদ এবং সমাজ মারাত্নকভাবে বিভক্ত। এছাড়া সংসদে সবসময় দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও থাকতে পারে। ফলে একজন বিচারক অদক্ষ হলেও অপসারণ করা যাবে না। তাহলে তা দেশের জন্য লজ্জাজনক হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদালত চোঁখ বন্ধ করে রাখতে পারে না। আদালত বলেন, বাংলাদেশে বিচারক নিয়োগের কোনো নীতিমালা নেই। কিন্তু অপসারণের নীতিমালা করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই ঠিক নয়। আগে নিয়োগের নীতিমালা ঠিক করা উচিত।
 
রায়ে বলা হয়, বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাতে দেওয়ার ফলে বিচার বিভাগের ওপর খড়গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বিচারকদের ওপর যদি এই খড়গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তাহলে জনগণের মনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হবে। ন্যায়বিচারের নিয়ে তখন জনগণের মনে সংশয় সৃষ্টি হবে। জনগণ যদি মনে করেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই তাহলে বিচার বিভাগের অস্তিত্বই থাকে না। যেহেতু ১৬তম সংশোধনী বিচার বিভাগের উপর আস্থা দুর্বল করেছে সে কারনে জনস্বার্থ ব্যাঘাত ঘটবে এবং জনগন ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কমনওয়েলথ ল্যাটিমার প্রিন্সিপাল ২০০৩ এর মাধ্যমে প্রধান বিচারপতির নের্তত্বে সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এর উপর বিচারক অপসারনের ক্ষমতা থাকাটাকেই সর্বোত্তম মনে করছে আদালত। রায়ে বলা হয়, ১৬তম সংশোধনি সংবিধানের ৯৪(৪), ১৪৭(২) এবং ৭(খ) অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। সুতরাং এটা বাতিল যোগ্য ও সংবিধান পরিপন্থি।
 
১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না। ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দফা (২) এর অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেই তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি এবং অপসারণের প্রক্রিয়া ঠিক করে তৈরি একটি আইনের খসড়ায় গত ২৫ এপ্রিল নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার দশ দিনের মাথায় মূল আইনই বাতিল হয়ে গেলো।
এদিকে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের নয় আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন। আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের ডিভিশন বেঞ্চ ওই সংশোধনী  কেন অবৈধ, বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে রুল জারি করে। পরে এই রুল শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। হাইকোর্টের বিচারপতি কাজী রেজা-উল হককে এই বিশেষ বেঞ্চে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।
দেশের শীর্ষ ৫ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসিকে অ্যামিকাসকিউরি হিসেবে আদালতে অভিমত দেন।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, হাইকোর্টের রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। এই রায় স্থগিতের জন্য রবিবার চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করব। তিনি বলেন, রায়ে আমাদেরকে আপিলের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। ফলে আমরা সরাসরি আপিল করতে পারব। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ১৯৭২ সালে সংবিধান যখন প্রণয়ন করা হয়েছিল তখন বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি সংবিধানে উল্লেখ ছিল। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক সরকার এটি সংশোধন করে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাত থেকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে দেয়। যেহেতু এর আগে সামরিক শাসনামলকে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন সেহেতু তাদের কার্যক্রমও অবৈধ। তাই বিচারপতিদের অপসারণে সামরিক সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটিও অবৈধ। তিনি বলেন, সংবিধান প্রণয়নের সময় যেহেতু সংসদ সদস্যদের হাতেই
বিচারপতিদের অভিসংশন বা অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তাই এখন সেটিই বহাল চাচ্ছি।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, হাইকোর্টের এই রায় ঐতিহাসিক। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছি।

আইন আদালত এর আরো খবর