বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০
logo
হারিয়ে যাচ্ছে শেখ ফরিদ পাখি
প্রকাশ : ২০ জুন, ২০১৫ ১৬:২২:০৮
প্রিন্টঅ-অ+
পরিবেশ ওয়েব

পঞ্চগড়: ‘শেখ ফরিদ’ বা ‘কালা তিতির’ এক প্রকার পাখি। এই পাখিটি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন জঙ্গলে বসবাস করে থাকে। দূর অতীতে বনে জঙ্গলে এই পাখিটি পাওয়া যেত। বর্তমানে বন-জঙ্গল ও পরিবেশ বান্ধব পরিবেশের অভাবে পাখিটি হারিয়ে যাচ্ছে। এ পাখিটির গঠন আকৃতি ও সৌন্দর্য্য দৃষ্টি নন্দন বটে। পাখিটি প্রাকৃতিক সৌন্দযে সাথে সাদৃশ্যপুর্ণ ও বড়ই মুগ্ধকর বটে।
 
শেখ ফরিদ বা কালা তিতির পাখিটি মুরগী জাতীয় পাখি। দেখতে ও চলা ফিরায় কিছুটা গৃহ পালিত মুরগির মতো। এ জন্য অনেকে এই পাখিকে মুরগি পাখি আবার অনেকে বন মুরগি বলে ডাকে। আমাদের দেশে বন মুরগি পাহাড়ী এলাকা বা সুন্দরবনে বসবাস করে।
শেখ ফরিদ বা কালা তিতির পাখিটি তিন প্রকার। যথা-কালা তিতির, বাদা তিতির ও মেটে তিতির। পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ না থাকায় বাদা তিতির ও মেটে তিতির আমাদের মাঝ থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে।
এক সময় বাদা তিতির ও মেটে তিতিরকে ঢাকা, খুলনা, সিলেটের তৃনমুল ও নল বনে পাওয়া যেত। এখন আর তাদেরকে তেমন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধুমাত্র কালা তিতির বন্য পরিবেশে টিকে আছে। বাদা তিতি লম্বা ঘাস, নল, জলাময় ভক্ষণ করে।
তাদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ঘাসবীজ, আগাছা, শস্য দানা, কচি ফল ও পোকা মাকড়। এ পাখিটি নদীর কিনারের ঝোপে ও শ্যস্য ক্ষেতে জোড়ায় জোড়ায় বা দল বেধে বিচরণ করে। মেটে তিতির সাধারণত শুকনো তৃণ ভুমি ক্ষুদ্র জোপ, কৃষিখামার এবং বালিরাড়িতে জোড়ায জোড়ায় ও পারিবারিকভাবে বিচরণ করে থাকে।
তবে দুর অতীতে ঢাকা বিভাগে তৃণ ভুমিতে এ পাখি দেখা যেত। কালা তিতির কালচে বাদামি ভুচর পাখি। এর দৈর্ঘ্য ৩৪ সেমি, ওজন প্রায় সাতশত থেকে ৮৩০ গ্রাম। মাদা ও মাদির চেহারা ভিন্ন ধরনের। মাদা পাখির পিঠে ঘন কালো পাখনা, মাঝে মাঝে সাদাটে ফোটা যুক্ত পাখনা রয়েছে। পাখির মুখটা কালো এবং গলাটা সাদা। দেহের নীচের অংশ ঘোর কালো রংয়ের হয়ে থাকে।
মাদি পাখির পিঠে ফিরে বাদামী। ঘাড়ের নীচে লালচে। কানের ঢাকনি হালকা পিত রংয়ের। কালচে চোখের রেখা। কাঁধ ঢাকনিতে ও পিঠে হালকা পীত বর্ণের লম্বা ছিটা রয়েছে। দেহের নীচের অংশে সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ। যা দেখতে সুন্দর লাগে এবং সবার দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে তুলে।
অনুসন্ধান করে জানা যায় যে, পৃথিবীতে যতগুলো বস্তু বা প্রাণী রয়েছে, প্রত্যেকটি বস্তু বা প্রাণীর  কোনো না কোনো নাম রয়েছে। বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন নাম থাকে। সে হিসাবে শেখ ফরিদ বা কালা তিতির পাখির একটি ইংরেজী নাম রয়েছে। তবে যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেনো, পাখিটি সবার কছে প্রিয় একটি পাখি।
 
