সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
logo
শীতলক্ষ্যায় দখলের উৎসব
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট, ২০১৬ ১৭:০২:৫৯
প্রিন্টঅ-অ+

শীতলক্ষ্যা নদীর সীমানা পিলার পেরিয়ে এভাবেই দখল চলছে

হাইলাইটস ওয়েব

ঢাকা: শীতলক্ষ্যা দখলের উৎসব চলছে। বড় বড় শিল্প গ্রুপের বাধাহীন দখল দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এ নদী। রূপগঞ্জের রূপসী এলাকায় শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ই গিলে খাচ্ছে সিটি গ্রুপের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। ভুক্তভোগী লোকজন অভিযোগ করে জানান, সিটি গ্রুপ নিজের শিল্পাঞ্চল বিস্তারে ইতিপূর্বে দুটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম নিশ্চিহ্ন করেও ক্ষান্ত হয়নি, দখল করে নিয়েছে নদীর পূর্ব পাড়ের বিস্তীর্ণ জায়গা। এবার থাবা বাড়িয়েছে নদীর পশ্চিম পাড়েও। পূর্ব গ্রামের গোটা চরপাড়াও গিলতে শুরু করেছে প্রভাবশালী চক্রটি। সিটি গ্রুপ হাইকোর্ট নির্দেশিত সীমারেখা ডিঙ্গিয়েও ঢুকে পড়ছে নদীর ভিতর। সেখানে বালু-মাটি, সুরকি ভরাটের মাধ্যমে দখল করে নিচ্ছে নদী। রূপসী সংলগ্ন পূর্বগ্রাম এলাকায় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম পাড়ে শিল্প গ্রুপটি নদী সীমার সরকারি পিলার পর্যন্ত তুলে ফেলছে অহরহ। তারা নিজেদের খেয়াল খুশিমতো নদীর আরও ভিতরে পিলার স্থাপন করে একরের পর একর জায়গা জবর দখল করে নিচ্ছে। সেখানে নদীর পাড় নয় শুধু, নৌপথ পর্যন্ত দখল করে নিজেদের কব্জায় রাখা হচ্ছে। শীতলক্ষ্যার সচল থাকা নৌপথের ক্যানেল জুড়ে সারি সারি ভাবে রেখে দেওয়া হচ্ছে এমভি সিটি নামের বড় বড় পণ্যবাহী ভেসেল। ফলে এ পথে চলাচলকারী নৌযানগুলো আটকে থাকছে মাঝ নদীতেই। সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বড় শিল্প-কারখানাসমূহের যাবতীয় তরল-কঠিন বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে শীতলক্ষ্যায়। মাটির নিচ দিয়ে দীর্ঘ পাইপ টেনে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। নদী ঘেঁষা সিটি গ্রুপের শিল্প-কারখানাগুলো থেকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ১০টিরও বেশি গোপন সুড়ঙ্গপথে পরিশোধন ছাড়াই ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। ফলে গোটা নদীর পানি হয়ে উঠেছে বিষময়। নদীর স্থানে স্থানে বর্জ্য দূষণের বুদবুদ উঠতেও দেখা যায়। বিষাক্ত তরল বর্জ্যে মরে যাচ্ছে নদী, বিপন্ন হয়ে পড়ছে নাগরিক জীবন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতি অমান্য করে শীতলক্ষ্যার দখল ও ভরাট করে কারখানার সম্প্রসারণ চলছেই। নদীর তীর থেকে কমপক্ষে ৩০ ফুট নদী ভরাট করার ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। সরেজমিনকালে দেখা যায়, প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপটির স্থানীয় দালালরা নদীর সীমানা পিলার পর্যন্ত তুলে কলকারখানা বিস্তার করে চলছে। পূর্বগ্রাম চরপাড়ায় সিটি গ্রুপের কেনা জমি সংলগ্ন নদীর সীমানা পিলার একে একে তুলে নদীর ভিতরের দিকে স্থাপন করছে। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ জায়গা জুড়ে নিজেদের জায়গার আয়তন বাড়ানোর পাঁয়তারা চলতে দেখা যায়।
