বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০
logo
কলকাতায় কমছে কাক-চড়ুই-শালিক
প্রকাশ : ০৬ জুলাই, ২০১৫ ২০:৪৭:০৪
প্রিন্টঅ-অ+
পরিবেশ ওয়েব

কলকাতা: শহুরে পাখি বলতেই ভেসে ওঠে কাক-চড়ুই-শালিকের চেহারা। কিন্তু ভারতের কলকাতার মানুষ বলছেন, ইদানীং আর এই পাখিগুলো প্রায় দেখাই যায় না। এ বার একই কথা বলছেন দেশের প্রাণী সর্বেক্ষণের (জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) গবেষকেরাও। সম্প্রতি কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকায় পাখির উপরে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিলেন তারা। সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছে, শহরে কাক-চড়ুই-শালিকের সংখ্যা অনেকটাই কম।
প্রাণী সর্বেক্ষণের অধিকর্তা কৃষ্ণমূর্তি বেঙ্কটরমন বলছেন, বছরখানেক ধরে কলকাতা ও লাগোয়া এলাকায় এই সমীক্ষা চলেছে। সমীক্ষায় যত সংখ্যক কাক-চড়ুই-শালিক পাওয়ার আশা ছিল, ততটা মেলেনি। তার আরও দাবি, মহানগরে এমন সমীক্ষা আগে হয়নি। এর ফলে আগামী দিনেও শহরে পাখি কমছে না বাড়ছে, সেটা বোঝার জন্য এই রিপোর্টের উপরেই ভিত্তি করতে হবে।
কেন শহরে কমছে কাক-চড়ুই-শালিকের সংখ্যা?
প্রাণী সর্বেক্ষণের বিজ্ঞানীরা বলছেন, চড়ুই-শালিক-কাকের মতো পাখি মানুষের বাসস্থানের খুব কাছাকাছি থাকে। এরা খাবারের জন্যও অনেক সময় মানুষের উপরে নির্ভর করে। শহুরে জীবনযাত্রায় যে বদল এসেছে, তার ফলেই এই পাখিদের জীবনযাত্রার উপরে একটা প্রভাব পড়েছে। আরও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, এই বদলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি কাক-চড়ুইরা।
প্রাণী সর্বেক্ষণের বিজ্ঞানী বুলগানিন মিত্র বলছেন, শহর ও লাগোয়া এলাকায় গড়ে ওঠা বহুতলের ফ্ল্যাটে ঘুলঘুলি থাকে না। ফলে শহরে চড়ুইয়ের স্বাভাবিক বাসস্থান কমে গিয়ে তাদের জীবনচক্রটাই বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বাসস্থান না থাকায় কী ভাবে পাখির জীবনযাত্রা বদলাচ্ছে, তার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলছেন, ‘‘আমার মধ্যমগ্রামের বাড়ির ভিতরে টাঙানো দড়িতে বাসা বেঁধেছিল এক জোড়া দুর্গা টুনটুনি! এটা সাধারণত দেখা যায় না।’’
কাক-শালিকের সংখ্যা কমার পিছনেও শহুরে জীবনযাত্রা বদলানোকে দায়ী করছেন গবেষকেরা। তারা বলছেন, কাক মূলত বাসা বাধে বাড়ি লাগোয়া গাছে। খাবার বলতে মানুষের উচ্ছিষ্ট এবং ছোটখাটো প্রাণী। শহরাঞ্চলে গাছ অনেকটাই কমে গিয়েছে। খোলা ডাস্টবিন বন্ধ হওয়ায় পথেঘাটে উচ্ছিষ্ট সে ভাবে মেলে না। তার ফলেই কাকের সংখ্যা কমছে। প্রাণী সর্বেক্ষণের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম অধিকর্তা সুজিত চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘ইঁদুর মারতে প্রচুর বিষপ্রয়োগ করা হয়। তার পর অনেক সময়ই মরা ইঁদুর ফেলা হয় খোলা জায়গায়। সেই ইঁদুর খেয়ে কাকের শরীরেও বিষক্রিয়া হয়।’’ প্রাণীবিজ্ঞানীদের মতে, গাছ কমে যাওয়ায় শালিকের বাসস্থান কমেছে, কমেছে প্রজননের হার। শুধু তাই নয়, মাঠঘাটে জন্মানো ঘাসের দানা, ছোটখাটো কীটপতঙ্গ ছিল শালিকের খাবার। মাঠঘাট কমে যাওয়ায় শালিকের খাবারও কমে গিয়েছে।
তবে সল্টলেক, রাজারহাটের মতো যে সব এলাকায় এখনও গাছপালা ও ফাঁকা মাঠ রয়েছে, সেখানে কিন্তু গবেষকেরা তুলনামূলক বেশি কাক-চড়ুই-শালিক খুঁজে পেয়েছেন। এই কথাকে সমর্থন করছেন সুজিতবাবুও। তিনি বলছেন, গাছপালা থাকায় যেমন বাসা বাঁধার সুবিধা রয়েছে, তেমনই খাবার হিসেবে ফলও পায় পাখিরা। একই সঙ্গে জনপদ হিসেবে সল্টলেক গড়ে ওঠার প্রথম দিকে তৈরি বাড়িগুলিতে এখনও ঘুলঘুলি রয়েছে। সেখানেও বাসা বাঁধতে পারে চড়ুই-শালিকেরা। ‘‘আমার বাড়িতেই সকালবেলা প্রচুর চড়ুই হাজির হয়,’’ বলছেন সল্টলেকের বাসিন্দা সুজিতবাবু। তার আরও দাবি, শহর কলকাতার বাইরে আরও কিছু এলাকায় ইদানীং চড়ুই পাখির সংখ্যা বাড়ছে বলে শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট? প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশকর্মী ও প্রকৃতিপ্রেমিকদের অনেকেই। তারা বলছেন, পাখি বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম উপাদান। এরা কমে গেলে পরিবেশের উপরেও বড় প্রভাব পড়বে। তাই পাখি বাঁচাতে শহর জুড়ে গাছের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলছেন তারা। পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত বলছেন, শহরের পার্কে যে আলোর আধিক্য বেড়েছে, তাতেও পাখির জীবনযাত্রায় কুপ্রভাব পড়েছে। পাখি বাঁচাতে রাস্তায়-পার্কে আলো লাগানোর ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার দাবি তুলেছেন তিনি।– ওয়েবসাইট।

পরিবেশ এর আরো খবর