বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০
logo
ইস্কাটনে জোড়া খুন
এমপিপুত্রের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যে সালমার চোখে জল
প্রকাশ : ২৯ মে, ২০১৬ ১১:৪৪:১৬
প্রিন্টঅ-অ+
আইন ওয়েব

ঢাকা : রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে জোড়া খুনের ঘটনার মামলায় সরকার দলীয় সাংসদ পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অঝোরে কাঁদলেন নিহত অটোরিকশা চালক ইয়াকুব আলীর স্ত্রী সালমা বেগম। একইদিন এই মামলাটির বাদী এবং নিহত রিকশাচালক হাকিমের মা মনোয়ারা বেগমও আদালতে সাক্ষ্য দেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ মে) ঢাকার ২য় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ সামসুন্নাহার সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আগামী ২৮ জুন পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন।
জবানবন্দি দেয়ার সময় আদালতে অঝোরে কাঁদেন ইয়াকুব আলীর স্ত্রী সালমা বেগম। এ সময় বিচারক তাকে বলেন, আপনি কাঁদবেন না। আপনি আপনার জবানবন্দি শেষ করুন। এরপরও অঝোরে কাঁদতে থাকেন সালমা বেগম। এরপর বিচারক তাকে বলেন ,আপনি শান্ত হোন। আগে আপনি আপনার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করুন।
এরপর সালমা বেগম তার জবানবন্দি শেষ করেন। তারপর আসামিপক্ষের আইনজীবী কাজী নজিবুল্লাহ হিরু তাকে জেরা করেন।
গত ৬ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে আদালতে।
 
গত ২১ জুলাই মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস আদালতে এই চার্জশিট দাখিল করেন। দাখিলকৃত চার্জশিটে রনিই একমাত্র আসামি।
বখতিয়ারের প্রাডো গাড়ির চালক ইমরান ফকিরসহ ৩ জনকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে। ইমরান ফকির ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হওয়ায় তাকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশসহ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রধান সাক্ষী করা হয়। মাত্র তিনমাসেই আলোচিত এই মামলার তদন্ত কাজ শেষ করা হয়।
চার্জশিটের সাথে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগজিন, পিস্তলের ২১টি তাজা গুলি, গুলি রাখার চার্জার, একটি রক্তমাখা গুলির অংশ বিশেষ, ভিকটিম ইয়াকুব আলীর ও আ. হাকিমের ব্যবহৃত দু’টি লুঙ্গিসহ মোট ১৫টি আলামত আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।
চার্জশিটে মোট ৩৭ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। ওই সময় রনির সঙ্গে গাড়িতে থাকা তার বন্ধু মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল ও আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দেয়া জবানবন্দিতে নিজস্ব পিস্তল দিয়ে রনির এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া রনির আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও রনির গুলি করার বিষয়টি আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তল, গুলিসহ আসামি বখতিয়ার আলম রনির নামে লাইসেন্সকৃত সকল পিস্তল ও শর্টগানের লাইসেন্স বাতিল করতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবরে আবেদন করা করা হয়েছে। তবে মোট কয়টি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করা হয়েছে তার কোনো উল্লেখ চার্জশিটে করা হয়নি।
চার্জশিটে বলা হয়েছে যে, গত ১৩ এপ্রিল রাতে তিন বন্ধুসহ রনি শেলবারে মদ পান করেন। রাত সাড়ে ১১টায় শেলবার বন্ধ হয়ে গেলে তারা হোটেল সোনারগাঁওয়ে গিয়ে আরও ৯ হাজার ৫০০ টাকার মদ ও বিয়ার পান করে। সেখান থেকে রাত দেড়টায় তারা বাসার পথে রওয়ানা দেন।
এমপিপুত্রের প্রাডো গাড়িতে করে তারা একযোগে রওয়ানা হয়ে বাংলামোটর হয়ে মগবাজার যায়। সেখানে জাহাঙ্গীরকে নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় নিউ ইস্কাটন রোডে ট্রপিক্যাল হোমসের নির্মানাধীন এলএমজি টাওয়ারের সামনে তারা যানজটে আটকা পড়লে বিরক্ত হয়ে রনি তার পিস্তল বের করে এলোপাতাড়ি গুলি করে। গুলির শব্দে মুহূর্তে রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেলে তারা গাড়ি চালিয়ে চলে যায়।
ওই গুলিতে দৈনিক জনকন্ঠের সিএনজিচালক ইয়াকুব আলী (৪০) ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম (২৫) গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
আপাত সূত্রবিহীন এই মামলায় রনিকে (৪২) গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। প্রতিবার রিমান্ড আবেদন ও মঞ্জুরের পরই জিজ্ঞাসাবাদ এড়ানোর কৌশল হিসেবে অসুস্থতার ভান করেছিল রনি। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গুলি করার কথা জানালেও আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি তিনি।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন, রনির গাড়ি চালক ও তিন বন্ধুর আদালতে দেয়া জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েই এই চার্জশিট দাখিল করেন।
১৫ এপ্রিল বিকেলে রিকশাচালক হাকিম মারা যান। এরপর ওই তারিখেই রাতে রিকশাচালক হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম রমনা থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন।
মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, গাড়ির জানালা দিয়ে একজন লোক এলোপাথাড়ি চার-পাঁচটি গুলি ছুড়েছে।
এরপর গত ২৩ এপ্রিল রাতে মারা যান সিএনজিচালক ইয়াকুব। রনির ছোড়া গুলি ইয়াকুবের বুকে বিদ্ধ হয় এবং হাকিমের পেছনের অংশে ঢুকে নাভির নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
গত ২৪ মে রমনা থানার পুলিশের কাছ থেকে জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা হয়। আপাত সূত্রবিহীন এ মামলাটির তদন্তে নেমে একপর্যায়ে ডিবি জনকণ্ঠ ভবনে স্থাপিত ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজে অনুসন্ধান শুরু করে। ফুটেজে মিলে যায় ওই জোড়া খুনের সূত্র। ডিবি দেখতে পায় ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে ওই সড়কে দুবার কালো রঙের একটি প্রাডো গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৬২৩৯) বেপরোয়া চলাচল।
এরপর ডিবি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিপত্র ঘেটে নিশ্চিত হয় যে, কালো রঙের ওই গাড়িটি সাংসদ পিনু খানের। এরপর আধুনিক তদন্ত কৌশল, তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি নিশ্চিত হয় যে, নিউ ইস্কাটনে ঘটনার আগে ও পরে বখতিয়ার এবং ইমরানের অবস্থান।

আইন আদালত এর আরো খবর