শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯
logo
সেন্সর বোর্ডের আপত্তিতে আটকে গেল ‘ডুব’
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১০:৫০:২০
প্রিন্টঅ-অ+
বিনোদন ওয়েব
ঢাকা: ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আহমেদের জীবনী নিয়ে নির্মিত ‘ডুব’ সিনেমাটি আটকে দিল ঢাকার সেন্সর বোর্ড। ছবিটির পরিচালক  মোস্তফা সরয়ার ফারুকী শনিবার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। আগে বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলেও তা অস্বীকার করেছিলেন তিনি।

সেন্সরে জমা পড়ার পর ‘ডুব’ ছবিতে হুমায়ূন আহমেদের জীবনকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি ও তার পরিবারকে হেয় করার অভিযোগ করে সেন্সর বোর্ডকে চিঠি দিয়েছিলেন অভিনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন। এর পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আটকে গেল ‘ডুব’।

সেন্সর বোর্ড ছবিটি আটকে দেয়ায় বিতর্কের মোড় ঘুরে গিযেছে। আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, এতে ইরফান খান অভিনয় করছেন হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে। এ ছাড়াও মেহের আফরোজ শাওনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্ণো মিত্র, গুলতেকিন খান চরিত্রে রোকেয়া প্রাচী এবং শীলা আহমেদের চরিত্রে তিশা। ছবিটি প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া ও এসকে মুভিজ। সহ-প্রযোজক হিসেবে আছেন ইরফান খান।

এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ছবির পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘আপাতত যা শুনেছেন, ঘটনা সত্য। তবে রোববার থেকেই আমরা আইনি লড়াইয়ে যাব। যা করা হয়েছে এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।’

বিস্তারিত জানতে চাইলে ফারুকী বলেন, ‘আমরা মার্চে নিয়ম মেনে যৌথ প্রযোজনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে স্ক্রিপ্ট জমা দিই। রিডার্স প্যানেল তা পরে মার্চের ১২ তারিখ অনুমতিপত্র দেয়। তার ভিত্তিতে আমরা ছবির শুট করি। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ নিয়ম অনুযায়ী যৌথ প্রযোজনার প্রিভিউ কমিটি ছবিটি দেখে। ১৫ তারিখ তারা অনাপত্তি পত্র দেয়। এর একদিন পরই একই কমিটি আমাদের চিঠি দিয়ে জানায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশক্রমে ইস্যু করা অনাপত্তিপত্র স্থগিত করা হল। আশ্চর্যের বিষয়, সেখানে কোনো কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা হল না।’

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিচালক বলেন, ‘কার্যত আমাদের ছবিটি এখন আটকে গেল। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, এই সাসপেনশন সাময়িক। এটা বেআইনি কাজ হয়েছে। যে বা যারা সরকারের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর চেষ্টা করেছেন, তারা কেবল সরকারকে বিব্রতই করছেন।’

এ বিষয়ে বিএফডিসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন কুমার ঘোষ বলেন, ‘এটা বিএফডিসির বিষয় নয়। বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড বিষয়টি তত্ত্বাবধান করে।’ বলিউড তারকা ও সিনেমার সহ-প্রযোজক ইরফান খান বলেন, ‘সিনেমাটি আটকে দেয়ার ঘটনায় আমি খুবই বিস্মিত। মানবিক গল্পের সিনেমায় একজন পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও টানাপোড়েনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। এটি কীভাবে সমাজের ক্ষতি করতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়।’

‘ডুব’ নিয়ে চিঠি প্রসঙ্গে শাওন বললেন, ‘আমি কিন্তু আপত্তি করিনি। আশঙ্কা জানিয়েছি। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ছবির পাত্র-পাত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায় গল্পটি কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের জীবনের। আমার আশঙ্কা এখানেই।

শাওন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হুমায়ূন আহমেদ পাশের বাড়ির বউদি নন যে তার জীবনের সঙ্গে কাকতালীয়ভাবে গল্প মিলে যাবে। আমি কোনোভাবেই চাইব না বাংলাদেশের জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তি লেখকের জীবনের স্পর্শকাতর অংশকে বাণিজ্যিক কারণে কেউ ভুলভাবে তুলে ধরুক।’

নিজের অবস্থান তুলে ধরে শাওন বলেন, ‘নির্মাতা ফারুকী এবং ব্যক্তি ফারুকীর সঙ্গে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। কোনো অভিযোগও নেই। আমি শুধু চাই আমার স্বামী এবং তার জীবনের কোনো স্পর্শকাতর ঘটনা বা রিউমার যেন সিনেমার মতো শক্তিশালী মাধ্যমে ভুলভাবে উঠে না আসে। হুমায়ূন আহমেদ ও তার পরিবার নিয়ে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করলে সেটা মেনে নেয়া হবে না। কেবল আমি কেন, সমাজের কেউই মেনে নেবে না। সেই আশঙ্কা থেকেই সেন্সর বোর্ডের কাছে বিষয়টি জানিয়েছি।’