এ পাখিটি সব সময় সব খানে বিচরণ করে না। সে কারণে সব সময় তাকে দেখা যায় না। দেখার সময় হলো প্রতিদিন সকাল এবং সন্ধ্যা বেলা। ভোরের আলো প্রস্ফুটিত হলে পাখিটি খোলা জায়গায় বিচরণ করে খাদ্য ভক্ষণ করে। আবার সন্ধ্যা বেলা যখন মানুষের বিচরণ কমে আসে, ঠিক তখনেই পাখিটি খোলা জায়গায় বিচরণ শুরু করে। তবে এ দৃশ্যটি সবার চোখে পড়ে না।
সাধারণ মানুষের চোখে প্রতি সপ্তাহে একদিন অথবা দুইদিন চোখে পড়ে। এ পাখিটি মানুষকে দেখে বেশি বেশি ভয় পান। যখনই মানুষের চলা চল বা বিচরণের শব্দ শুনতে পান, তখনই পাখিটি পালিয়ে ঝোপের আড়ালে চলে যায়। কালা তিতির পাখিটি উঁচু ঘাস, কৃষি খামার, চা বাগানে একাকি ও জোড়ায় জোড়ায় চলা চল করে।
খোলা মাঠ, ঝোপ ও ঘাসের ভিতর খাবার খোঁজে। ঊশা ও গোধূলী বেলায় তার কর্মচঞ্চলা দেখা যায়। ঘন ঘাসের গোড়ায়, গম ক্ষেতে, মাটির বুকে হালকা ঘাস, পাতা দিয়ে বাস করে ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা পাঁচ-নয় টি। মাদি পাখিটি একাই ১৮-১৯ দিন ডিমে তা দেয়। তারপর ডিম থেকে বাচ্চা বের হয়।
শেখ ফরিদ বা কালা তিতির পাখিটি আর কতদিন আমাদের মাঝে থাকবে, তা নির্ভর করছে মানুষের উপর। কেনোনা, পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ তৈরি হলেই পাখিটি বসবাসের পরিবেশ খুঁজে পাবে। পঞ্চগড় জেলার তেতঁলিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামে বিরল প্রজাতি শেখ ফরিদ বা কালা তিতির নামক পাখিটির বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এই পাখিটি সীমান্তবর্তী দর্জি পাড়া ও কাজীপাড়া গ্রামে বসবাস করছে। বর্তমানে পরিবেশ বান্ধব পরিবেশের অভাবে এই পাখিটি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করে পাখিটির সংরক্ষণ করার প্রয়োজন।
পঞ্চগড়ে পরিবেশ প্রকৃতি ও সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘কারিগর’ শেখ ফরিদ বা কালা তিতির নামক পাখিকে সংরক্ষণ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তেতুলিয়া উপজেলার চত্তর থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যা লি বের করে উপজেলার গুরুত্বপুর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কাজি পাড়া গ্রামে এসে শেষ করা হয়।
র‌্যালী শেষে দুই মিনিট নিরবে পাখির প্রাণ, প্রকৃতি ও পাখিটিকে সংরক্ষণের জন্য প্রার্থনা করা হয়। ‘কারিগর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সরকার হায়দারের পরিচালনায় কবিতা আবৃতি, পাখি বিষয়ক গান পরিবেশন করা হয়। তাছাড়া ইরানের বিখ্যাত কবি ফরিদ উদ্দিনের কবিতা অবলম্বনে ‘পাখিদের বৈঠক’ নামক একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন সাংবাদিক সরকার হায়দার।
পাখি গবেষক, দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, শেখ ফরিদ বা কালা তিতির নামক পাখিকে সংরক্ষণের করার জন্য পরিবেশ বান্ধব পরিবেশের প্রয়োজন। যদি সরকার ও স্থানীয় অধিবাসিরা পাখিটির বসবাসের জন্য পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, তাহলে পাখিটির প্রজন্ম রক্ষা পাবেন। পাখিটি অনাগত সময় নিয়ে বাচার পরিবেশে রক্ষা পাবে।
আমরা চাই না, মায়াবী এ পাখিটি আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাক। বরং আমরা চাই, মায়াবী পাখিটি আমাদের পরিবেশ বান্ধব পরিবেশে বেঁচে থাকুক।

পরিবেশ এর আরো খবর