বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯
logo
তেঁতুলিয়ায় পাথর উত্তোলন অব্যাহত, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
প্রকাশ : ২৪ জুন, ২০১৬ ১৬:১৬:০৪
প্রিন্টঅ-অ+
পরিবেশ ওয়েব

পঞ্চগড়: প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল সুপ্রিম কোর্টের রায়কে অবজ্ঞা করে মাটির ৮০ থেকে ১২০ ফুট গভীর থেকে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন  করছে।
খাল-বিল, নদী-নালা, সরকারি জলমহাল আর নোম্যান্স ল্যান্ড কোনো কিছুই বোমা মেশিন পাথর ব্যবসায়ীদের চোখে বাঁধে না। কোনো স্থানে পাথর খনির সন্ধান পেলে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে পাথর উত্তোলণ করেই চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এর ফলে হাজার হাজার একর ফসলি জমি অনাবাদি হওয়াসহ প্রতিনিয়ত জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলার ভজনপুর, মাঝিপাড়া, বুড়াবুড়ি, শালবাহান কালিতলা, দেবনগরের শিবচন্ডী, জয়গুনজোত, কালিয়ামণি গ্রামের করতোয়া নদী ও আশপাশ এলাকায় গভীর রাত পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করা হয়।
ঝালেঙ্গিগছ, ধানশুকা গ্রামের করতোয়া নদী-সংলগ্ন এলাকা, পাথরঘাটা, আঠারখারী, সুরিগছ, শেকগছ, ময়নাগুঁড়ি গ্রামের বিভিন্ন সমতলভূমি গর্ত করে তোলা হচ্ছে পাথর।
এদিকে ভজনপুর ইউনিয়নের বোগলাহাগী, চোয়ামতি, ফকিরহাট, ভাঙ্গিপাড়া, বাসবারী, ভদ্রেশ্বর, কুকুরমুহা, গনাগছ গ্রামের করতোয়া নদী-সংলগ্ন খাসজমি ও পাশের সমতল এলাকায়ও একই কায়দায় পাথর তোলা হচ্ছে।
একই ইউনিয়নের খনিয়াগছ, গিতালগছ, ডাক্তারপাড়া, ডিমাগছ, বৈরাগীগছ, ঘগারখাল, কাউরগছ, ডাঙ্গি গ্রামের বিভিন্ন সমতলভূমি, বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের হারাদীঘি, বালাবাড়ী, শিলাইগুঁড়ি, কালদাসপাড়া বালাবাড়ী, কাটাপাড়া গ্রামের ডাহুক নদী-সংলগ্ন এলাকায়, শালবাহান হাট ইউনিয়নের মাঝিপাড়া ডাহুক গুচ্ছগ্রাম থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে লোহাকাচি গ্রাম পর্যন্ত ডাহুক নদীর বিস্তৃর্ণ এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মানুষ।
সূত্র বলছে, পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের ভজনপুর বাজারের করতোয়া ব্রিজের পশ্চিমে প্রকাশ্যেই পাথর উত্তোলনের জন্য ড্রেজার মেশিন তৈরির কারখানা ও ওয়ার্কশপ খোলা হয়েছে। এসব বোমা মেশিনের মালিকদের আবার প্রতিরাতে মেশিন প্রতি মোটা অংকের ঘুষ দিতে হয়। ওই ঘুষের টাকা উপজেলায় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের ম্যানেজের নামে ভাগবাটোয়ারা হয়।
জানা গেছে, ডিমাগছ গ্রামের আবু বক্কর, সংগঠন এলাকার আব্দুল হামিদ ও মাঝিপাড়া শালবাহান রোডস্থ ফরিদ হোসেনসহ অর্ধ ডজন দালাল ঘুষের টাকা তুলে পুলিশ প্রশাসনসহ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করার দায়িত্ব পালন করছেন।
একই সঙ্গে দালাল চক্রটি জনপ্রতি প্রতিদিন ১ হাজার টাকায় কল বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছে। মোবাইল কল বাহিনী বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশাসনের অভিযানের কোনো তথ্য পেলেই মেশিন-মালিকদের খবর পৌঁছান। আর খবর পাওয়া মাত্রই মালিকরা বালুর মধ্যে মেশিন লুকিয়ে ফেলে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ অভিযানে যাবার আগেই আগাম বার্তা কল বাহিনীকে জানিয়ে দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য চলছে বলেও অভিযোগ মিলেছে।
এর আগে গত ১৭ এপ্রিল বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য ভজনপুর বাজার বাসস্ট্যান্ডে উপজেলা প্রশাসন আলোচনা সভা করে।
সেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন এর সভাপতিত্বে ১৮ ব্যাটালিয়ন বিজিবি’ পঞ্চগড় অধিনায়ক, লে. কর্নেল আল হাকিম মুহাম্মদ নওশাদ, পঞ্চগড় পুলিশ সুপার-গিয়াস উদ্দিন আহমদ, পঞ্চগড় জেলা এএসপি (সার্কেল) মো. কফিল উদ্দিন, তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল করিম, তেঁতুলিয়া মডেল থানা অফিসার ইনচার্জ, সরেস চন্দ্র, পঞ্চগড় জেলা পাথর বালি যৌথ ফেডারেশন, সাধারণ সম্পাদক, আমান উল্লাহ বাচ্চু, পঞ্চগড় জেলা পাথর বালি ও খনিজ সম্পদ সরবরাহকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক- আবু সালেক, তেঁতুলিয়া উপজেলা পাথর বালি ও শ্রমিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি-মজিবর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক-আব্দুল জলিল বক্তব্য রাখেন।
সূত্র বলছে, এরপর থেকে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনে ব্যবসায়ীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
 
পরিবেশবিদদের মতে, বোমা মেশিনের সাহায্য পাথর উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভের নীচে শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলে ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই  এলাকার আবাদি জমি ও বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়াসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষতির আঙ্শকা রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে পরপর প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভূটান ও চীনে কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। বেশিরভাগ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে ৬০-১০০ কিলোমিটারের নিকটবর্তী।
তাদের মতে, আগামীতে এমন ভূকম্পন হলে তেঁতুলিয়ার বিস্তৃর্ণ এলাকায় ভূমিধসের সৃষ্টি হবে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য উপজেলা প্রশাসন সার্বিক চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বুধবার (১৫ জুন) দুটি বোমা মেশিন ও পাইপ আটক করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

পরিবেশ এর আরো খবর