সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯
logo
সাইবার অপরাধ তদন্ত
পুলিশে প্রশিক্ষিত জনবল সংকট তীব্র
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট, ২০১৬ ১৬:৫৪:৫৩
প্রিন্টঅ-অ+
হাইলাইটস ওয়েব

ঢাকা: দেশে দিন দিন সাইবার অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। গত ২ বছর ধরে সরকার সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এখনো এ ধরণের অপরাধ তদন্তে পুলিশে প্রশিক্ষিত জনবল সংকট তীব্র। তবে প্রায় ৫০০ জনবল নিয়ে নতুন একটি ইউনিট গঠনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি এখন পুলিশ সদর দফতরে রয়েছে।
বর্তমানে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো তদন্ত  করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সেখানকার কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তকাজে তারা বিশ্বের বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন। সিআইডিতে ডিজিটাল ফরেনসিক, ইনভেস্টিগেশন (তদন্ত) ও ইন্টিলিজেন্স (গোয়েন্দা) টিমে কাজ করছেন সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা। এর মধ্যে সরাসরি তদন্তকাজে যুক্ত প্রায় ১৫ জন। অন্যরা প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাইবার অপরাধের মামলাগুলো আদালতে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিচারক মামলার নথিপত্রে বিশেষজ্ঞের মতামত আছে কি না তা দেখেন। যদি না থাকে তাহলে সেটি সংযোজন করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার জন্য বলা হয়। আদালতে মতামত দাখিলের পর তার আলোকেই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম চলে।
 
২ বছর ধরে কাজ করছে সরকার
পুলিশের বিশেষ বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানিয়েছেন, “দেশে সাইবার হামলার ঘটনা ঘটলে কোন কোন জায়গাগুলো আক্রমণের শিকার হতে পারে এবং এর ফলে কী ধরণের ক্ষতি হতে পারে, এসব নিয়ে সরকার গত দুই বছর ধরে কাজ করছে।” গত ১৩ আগস্ট রাজধানীতে সাইবার অপরাধ বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এ তথ্য জানান।
র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, একজন নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানি হলে সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ওই নারীর কাছে খুবই গুরুত্বের বিষয়। কিন্তু তুলনামূলক তার চেয়েও বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় পুলিশ কর্মকর্তাদের। এ জন্য সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
 
হিমশিম খাচ্ছে সিআইডি
সাইবার অপরাধ তদন্তে সিআইডির মতো বিশেষায়িত কোনো তদন্ত দল পুলিশের অন্য কোনো শাখায় নেই। তাই এ সংক্রান্ত সারা দেশের অভিযোগগুলো নিয়ে কাজ করতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে সিআইডিকে।   
 
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ২০১৩ সালে ২৫টি, ২০১৪ সালে ৬৫টি, ২০১৫ সালে ২০৭টি এবং চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ২০০টির বেশি অভিযোগ তারা পেয়েছেন। যে হারে অভিযোগ আসার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তাতে বেশ হিমশিমই খেতে হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
সাইবার অপরাধ তদন্তে বিভিন্ন দেশ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার শেখ রেজাউল হায়দার। তিনি নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে কাজের চাপ খুব বেশি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে সাকা চৌধুরীর রায় ফাঁস, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘রিজার্ভ হ্যাকিং’ এবং সম্প্রতি জঙ্গিদের ঘটনাগুলোর সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট সব তদন্তকাজই আমাদের করতে হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) থেকেও বিভিন্ন মামলা আসছে।”  
তিনি বলেন, “জনবলের তুলনায় কাজের চাপ অনেক বেশি। তাই তদন্তের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোকেই অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে।”    
 