সরেজমিন অনুসন্ধানকালে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ের ভূমি অফিসের কিছুসংখ্যক অসৎ কর্মচারীর যোগসাজশে ইদানীং প্রভাবশালীরা নদীর জায়গার ভুয়া কাগজপত্রও বানিয়ে নিচ্ছে, তৈরি করছে জাল দলিল-দস্তাবেজও। এসব ভুয়া জাল কাগজপত্রকে সম্বল করেই নানারকম মামলা ঠুকে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টিসহ স্থানীয় থানা পুলিশকে নিজেদের পক্ষে রাখার মাধ্যমে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের দ্বারা দখল করে নিচ্ছে নদীর সীমানা। নদীর উভয়পাড়ে জায়গা জমি কেনার মাধ্যমে নদীর টুঁটি চেপে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই পাশ থেকেই নদীর সীমানা দখলবাজির মাধ্যমে একচিলতে খালে রূপান্তর করা হচ্ছে শীতলক্ষ্যাকে। রূপসীতে শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ের কয়েকশ ফুট নদীর সীমা দখল করে বসানো হয়েছে অবৈধ জেটিঘাট। নদীর বুকে শত শত জাহাজ থামিয়ে রাত-দিন মালামাল লোড আনলোড চলতে থাকে। এক্ষেত্রে সরকারকে লাখ লাখ টাকা সার্ভিস চার্জ থেকেও বঞ্চিত রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শীতলক্ষ্যা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট সরেজমিন ঘুরে দখলবাজির নানাচিত্র দেখা গেছে। নদী তীরবর্তী অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদসহ ১২ দফা নির্দেশনা দেয় আদালত। নির্দেশনায় বলা হয়, নদীর সীমানা নির্ধারণী পাকা খুঁটি (পিলার) স্থাপন করতে হবে। চারটি নদীর তীরে পায়ে হাঁটার পথ নির্মাণ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় নদীগুলোর তীরবর্তী ৫০ গজ জায়গা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চারটি নদীতে প্রয়োজনীয় খনন কাজ করবে।
রূপসীসহ আশপাশের নদী তীরে স্থাপিত কারখানাগুলোর যাবতীয় বর্জ্য শোধন ছাড়াই নদীতে নিক্ষেপ করাসহ গোটা এলাকার পরিবেশ দূষণ করে চলছে। বারবার সতর্ক করেও তাদেরকে পরিবেশ দূষণের অপকর্ম থেকে হটানো যাচ্ছে না। সিটি সুপার ইন্ডাস্ট্রিজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে ৫৭ লাখ টাকা জরিমানা দণ্ড দেওয়া হয়। বারবার সতর্ক নোটিস জারি আর পরিবেশ অধিদফতরের দণ্ড প্রদান সত্ত্বেও শীতলক্ষ্যা নদীর দখল-দূষণ কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন কলকারখানার তরল-কঠিন বর্জ্য খোলা ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করায় ভয়াবহ দূষিত হয়ে পড়েছে শীতলক্ষ্যা।
পরিবেশবাদীরা পর্যবেক্ষণ শেষে জানিয়েছেন, শীতলক্ষ্যায় খোলামেলাভাবে ফেলা বর্জ্যের মধ্যে ক্রোমিয়াম, পারদ, ক্লোরিন, নানা ধরনের এসি দস্তা, নিকেল, সিসা, ফসফোজিপসাম, ক্যাডমিয়াম, লোগা অ্যালকালি অন্যতম। রাসায়নিক বর্জ্য-উপাদান মিলেমিশে পানির রং যেমন পাল্টে গেছে, তেমনি বিষময় করে তুলছে। লাখ লাখ মানুষ পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে জন্ডিস, ডায়রিয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মূত্রনালি ও কিডনিজনিত রোগ, চর্মরোগসহ ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।
২০১১ সালে এক রায়ে মহামান্য হাইকোর্ট নদীতে সংযুক্ত সব পয়ঃপ্রণালীর লাইন ও শিল্প-কারখানার বর্জ্য নিঃসরণ লাইন অবিলম্বে বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সব মহলকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নদী দূষণমুক্ত রাখাসহ ভূমিদস্যুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য বিআইডব্লিউটিএ-কে এবং নদীতে বর্জ্য ফেলা রোধে সচেতনতা সৃষ্টিসহ বর্জ্য অপসারণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেন। পাশাপাশি জেলা প্রশাসককে প্রতি মাসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ আদালতের এসব আদেশ-নির্দেশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। আদালতের আদেশে নদীর সীমানা নির্ধারণের সিএস নকশা অনুসরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিপালন করা হয়নি।
 

হাইলাইটস এর আরো খবর