সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
logo
বগুড়ায় কমান্ডিং কার্যালয়
পাক-আফগানে প্রশিক্ষিতরাই বানাচ্ছে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল, ২০১৬ ১৮:৫৯:২৭
প্রিন্টঅ-অ+
হাইলাইটস ওয়েব

বগুড়া: পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক দিয়েই দেশে তৈরি হচ্ছে হ্যান্ডগ্রেনেড। আর এসব হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরি করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রশিক্ষিত কারিগররা। যারা উচ্চমাত্রার ওইসব গ্রেনেড ও বোমা তৈরির বিশেষ কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে।
বগুড়ায় উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড ও সেসব তৈরির জন্য রসদের পরিমাণ দেখে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের এসব তথ্য দিয়েছেন।
জঙ্গিবাদ মোকাবেলা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনসহ সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে গঠিত ঢাকা থেকে আসা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ডিভিশনের বোমা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা জানান, গত ৪ এপ্রিল বগুড়ায় যে পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক নাইট্রোজেল পাওয়া গেছে তা দিয়ে তৈরি বোমায় পুরো বগুড়া শহর গুড়িয়ে দেয়া সম্ভব। জঙ্গিদের হাতে এতো বেশি পরিমাণ ও দুঃপ্রাপ্য বিস্ফোরক কী করে এলো তা নিয়ে আতঙ্কি প্রকাশ করেছেন তারা। তবে তারা নিশ্চিত, জেএমবির আত্মঘাতী (ডেথ স্কোয়াড) দুর্ধর্ষ জঙ্গিরাই এসব করছে।
গোয়েন্দারা বলেন, আত্মঘাতী এসব জঙ্গি পাকিস্তানি জঙ্গিদের আদলে দেশের ভেতরে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। অব্যাহত রেখেছে নাশকতার পরিকল্পনাও। নিখুঁত নিশানার এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল, সুইসাইড ভেস্ট, সেনাবাহিনীর পোশাক, বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড তৈরির শক্তিশালী বিস্ফোরক, জঙ্গি বিষয়ক সরকারি পরিপত্রও মিলছে এসব জঙ্গির বিভিন্ন আস্তানায়। আর এসব কারণেই সর্বত্র বাড়ছে শঙ্কা-উৎকণ্ঠা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, সামনে বাংলা নববর্ষ বৈশাখী উৎসবকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় এসব গ্রেনেড তৈরি হয়ে থাকতে পারে। একই সাথে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির বিষয়টিও সামনে আসছে। তবে বগুড়ার এই গ্রেনেডগুলো শুধু যে বগুড়ায় নয়, সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও নাশকতার কাজে যে ব্যবহার হতো সে সম্পর্কে নিশ্চিত গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দা পুলিশের গণযোগাযোগ উইং সূত্রমতে, এর আগে বগুড়ায় ছাত্রবাসে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, হাতবোমা, জিহাদি বই ও বিস্ফোরক উদ্ধার হলেও গ্রেনেড উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম। তবে গোয়েন্দা পুলিশের তালিকায় বরাবরই জঙ্গি তৎপরতায় বগুড়ার নাম এগিয়ে। কারণ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোপূর্বে সংগঠিত নাশকতায় বগুড়ার জেএমবি দলের একাধিক সদস্য রয়েছে। একই সাথে মসজিদ ও মন্দিরে হামলার ঘটনার সাথে জেএমবির সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।
সূত্রমতে, রাজধানীর হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলা, আশুলিয়ায় চেকপোস্টে পুলিশ হত্যার ঘটনাও নিজস্ব স্টাইলে জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্যরা করেছে। এরপর মিরপুরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ জেএমবির সদস্য আলবানি ওরফে হোজ্জা নিহত হন। তিনি জেএমবির আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য। রাজশাহীর বাগমারায় মসজিদে নিজ দেহে বোমা বিস্ফোরণে নিহত যুবকও জেএমবির সুইসাইড স্কোয়াডের (আত্মঘাতী) সদস্য। বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদেও হামলায় জড়িত জেএমবির সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্যরা। জেএমবির এমন প্রায় ৫ শতাধিক আত্মঘাতী জঙ্গি সদস্য এখনও সক্রিয় বলে ধারনা করছে পুলিশ।
জেলা পুলিশ জানায়, বগুড়ার আগে ঢাকার মিরপুরের শাহআলীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে তিন জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং ১৭টি তাজা গ্রেনেড ও বিপুল বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। সেখানে আরো পাওয়া যায় ‘সুইসাইড ভেস্ট’। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনের মধ্যে দু’জনই জেএমবির আত্মঘাতী দলের সক্রিয় সদস্য। তবে পুলিশের ওই সাঁড়াশি অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় জেএমবির আইটি প্রধান ও কমান্ডার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার শাকিল ও ঢাকা বিভাগীয় অপারেশনাল কমান্ডার সোহেল রানা ওরফে ইমরান।
বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার মিরপুরের আস্তানা থেকে যে ‘সুইসাইড ভেস্ট’ পাওয়া যায়, তা আত্মঘাতী হামলা ছাড়াও আরো এক ধরনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। উগ্রপন্থিরা ওই ভেস্টের ভেতরে একসঙ্গে বিস্ফোরক, অস্ত্র, গুলি ও টাকা রাখে।
