রোববার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯
logo
ভাঙা বাঁধে পানি ঢুকে ঘরছাড়া মানুষ
প্রকাশ : ১৩ জুলাই, ২০১৬ ২১:৪৫:১৯
প্রিন্টঅ-অ+
পরিবেশ ওয়েব

পটুয়াখালী : ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর সময়ে জেলার রাঙ্গাবালী উপজেলার বেশ কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ওইসব এলাকার কয়েক হাজার সাধারণ মনুষ। বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢোকার কারণে তারা এখন অনেকটাই পানিবন্দী জীবন-যাপন করছেন।
চলতি বছরের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে চরমোন্তাজ ইউনিয়নের নয়ারচর এলাকার দুইটি স্থানে প্রায় ৩০০ মিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এর প্রভাবে দক্ষিণ চরমোন্তাজ ও নয়ারচর গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবার জোয়ারের পানিবন্দী জীবন-যাপন করছেন। ওই দুই গ্রামের মানুষের এখন সীমাহীন দুর্ভোগ। অনেক পরিবার পানির জ্বালা সহ্য করতে না পেরে নিজের বাড়ি ঘর ফেলে স্বজনদের বাড়িতে অস্থায়ী বসতঘর বানিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউবা আবার পাশের বেড়িবাঁধের ওপর ঘর বানিয়ে বসতি গড়েছে। পানিবন্দী ওই দুই গ্রামের লোকজন গবাদি পশু-পাখি নিয়ে রয়েছে চরম বিপাকে। কেউ মুরগি বেঁধে রাখেন খাটে। আর গরু ছাগলের অবস্থা তো বেহাল। ওইসব প্রাণির খাদ্য সঙ্কটসহ লালন-পালনে আরো দুর্ভোগ পোহাচ্ছে গৃহস্থরা।
দক্ষিণ চরমোন্তাজ গ্রামের মো. শামীম হাওলাদার বলেন, ‘গরু-বাছুর আল-আইল্লাডি (হাল-হালুটি) আমাগো কৃষকের একটা সম্পদ। বান (বাঁধ) ভাইঙ্গা অ্যাহন গরু বাছুর লইয়া একটা বিপদের মধ্যে আছি। আমার ১০টা গরু আছেলে, তিনডা বেইচ্চা হালাইছি। আরো গরু বেচমু, গরু পালমু খাওয়ামু কী। এই গ্রামের অনেক কৃষক গরু ব্যাইচ্চালাইছে। বান ভাইঙ্গা আমাগো ঘর-সংসার সব শ্যাষ।’
একই এলাকার মো. কামাল হোসেন নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘দুই তিন মাইল আইট্টা (হেঁটে) গরুরে ঘাস খাওয়াইতে নেতে অয়। কামাই করমু না গরুরে ঘাস খাওয়ামু। আমাগো এই কষ্টের কতা আমনেরা সামবাদিকরা (সাংবাদিক) লেইক্কা কী করবেন, পত্রিকায় লেখলে কী অয়? কবে বইন্যা গেছে অ্যাহন পর্যন্ত বানডা (বাঁধ) ঠিক অইলে না। কত সামবাদিক আইছে, ছবি করছে কিছুই অয় নাই।’
বসতঘর ডুবে যাওয়ার কারণে নয়ারচর গ্রামের মো. আলাউদ্দিন বেড়িবাঁধের ওপর একমাস আগে ঘর বানিয়ে বসতি গড়েছেন। তিনি বলেন, ‘কেমন করমু আমাগো এলাকার বেড়ি ছুইট্টা গ্যাছে, পানিতে ঘরবাড়ি সব তলাইয়া গ্যাছে। মাইনস্যের (অন্যদের) বাড়ি কয়দিন থাওন যায়। অ্যাহন এই বান্ধের (বাঁধে) উপরেই ঘর বানাইছি।’
চরম দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে পানিবন্দী গ্রামগুলোর কয়েক শতাধিক শিক্ষার্থী। পূর্ব চরমোন্তাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি পাড়ি দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। একই অবস্থা চরমোন্তাজ আব্দুস সত্তার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। এসব এলাকার লোকজন পানির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ধর্মীয় বড় উৎসব ঈদুল ফিতরের আনন্দ উদযাপন করতে পারেনি।
ওই বাঁধ বিধস্ত হয়ে ভেসে গেছে প্রায় ৫০টি মাছের ঘের। চরমোন্তাজ ইউনিয়নের মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির করা কাশেম খার ডোস ঘেরটি প্লাবিত হয়ে প্রায় আট লাখ টাকার পোনা মাছ ভেসে গেছে। ওই সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল ইসলাম শহীদ বলেন, ‘বাঁধ ভাঙনে ঘের মালিকদের প্রায় কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এখন ঘের আর নদী সমান। সামগ্রিকভাবে এ ক্ষতির পরিমান বছর শেষে ১০ থেকে ১২কোটি টাকা হবে।’ বর্তমানে আমন আবাদের জন্য জমিতে লাঙলের হাল বসাতে পারছে না কৃষক। কৃষকরা জানিয়েছেন দ্রুত বাঁধ সংস্কার করা না হলে আমন চাষাবাদ করা চলতি মৌসুমে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এছাড়া বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানিতে চরমোন্তাজ পুরাতন বাজার এবং বালিয়াবুনিয়া বাজারের এক কিলোমিটার আরসিসি সংযোগ সড়কটি ডুবে থাকার কারণে ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ওই সড়কে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মো. ইছা মীর বলেন, ‘বাঁধ ভাইঙ্গা যাওনের কারণে তিন চাইডা রাস্তা পানিতে ডুইব্বা থাহে। আমাগো কামাই অ্যাহন বন্ধ। বড় কষ্ট আমরা এক দেড়শ মোটরসাইকেল ড্রাইভার।’
চরমোন্তাজের নয়ারচরের বেড়িবাঁধই রোয়ানুর থাবায় বিধস্ত হয়নি। ভেঙেছে একই ইউনিয়নের চর বেষ্টিন এলাকায় ২০ মিটার, চর আন্ডার আলেকান্দা এলাকায় দুইটি স্থানে প্রায় ২০ মিটার এবং বৌবাজার এলাকায় ১০ মিটার বেড়িবাঁধ বিধস্ত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে আছে। ফলে ওইসব ভাঙন কবলিত এলাকায় প্রায় সাত হাজার মানুষ এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারের জন্য কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আমরা সরেজমিনে পরির্দশন করে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করা হচ্ছে দ্রুত বরাদ্দ পাওয়া যাবে এবং তা হাতে পেলে যত দ্রুত সম্ভব ভাঙা অংশগুলো সংস্কার করা হবে।’

পরিবেশ এর আরো খবর