‘ডুব’ নিয়ে আঁতুড়ঘর থেকেই তর্ক -বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এ কারণে সাধারণের মনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে ব্যাপক। ‘ডুব’ (ইংরেজি নাম, নো বেড অব রোজেস)। তবে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ছবিটি অচিরেই আলোর মুখ দেখবে। প্রিভিউ কমিটি ছবিটি দেখে স্থগিতাদেশ দেয়ায় কৌতূহল আরো বেড়েছে। সবার একটাই প্রশ্ন, কী আছে এই ‘ডুব’ ছবিতে?  ছবি বানানোর ঘোষণার পর থেকেই ‘ডুব’ বিদেশি গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিদেশি মিডিয়ার আগ্রহ হয়তো এই কারণেই যে তাতে বলিউডের তারকা ইরফান খান রয়েছেন প্রধান ভূমিকায়।

দেশের মিডিয়াগুলিকে একটু এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা শুরু থেকেই ছিল। তাতে ‘ডুব’ নিয়ে বিদেশি মিডিয়ার ওপরই ভরসা করতে হয়েছে বার বার। খবরগুলি এসেছেও একাধিক বিদেশি সংবাদমাধ্যমের বরাতে।

সবশেষ যে স্থগিতাদেশ, তার খবরও কিন্তু প্রথম প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পত্রিকা ‘ভ্যারাইটি’। ঢাকায় জমকালো মহরত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ পান বাংলাদেশের সিনে মিডিয়ার সাংবাদিকরা। কিন্তু ‘ডুব’-এর শুটিংস্পটে যাওয়া তাদের ভাগ্যে জোটেনি।

খবরে বলা হলো- প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের জীবনের ছায়া অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘ডুব’। ছবিটির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দেশের মিডিয়াগুলিকে বলেন, এটি তার সম্পূর্ণ মৌলিক গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্র, কোনো জীবনীগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়নি। এদিকে ছবিটির এক শিল্পী গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছবিটিতে হুমায়ুন আহমেদের জীবনের কিছু অংশ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী ও অভিনেত্রী ডা. মেহের আফরোজ শাওন। একাধিক মিডিয়াতে তিনে এ নিয়ে কথা বলেন, ফেসবুকে প্রতিবাদী স্ট্যাটাস দেন। আর সবশেষ তিনি সেন্সরবোর্ডকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। ধারণা করা হচ্ছে, শাওনের ওই চিঠির কারণেই আটকে দেয়া হয়েছে ‘ডুব’ এর যাত্রা।

বিষয়টিতে বিচলিত ও বিব্রত হয়েছেন এর নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, ছবিটি কোনোভাবেই প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের জীবনের গল্প নিয়ে নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ডুব’ ছবির মুক্তির পরই বলা সম্ভব হবে যে, এটি হুমায়ুন আহমেদের জীবন থেকে নেয়া হয়েছে কি-না। এর বিচার দর্শকের ওপর ছেড়ে দিতে প্রস্তুত এই নির্মাতা। কিন্তু গুঞ্জন তো থেমে থাকে না। প্রিভিউ কমিটির সদস্যের বরাত দিয়ে চলচ্চিত্র পাড়ায় বলাবলি হচ্ছে যে, ‘ডুব’ ছবিতে ‘কৌশলী’ উপায়ে হুমায়ুন আহমেদের জীবনের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। কারোরই বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, চরিত্রগুলো দেশের একজন বড় লেখক ও তার পরিবারের, যে পরিবারের সদস্যরা পাঠকদের কাছে বেশ চেনা ও জনপ্রিয়।

ফারুকী বলেন, মেয়ের বান্ধবীর সঙ্গে প্রেম এই ছবিটির উপজীব্য কিন্তু এমন ঘটনা সমাজে- দেশে-পৃথিবীতে অনেকই ঘটে। গল্পের গড়ন ও আঙ্গিক সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই এই গল্পকে কেউ ব্যক্তিগতভাবে নেয়া ঠিক হবে না। একটি চলচ্চিত্র কিংবা যে কোনো শিল্পকর্মে সাধারণের জীবনের ছাপ থাকে। ফলে তা অনেকের জীবনের গল্পের সঙ্গেই মিলে যায়। সেটাই গল্পকারের কিংবা চলচ্চিত্রকারের সাফল্য। সেন্সর বোর্ড এমন একটি গল্পকে ঠুনকো যুক্তিতে আটকে দিতে পারেনা, বলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

এর আগেও ফারুকী এই প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছিলেন, সাধারণত তার ছবিতে ভালো বা মন্দ চরিত্র বলে কিছু থাকে না। তার চরিত্রগুলি পরিস্থিতির শিকার। এখনই যে মানুষটিকে খারাপ মনে হবে, একটু পরের দৃশ্যেই দর্শক তাকে ভালো বলবেন। ‘ডুব’-এর বেলায়ও তেমনটিই ঘটেছে।

বিনোদন এর আরো খবর