গোয়েন্দারা জানান, সারাদেশে বর্তমানে জেএমবির ৪-৫ জন সুদক্ষ বোমা তৈরির কারিগর আছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন- বগুড়ার জান্নাতুল ফেরদৌস। পুলিশ একে দেখেনি। চেহারাও জানা নেই। গত ৩ এপ্রিল গ্রেনেড বিস্ফোরণে শেরপুরে যে দু’জনের মৃত্যু হয় তাদের একজন জীবিত থাকা অবস্থায় হাসপাতালে বারবার পানি পান করতে চান। সেময় পুলিশ তার নাম জানতে চাইলেও সে পুলিশের কাছে নিজের নাম পরিচয় প্রকাশ করেনি। এটি থেকে প্রমাণিত যে নিহতরা জেএমবির প্রশিক্ষিত সদস্য।
জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে কাজ করছেন পুলিশের বিশেষ শাখার এমন একজন কর্মকর্তা জানান, জেএমবি যে আস্তানায় গ্রেনেড ও বোমা তৈরি করে সেটি ‘কোম্পানি কমান্ডিং’ কার্যালয়। সেখান থেকে অস্থায়ীভাবে দেশের যেসব জায়গায় গ্রেনেড ও গোলাবারুদ পাঠানো হয়, তাকে বলা হয় ‘সামানা’। জেএমবির সামরিক শাখার নাম ‘ইসাপা’। জেএমবিতে দলভূক্ত করতে যারা মোটিভেশন, গোলাবারুদ সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও অর্থ সংগ্রহ করে তাদের বলা হয় ‘দায়ী’। ৪-৫ মাস পরপরই জেএমবি তাদের কমান্ডিং কার্যালয় ও ‘সামানা’র ঠিকানা পরিবর্তন করে। বগুড়ার এই আস্তানাটি তারা এই অঞ্চলের ‘কোম্পানি কমান্ডিং’ হিসেবে ব্যবহার করতো বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, বাংলাদেশে পাওয়া উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা। এসব বিস্ফোরক দিয়ে হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরির সঙ্গে জড়িত অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে। যারা জেএমবির সদস্য। এ ধরনের উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক দিয়ে হ্যান্ডগ্রেনেড বাংলাদেশে একমাত্র জেএমবিই তৈরি করতে পারে। হ্যান্ডগ্রেনেডের নির্মাণ কৌশল পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, যারা এসব তৈরি করছে তারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরকের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এসব বিস্ফোরক ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত পথে বাংলাদেশের জেএমবির কাছে পৌঁছে। এরসঙ্গে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী ছাড়াও দেশ দুটিতে জঙ্গি প্রশিক্ষণে থাকা বাংলাদেশি জেএমবি সদস্যরা জড়িত। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে জড়িত ভারতীয় মুজাহিদীনরাও। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানি জঙ্গিরা উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় মুজাহিদীনদের কাছে পাঠায়। এরা সীমান্ত পথে বাংলাদেশের জেএমবির কাছে পাঠিয়ে দেয়।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো বলেন, উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক মূলত পাউডারের মতো। এরমধ্যে এক ধরনের বিশেষ জেল মেশানো হয়। জেল মেশানো বিস্ফোরক রুটি বা পরাটা বানানোর আগে যেভাবে মন্ড তৈরি করা হয়, ঠিক সেভাবে মাখানো হয়। এরপর এসব মন্ড বিশেষ পলিথিনে তৈরি ছোট ছোট পাইপের ভেতরে ভরে মুখ আটকে দেয়া হয়। এরপর তা সীমান্তপথে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে পাচার করা হয়ে থাকে। বগুড়ায় ঠিক এ ধরনের নাইট্রোজেলই প্রায় দেড় বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে জেএমবি। বেশির ভাগ সময়ই ঢাকা থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ দুই বছরে জেএমবি রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ১৩ জন পীর, ফকির ও মাজার ভক্তকে খুন করেছে। হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে কমপক্ষে ২০টি। পুরো বাংলাদেশকে জেএমবি ১২টি অঞ্চলে ভাগ করে চালাচ্ছে সাংগঠনিক তৎপরতা। একেকটি অঞ্চলের একেকজন আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছে। এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের যোগাযোগ খুবই কম। কেন্দ্রীয় ভাবে তারা ঢাকা থেকে পাঠানো নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে।
গোয়েন্দা পুলিশের এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে জেএমবির মজলিসে শুরা গঠিত হওয়ার পর কর্মী তৈরির উদ্দেশ্য শুরা সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। তারা দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে নিজেদের আসল নাম পরিবর্তন করে সংগঠনের ছদ্মনামে বাসা ভাড়া নিয়ে সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করে। জেলার বিভিন্ন থানায় তাবলিগের পদ্ধতিতে সফর শুরু করে। ধর্মীয় আলোচনা, বক্তৃতা ও দাওয়াতের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ কাজ চালাতে থাকে। এক জেলায় কর্মী সংগ্রহ আশানুরূপ হলে শুরা সদস্যরা পরবর্তী অন্য জেলায় গমন করত। যখন সব জেলাতেই কিছু কিছু কর্মী তৈরি হয় তখন তাদের একত্র করে বিভিন্ন আহলে হাদিস মসজিদে তাবলিগ বেশে তালিম দেয়া হয়। তালিম দেয়া শেষ হলে সদস্যদের ইউনিট, থানা ও জেলা সংগঠন অনুযায়ী বিভক্ত করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়। এখনো এসব কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে।

হাইলাইটস এর আরো খবর