মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯
logo
পশু জবাইয়ের আগে ও পরে করণীয়
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১১:৫৭:৩৯
প্রিন্টঅ-অ+
হাইলাইটস ওয়েব

ঢাকা: আমরা কোরবানির সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশাই করি এবং নিজের পশুত্ব ভাবকে কোরবানি করে ইহজগৎ ও পরজগতের শান্তি সঞ্চয় করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপরোক্ত বিষয়গুলো তেমন বিচার করি না। তবে আরা জানি যে, পশু কোরবানি করার পর মোট মাংসের তিনটি ভাগ করে এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে এবং এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়। তাই পশুটি কেনার সময় সুস্থ এবং বেশি মাংসসম্পন্ন হলে সব পক্ষই লাভবান হয়। ঈদুল আজহায় পশুর মালিকের উৎপাদিত ভালো মানের চামড়া দিয়ে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব, যা কি না গরিবের হক। পশুর মালিক হিসেবে আপনি অনায়াসে গরিব-দুঃখীদের তাঁদের ভালো করার জন্য বেশি পরিমাণে টাকা দান করতে পারবেন।
সুস্থ পশুর লক্ষণ
    পশু ক্রয়ের সময় পশুর মুখের সামনে কিছু খড়/ঘাস/কাঁঠালের পাতা ইত্যাদি ধরে পরীক্ষা করা যেতে পারে, পশুর খাবারের প্রতি রুচি আছে কি না?
    চোখ উজ্জ্বল দেখাবে। পশু পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি খুব সংবেদনশীল এবং সজাগ থাকবে। ঢুস মারার চেষ্টা করবে। অনেক সময় অপরিচিত মানুষ কাছে গেলে ফোস ফোস করবে।
    জাবর কাটবে, চঞ্চলতা প্রকাশ করবে। পা দিয়ে মাটি খুঁড়বে বা চিৎকার করে হিক্কা শব্দে ডেকে উঠবে।
    পশু ঘন ঘন নাক চাটবে। ঘন ঘন লেজ নাড়াবে, মাছি তাড়াবে এবং আশপাশ দিয়ে লোকজন গেলে সরে নড়ে দাঁড়াবে।
    নাকের মধ্যখানের কালো জায়গাটি (মাজল) ভেজা থাকবে।
    পায়খানা-প্রস্রাব স্বাভাবিক থাকবে ও নিয়মিত করবে।
অসুস্থ পশুর লক্ষণ
    খুঁড়িয়ে হাঁটা। পশু দুর্বল হয়ে গেলে ঢুলতে থাকা এবং হাঁটাচলা করতে অস্বীকার করা। দীর্ঘ পথ হাটিয়ে পশুকে বাজারে আনলে পশু খুব ক্লান্ত থাকবে এবং অনেক সময় জ্বরেও আক্রান্ত হওয়া।
    জাবর না কাটা। খাবার মুখে ধরলে শুঁকে শুঁকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
    মুখে ক্ষত থাকলে, খাদ্যের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকলে মুখ দিয়ে লালা পড়া।
    চোখের কোনায় ময়লা জমে থাকা।
    মাথা নিচের দিকে রেখে মনমরা ভাবে ঝিমানো। কান নিচের দিকে ঝুলে যাওয়া।
    নাকের মাঝখানের কালো অংশ (মাজল) শুকনা থাকা।
    পায়খানায় দুর্গন্ধ থাকা এবং পাতলা অথবা ভীষণ শক্ত পায়খানা করা।
কোরবানির পশুকে কী ধরনের খাবার খাওয়ানো উচিত?