পুলিশের অন্য শাখাগুলোর অবস্থা
সাইবার অপরাধ তদন্তে সিআইডির মতো বিশেষায়িত কোনো তদন্ত দল পুলিশের অন্য কোনো শাখায় নেই।
পিবিআই: পুলিশের বিশেষায়িত নতুন ইউনিট ‘পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’ বা (পিবিআই)। প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৬ মাস পর গত ৫ জানুয়ারি পুলিশের তদন্তকাজে বিশেষজ্ঞ এই ইউনিটের বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এখানে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করছেন পাঁচজন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি), একজন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), দুজন পরিদর্শক ও একজন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই)।
র‌্যাব: সাইবার অপরাধ তদন্তে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নেও (র‌্যাব) বিশেষায়িত কোনো ইউনিট নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত কেইস পেলে কর্মকর্তা নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করেন বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের মুখপাত্র আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।
কতোজন কর্মকর্তা সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করেন জানতে চাইলে মুফতি মাহমুদ নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “সেটি বলা যাচ্ছে না। আমি সাধারণত এভাবে কোনো সংখ্যা উল্লেখ করি না।”  
ডিএমপি: ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নতুন ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু হওয়া এ ইউনিটে চারটি বিভাগের মধ্যে একটি সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম। ডিএমপি-ডিবি’র (গোয়েন্দা) অনেক কর্মকর্তাকে নতুন ইউনিটে সংযুক্ত করা হলেও এখনও পরিকল্পিত পূর্ণ জনবল নিয়ে কাজ শুরু করতে পারেনি এই ইউনিট।
 
নতুন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব
সারা দেশে সাইবার অপরাধ সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য প্রায় ৫০০ জনবল চাহিদাসহ ‘সাইবার পুলিশ ব্যুরো’ নামে নতুন ইউনিট গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিআইডি। গত জুন মাসে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে এ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে নতুন বার্তা ডটকমকে জানিয়েছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার শেখ রেজাউল হায়দার।
তিনি বলেন, “বর্তমানে এ প্রস্তাবনা পুলিশ সদর দফতরে রয়েছে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয়ে যাবে।” এতে জনবলের যে চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে তাতে আপাতত সারা দেশের সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত মামলাগুলো সঠিক সময়ে তদন্ত সম্ভব বলে মনে করেন পুলিশের এই শীর্ষকর্তা।  
প্রস্তাবনা অনুযায়ী এই নতুন ইউনিট গঠন হলে এটির অধীনে থাকবে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার (সিআইসি)। এর মধ্যমে সারা দেশের সাইবার অপরাধের অভিযোগ তদন্ত হবে। একইসঙ্গে সিআইসির প্রশিক্ষণ শাখার মাধ্যমে সাইবার অপরাধ তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এসব কর্মকর্তারাই সারা দেশে সাইবার অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করবেন।
শিগগির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
জনবল সংকট প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নতুন বার্তা ডটকমকে বলেন, “দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন বাড়ছে। এ কারণে ইন্টারনেটের অপব্যবহারও হচ্ছে।”  
তিনি বলেন, “সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি। এক্ষেত্রে জনবল বাড়ানোর বিষয়ে আমরা আগেও গুরুত্ব দিয়েছি। এখন আরো বেশি দক্ষ জনবল আমাদের দরকার। ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।” শিগগির এগুলো বাস্তবায়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার (সিআইসি)
উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার (সিআইসি)। রাজধানীর মিল ব্যারাকে অবস্থিত এটি সাইবার অপরাধ তদন্ত সংক্রান্ত পুলিশের একমাত্র সর্বাধুনিক প্রতিষ্ঠান। কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার(কোইকা) অর্থায়নে তিন মিলিয়ন ইউএস ডলার (বাংলাদেশি প্রায় ২৪ কোটি টাকা) ব্যয়ে সিআইসি করা হয়।   
সিআইসিতে ট্রেনিং ও অপারেশন নামে দুটি বিভাগ। ট্রেনিং বিভাগে তদন্ত ও আইনি বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকবে। আর প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা তাদের দক্ষতা প্রমাণ করবেন অপারেশন বিভাগে বিভিন্ন মামলার তদন্তকাজে।
অপারেশন বিভাগের কাজ চলছে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দফতরে। সেখানে একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার কর্মকর্তার অধিনস্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার প্রায় ৩০ জন সাইবার অপরাধ তদন্তে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এডিশনাল ডিআইজি) থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত রয়েছেন। তবে সরাসরি তদন্তকাজে যুক্ত আছেন, এমন জনশক্তির সংখ্যা প্রায় ১৫। অন্যরা প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজে।    
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কম্পিউটার, মোবাইল ও ড্রোনসহ অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে যেসব অপরাধ ঘটছে সেগুলোর ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে অপরাধীকে সনাক্ত করা সম্ভব সিআইডিতে।
সূত্র- নতুন বার্তা

হাইলাইটস এর আরো খবর