শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
নজরুল যার কাছে ঋণী...
প্রকাশ : ২৮ জুলাই, ২০১৬ ১২:৩৪:২২
প্রিন্টঅ-অ+
বিনোদন ওয়েব

ঢাকা: সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি নজরুল সঙ্গীতের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনি বাংলা সঙ্গীতের প্রতীকিরূপ। নজরুলের গান গেয়ে সম্রাজ্ঞী উপাধীও পেয়েছেন। বলছি কিংবদন্তি ফিরোজা বেগমের কথা। মাত্র দু’বছর আগে না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এ শিল্পী আজকের এ দিনেই পৃথিবীতে এসেছিলেন। আজ তার ৮৬তম জন্মদিনে একটু পেছন ফিরে দেখা-কী করে তিনি নজরুলসঙ্গীত শিল্পী হলেন।
 
ততদিনে তিনি সংগীতে বিখ্যাত। দু-দুইবার আধুনিক গানের ক্ষেত্রে মাসের সেরা শিল্পী হয়েছিলেন। একবার তার গলায় রবীন্দ্রসংগীত শুনে তাকে গান শেখানোর জন্য পঙ্কজ মল্লিকের মতো শিল্পী ফিরোজা বেগমের কলকাতার বাড়িতে চলে আসছেন। গুণী শিল্পীরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অন্যদিকে তিনি আব্বাসউদ্দিন এবং পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কাছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর জন্য মাঝে মাঝে লোকগীতির তালিম নিতেন। রেডিওতে পাশাপাশি স্টুডিওতে গান গাইতেন তিনি এবং ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ। ‘আয় না বালম’-এর মতো বিখ্যাত সেই গান রেকর্ড হচ্ছে। দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছে, বিনিময় হচ্ছে শুভেচ্ছা। নানা গানের ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে নেয়ার এক তীব্র ইচ্ছা কাজ করত তার মধ্যে। আর তা অন্য কোন গান নয়- নজরুলগীতি। এটা ছিল তার কাছে এক চ্যালেঞ্জের মতো। তখন নজরুল সংগীত বলা হতো না, বলা হতো আধুনিক গান লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরে সেটা থেকে নজরুলগীতি হয়। আর ফিরোজা বেগমের চেষ্টাতেই তা পায় নজরুলগীতির অভিধা।
তিনিই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে নজরুলের গানের অনুষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক করেন। নজরুলগীতিকে জনপ্রিয় করার জন্যই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন অন্য গান নয়, নজরুলের গানই গাইবেন। গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তারা অবাক। ফিরোজার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বুঝে উঠতে পারছেন না তারা। তাদের কথা হলো, ‘এত ভালো গলা তোমার! এভাবে নিজের ক্যারিয়ার কেউ নষ্ট করে? তাছাড়া এখন তো আর লোকে সেভাবে নজরুল সংগীত শোনে না। ভেবে দেখ কী করবে!’ কিন্তু ফিরোজা বেগম অবিচল। গাইলে নজরুলগীতি। সেটাই হবে তার ধ্যান ও জ্ঞান। অগত্যা হতাশ হতে হচ্ছে সবাইকে। নজরুলের গান নিয়ে প্রকাশিত প্রথম রেকর্ডের কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘১৯৪৯ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি আমার গলায় নজরুলের গান রেকর্ড করতে রাজি হয়। তখন আমি গগন গহনে সন্ধ্যাতারা... গেয়েছিলাম। পুজোর রেকর্ডের ক্ষেত্রেও আমি একই সিদ্ধান্তে অবিচল থেকেছি । এজন্য আমাকে বারবার ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জয় আমারই হয়েছে। কোম্পানি পুজোয় আমার গাওয়া নজরুল সংগীতের রেকর্ড বাজারে ছাড়তে রাজি হয়েছিল।’
১৯৬০ সালের পুজোয় সেই রেকর্ড বেরোয়। তবে দুর্গাপুজোর আগে নয় পরে। সেই রেকর্ডে ফিরোজা গাইলেন সর্বকালের জনপ্রিয় দুটি গান ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ আর ‘মোমের পুতুল’। ফিরোজার জনপ্রিয়তাকে আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। ১৯৬১ সালে তার গাওয়া নজরুলসংগীত নিয়ে লংপে রেকর্ড বেরোয়। সেখানে ‘মোর ঘুম ঘোরে’ আর ‘নিরজনে সখী’ গান দুটো গেয়েছিলেন। এটাই ছিল নজরুলের গানের প্রথম লংপে। একইভাবে ১৯৭৬-৮৬তে পাকিস্তানেও প্রথম নজরুলের গানের লংপে ছিল তার। ঐ রেকর্ডে ছিল ‘ওরে শুভ্রবাসনা রজনীগন্ধা’ গানটি। এটি সেই সময়ে খুব সুপারহিট হয়েছিল। এমনকি নজরুলের গজলের