পশুর পেট ফাঁপা, বদহজম যাতে না হয়, সেদিকে নজর রাখা উচিত। ঈদের দুই-তিন দিন আগে পশু কিনে আনা হলে পশুকে কোনো প্রকার জাউ ভাত বা পচা ভাত বা পচা খাবার খাওয়ানো যাবে না। বাজারে দানাদার পিলেট খাবার পাওয়া যায়, পশুকে তা খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, যদি পশু এ খাবারে অভ্যস্ত না থাকে, তবে অল্প অল্প করে দিয়ে অভ্যস্ত করে নিতে হবে। তা না খেতে চাইলে তাকে ভালো মানের গমের ভুসি খাওয়ানো যেতে পারে। তবে এ জাতীয় সর্বোচ্চ দুই কেজি পর্যন্ত খাওয়ানো যেতে পারে। যা খাওয়ানো হোক না কেন, তা জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাত্রে খাওয়ানো এবং পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি পান করানো উচিত। হজমে সহায়তার জন্য পশুকে আদার রস বা ডিজিভেট/ডিজিটপজাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে। পেট ফাঁপা দেখা দিলে তিসির তেল খাওয়ালে ভালো ফল পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে ভেটেরিনারি ডাক্তার বা পশু বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত।
ঈদের দিন কোরবানির জন্য যা করা জরুরি
কোরবানির পশুকে কোরবানির আগের রাত ১০টার পর থেকে কোনো প্রকার খাদ্য খাওয়ানো যাবে না; একমাত্র পানি ছাড়া। প্রচুর পরিমাণ পরিষ্কার নিরাপদ পানি পান করাতে হবে। শীতকাল হলে পানি হালকা গরম করে নিতে হবে।
সকালে ঈদের মাঠে খাওয়ার আগে কোরবানির পশুকে উত্তমরূপে সাবান দিয়ে গোসল করাতে হবে।
পশুকে কোরবানি করার মুহূর্তে তাকে শোয়ানোর জন্য ৩০ ফুট লম্বা নরম সুতা বা পাটের তৈরি ২০ হাত রশি দিয়ে বেঁধে শোয়াতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নাইলনের দড়ি ব্যবহার করা যাবে না। তাতে শরীরের চামড়ায় ক্ষত হবে এবং যারা পশুকে শোয়াবে, তাদের হাত ও রশির টানে ছুলে বা ছিঁড়ে যেতে পারে।
জবেহ করার স্থানটিতে ঠিক গলার নিচে দেড় ফুট গভীর ও দেড় ফুট আড়ে ও লম্বায় একটি গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে পশুর রক্ত ঝরাতে হবে।
এমনভাবে পশুকে রাখতে হবে, যাতে গর্তে সম্পূর্ণরূপে রক্ত ঝরে পড়ে।
জবেহ করার পর পশুকে টানাহেঁচড়া না করে উঁচু করে সরিয়ে জবেহ করার স্থান থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে চামড়া ছড়াতে হবে। চামড়া ছড়ানোর পদ্ধতি এবং যেসব অস্ত্রপাতি ব্যবহার করা হবে, তা অন্তত তিন দিন আগে প্রস্তুত করে রাখতে হবে। চামড়া ছড়ানোর কাজে অবশ্যই আগা ভোতা (নেকদার) ছুরি ব্যবহার করতে হবে।
পশুকে জবেহের পর গলার কাটা অংশ থেকে গলকম্বলের নিচ সামনের দুই পায়ের মধ্যখানের সিনা পর্যন্ত ফেড়ে সামনের দুই পায়ের সম্মুখভাগ দিয়ে দুই হাঁটু পর্যন্ত ছুরির মাথা দিয়ে ফেড়ে নিতে হবে। পশুকে চিত করে শোয়ায়ে বুকের সিনা থেকে পেটের মাঝখান দিয়ে মলদ্বার পর্যন্ত ছুরির মাথা দিয়ে ফেড়ে পেছনের দুই পায়ের পেছন দিক দিয়ে দুই হাঁটু পর্যন্ত ফেড়ে ফেলতে হবে। এর পর ধীরে ধীরে অতি সাবধানে দেহের চামড়া ছড়াতে হবে।
চামড়া ছড়ানোর সময় চামড়ার সঙ্গে কোনোক্রমেই যেন অতিরিক্ত মাংস আটকে না থাকে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
মাথার চামড়া শরীরের মূল চামড়ার সঙ্গেই রেখে ছড়াতে হবে, পৃথক করা যাবে না।
দ্রুত ছড়ানো চামড়া রোদে না শুকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার পানি দ্বারা ভালোভাবে ধুয়ে ঝুলিয়ে রেখে পানি ঝরিয়ে নিয়ে কাপড় দিয়ে ঘসে শুকিয়ে ফেলতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তা যাতে জিআই তারে ঝুলিয়ে রাখা না হয়। দড়িতেও দীর্ঘক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা যাবে না।
লবণ দিয়ে চামড়াকে সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে শীতের দিন সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা ও গরমকালে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টার মধ্যে চামড়ার ভেতরের অংশে ভালোভাবে লবণ ছিটিয়ে ভাঁজ করে সংরক্ষণ করতে হবে সঠিক সময়ে।
