মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০
logo
একটি মুমূর্ষু বাংলা একাডেমির জন্য মেরুদণ্ড প্রয়োজন
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১১:১৮:১৫
প্রিন্টঅ-অ+
হাইলাইটস ওয়েব

ঢাকা : একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন, স্বেচ্ছায় কেউ রক্ত দিতে চাইলে নিচের নাম্বারে যোগাযোগ করুন—এমন কাতর আবেদন আমরা প্রায় দেখি টিভি স্ক্রলে। সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানেও এই আকুতি হরহামেশাই চোখে পড়ে। কিন্তু ফেসবুক খুললেই এখন একটি আবেদনই চোখে পড়ছে—একটি মুমূর্ষু বাংলা একাডেমির জন্য মেরুদণ্ড প্রয়োজন। দান করতে আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন।
তবে মেরুদণ্ড দানে আগ্রহীদের যোগাযোগের কথা বলা হলেও সেখানে কোনো নাম্বার বা ঠিকানা নেই। ওই ‘আকুতিভরা’ আবেদনের ছবিটি এখন টক অব দ্য ফেসবুকই নয়, মানুষের মুখে মুখেও। কিন্তু কেন?
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে চলমান অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ব-দ্বীপ প্রকাশনীর স্টলটি বন্ধ করে দেয় পুলিশ। একইসাথে তারা ওই প্রকাশনীর বেশ কয়েকটি বই জব্দ করে।
ওইদিন শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক থেকে আমরা জানতে পারি, ব-দ্বীপ প্রকাশনীতে এমন বই প্রদর্শিত হচ্ছে যেগুলো ইসলাম ধর্মের অনুভূতি আঘাত করা হয়েছে।’
“পরে অনুসন্ধানে পুলিশ দেখে, ‘ইসলাম বিতর্ক’ বইটিতে মহানবী (স.) সম্পর্কে আপত্তিকর শব্দ পাওয়া গেছে। এ কারণে বইটি জব্দ করা হয়েছে এবং মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদের সঙ্গে কথা বলে স্টলটি বন্ধ করা হয়েছে।”
শুধু তাই নয়, ‘ইসলাম বিতর্ক’ বইয়ের সম্পাদনাকারী শামসুজ্জোহা মানিক (৭৩) , প্রকাশনীর কর্মকর্তা ফকির তসলিম উদ্দিন কাজল (৫৩) ও লেখক শামসুল আলম চঞ্চলকে (৫১) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারপর রিমান্ডেও নেয়।
গতবারের বইমেলায় একই অভিযোগে রোদেলা প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দেয় বাংলা একাডেমি। এবারও তার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লেখক-পাঠক-প্রকাশকসহ অনেকেই। তারা বলছেন, বাংলা একাডেমি একটি ‘মেরুদণ্ডহীন’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তাই এর ‘চিকিৎসার জন্য’ মেরুদণ্ড প্রয়োজন।
এর প্রতিবাদে ‘লেখক-প্রকাশক-পাঠক-জনতা’র ব্যানারে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে টিএসসিতে আয়োজিত হয় প্রতিবাদ সমাবেশ। সমাবেশে সবাই মুখে কালো কাপড় বেঁধে এ ঘটনার নিন্দা জানান, দাবি জানান ওই স্টলটি খুলে দিতে এবং শামসুজ্জোহা মানিকসহ গ্রেপ্তারকৃতদের ছেড়ে দিতে।
সমাবেশে গতবারের বইমেলায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ হত্যার প্রসঙ্গ টেনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার বলেন, ‘অভিজিৎকে মারার পর মুক্তমনা মানুষের কান্না, বেদনার অনুভূতি রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায় না, তাদের কানে পৌঁছায় জামায়াত-শিবিরের অনুভূতি। যারা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ করে, সরকার তাদের গ্রেপ্তার-নির্যাতন করে।’
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের উদ্দেশে লাকী প্রশ্ন রাখেন, ‘কেউ যদি বলে বইমেলা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে, তাহলে কি আপনি পুরো বইমেলা বন্ধ করে দেবেন? ২০১০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছে, তখন কেন এর নামে মামলা করা হলো না? আইনি লড়াই চলতে পারে, তবে স্টল বন্ধ ও লেখককে গ্রেপ্তার করা কখনওই সভ্যতার পরিচায়ক হতে পারে না।’
তবে জনপ্রিয় ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ‘বিতর্কিত’ ওই বইটি পড়তে বারণ করে বলেছেন, ‘যে বইটির কারণে স্টলটি বন্ধ করা হয়েছে, সেটির কয়েক লাইন আমাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পড়ে শুনিয়েছেন। আমি কয়েক লাইন শোনার পর আর সহ্য করতে পারিনি। এত অশ্লীল আর অশালীন লেখা।’ তবে তিনি স্টল বন্ধ করার পক্ষে নন বলেও জানান। তার এ বক্তব্যেও ফেসবুকে চলছে নিন্দার ঝড়।
‘একটি মুমূর্ষু বাংলা একাডেমির জন্য মেরুদণ্ড প্রয়োজন’ লেখা ব্যানারটি টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সীমানাপ্রাচীরে কে বা কারা টাঙিয়ে দেয়। সেই ছবিটিই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে দিচ্ছেন অনেকে। এটিকেই তারা ‘দাবি’ হিসেবে তুলে ধরছেন।
 

হাইলাইটস এর আরো খবর