প্রথম লংপেও ছিল তার। ১৯৬৮ সালে আমার গাওয়া ‘শাওন রাতে যদি’র রেকর্ড এক সপ্তাহের মধ্যে দু’লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়। এজন্য জাপানের সনি কর্পোরেশনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সিবিএস আমাদের গোল্ড ডিক্স দিয়ে সম্মানিত করেছিল তাকে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ টানা ১৩ বছর ছিলেন কলকাতায়। এই সময়টাকে তিনি নির্বাসন হিসেবেই দেখেন। ঐ সময়েই ১৯৫৬ সালে বিরলপ্রজ সুরকার কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। কিন্তু নিজের সত্যকেই তিনি সব সময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কলকাতেই জন্মেছে তার তিন সন্তান- তাহসীন, হামিন ও শাফিন। ঐ সময়ে স্বর্ণযুগ স্বর্ণকণ্ঠী ফিরোজার। অথচ টানা পাঁচ বছর স্বামী-সন্তান-সংসার সামলাতে গিয়ে গান গাইতে পারেননি তিনি। এগিয়ে চলা সময়ের সঙ্গে তাদের দুর্ভাগ্যও এগিয়ে এসেছিল। অসুস্থ হয়ে পড়লেন কমলবাবু। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই পিজি হাসপাতালে মৃত্যু হয় কমল দাশগুপ্তের। মাত্র ১৮ বছরের সুরময় দাম্পত্যের ইতি ঘটে। এর আগে বাচ্চাদের কথা, স্বামীর চিকিৎসার কথা ভেবে ১৯৬৭ তে তিনি দেশে ফিরলেন। আসতে না আসতেই পড়েছিলেন দুর্বিপাকে। তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডি থেকে এসেছিল টেলিগ্রাম। বিভিন্ন সময়ে নানা সংকটে জরর্জরিত ছিলো তার জীবন।
সম্মানও কম পাননি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-স্বাধীনতা পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, শ্রেষ্ঠ টিভি শিল্পী পুরস্কার (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, স্যার সলিমুল্লাহ স্বর্ণপদক, দীননাথ সেন স্বর্ণপদক, সত্যজিৎ রায় স্বর্ণপদক, বাচসাস পুরস্কার, সিকোয়েন্স পুরস্কার। মৃত্যুর পর তার স্মরণে প্রবর্তিত হয়েছে ‘ফিরোজ বেগম স্বর্ণপদক’। নজরুলসংগীত সম্রাজ্ঞী ফিরোজা বেগমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার নামে সংগীত পদক প্রবর্তন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আসছে ২৮ জুলাই ফিরোজা বেগমের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে ‘ফিরোজা বেগম স্মৃতি স্বর্ণপদক’ পাচ্ছেন সাবিন ইয়াসমিন।
বিকাল ৪ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদক-২০১৬’ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন থেকে। প্রথমবারের মত পুরস্কার বিজয়ী সংগীত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগে প্রথম স্থান অধিকারী পার্থ প্রতিম মিত্র’র হাতে ফিরোজ বেগম স্বর্ণপদক-২০১৬ তুলে দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদক ট্রাস্ট ফান্ডের দাতা এসিআই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এম. আনিস-উদ-দৌলা। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত থাকবেন ঢাবি’র কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. বেগম আকতার কামাল, সংগীত বিভাগের চেয়ারপার্সন ড. লীনা তাপসী খান ও নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাসহ শিল্পী ফিরোজা বেগমের পরিবারের সদস্যবৃন্দ।
 
এছাড়াও নানা অনুষ্ঠান আয়োজন থাকবে চ্যানেল আই’র পর্দায়। সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে ৯ টা পর্যন্ত ফিরোজা বেগম স্মরণে ‘সকালের গান’ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবশেন করবেন তাঁর ভাই আনিস-উদ-দৌলা’র মেয়ে শিল্পী সুস্মিতা আনিস। ফিরোজা বেগমকে নিয়ে স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তিনি গাইবেন শিল্পীর জনপ্রিয় সব গানগুলি। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ‘তারকা কথন’ অনুষ্ঠানের পুরোটা জুড়েই থাকবে ফিরোজা বেগমকে নিয়ে কথোপকথন। অংশ নেবেন ফিরোজা বেগমের দুই সন্তান জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদ এবং হামিন আহমেদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক।

বিনোদন এর আরো খবর