গরুর চামড়া প্রতি পাঁচ কেজি, মহিষের চামড়া প্রতি ৭.৫ কেজি এবং ছাগল/ভেড়ার চামড়া প্রতি ১.৫ কেজি লবণ মাখাতে হবে।
আমাদের দেশে দুই ঈদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ ব্যক্তিরা চামড়া ছড়ানোর কাজটি করেন, এতে চামড়ার গুণগতমান খারাপ হয়ে থাকে। তাই অভিজ্ঞ লোকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভালো মানের চামড়া তৈরি করা সম্ভব। পশুর শরীরের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকা অংশ, যেমন—চুট ও এর চতুর্পাশ, মেরুদণ্ড বরাবর, পেছনের দুই পায়ের রানের বহিরাংশের উপরিভাগ ও এর সংযোগস্থল একাধিকবার ছুরির চোখালো মাথা দিয়ে ঘন ঘন টান দিয়ে ছড়ানোর চেষ্টা করলে ওই অংশগুলোর শক্ত চামড়া কেটে যায় বা হালকা হয়ে যায় এবং দেখতে হয় খাঁজ খাঁজ ভাঁজের মতন (লেজকাট)। এই চামড়া ট্যানারিতে প্রক্রিয়াজাত করা হলেও এর খুব কম অংশই ব্যবহার উপযোগী বা রপ্তানিযোগ্য হয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
কোরবানির ক্ষেত্রে পশু জবেহ শেষে তার রক্ষ ও শরীরের যাবতীয় উচ্ছিষ্ট যথাযথভাবে অপসারণ করাই হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। রক্ষের বেলায় রক্ষ ঝরানোর স্থানেই মাটি চাপা দেওয়া উত্তম এবং গর্তের মধ্যে কিছু চুন বা ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক, যেমন—ফাম-৩০ ইত্যাদি দেওয়া, যাতে দুর্গন্ধ না ছড়ায় এবং শিয়াল/কুকুর মাটি খুঁড়ে রক্ত ছড়াতে বা খেতে না পারে।
পশুর দেহ থেকে নাড়িভুঁড়ির উচ্ছিষ্ট (অর্ধহজমযুক্ত খাদ্য/গোঘাষি) বের করে যত্রতত্র ফেলে দিলে তা পচে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াবে এবং পরিবেশ দূষিত হয়ে বিভিন্ন রোগ ছড়াবে, যেমন—বর্জ্য থেকে চর্মজাতীয় রোগ উৎপত্তি হয়ে মানবদেহে বা পশুর শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। এ ছাড়া কিছু ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি হয়ে খাদ্যের সঙ্গে মিশে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে, যেমন—ক্লোস্টেডিয়াম পারফিরিনজেস টাইপ ডি/এন্টরো টক্সিমিয়া ইত্যাদি।
অতএব, জবেহ পর্ব শেষে রক্তের মতো শরীরের যাবতীয় উচ্ছিষ্ট একত্র করে মাটিতে তিন/চার ফুট গর্ত করে তার ওপর চুন, ব্লিচিং পাউডার বা ফাম-৩০ নামক জীবাণুনাশক স্প্রে করে তার ওপর কাঁটাজাতীয় কিছু ডালপালা এবং খড়কুটা দিয়ে ঢেকে শক্ত করে মাটিচাপা দিতে হবে। মাটিচাপার ওপরে কিছু মোটা তুষ ছিটিয়ে দিলে শেয়াল বা কুকুর মাটি গর্ত করে ময়লা তুলতে পারবে না।
মাংস সংরক্ষণে করণীয়
আমরা সাধারণত মাংস কেটে নিয়ে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করি। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, কাটা মাংস না ধুয়ে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা বোকামি। এতে করে মাংসে লেগে থাকা রক্তের কারণে পচন ধরতে পারে। এ মাংস খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পারে। তাই রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের পূর্বে অবশ্যই ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে নিয়ে শক্ত করে চেপে চেপে রক্তমিশ্রিত পানি ঝেরে নিতে হবে। এর পর সংরক্ষণ করতে হবে। এ ছাড়া মাংসকে পরিষ্কার করে নিয়ে রোদে শুকানো যেতে পারে। মাংস চেপে নিয়ে লবণপানিতে হালকা চুবিয়ে নিয়ে অতঃপর চেপে নিয়ে রোদে শুকানো যায় বা রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। অনেক সময় মাংসকে ধোয়ায় স্মোক করে রাখা যায়। অথবা মাংসকে কিমা বানিয়ে বিভিন্ন মসলা দিয়ে মিশিয়ে সস তৈরি করেও সংরক্ষণ করা যায়।
আপনার এবারের ঈদ হোক আনন্দের এবং কোরবানি হোক আল্লাহর দরবারে সত্যিকারভাবেই গ্রহণযোগ্য।

হাইলাইটস এর আরো খবর