মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২০
logo
লালন, করিম আমাদের কাছে ঈশ্বর: দীপান্বিতা আচার্য
প্রকাশ : ০৯ জুলাই, ২০১৬ ১৭:২৪:০৯
প্রিন্টঅ-অ+
বিনোদন ওয়েব

চাঁদপুর: ভারতীয় উপমহাদেশে অন্যতম জনপ্রিয় লোকশিল্পী দীপান্বিতা আচার্য । পূ্র্বপুরুষের ভিটা বাংলাদেশের চট্টগ্রামে হলেও তিনি বাস করেন ভারতে। কিন্তু তাই বলে ভুলে যাননি মা মাটি আর মানুষের ভাষা। লালন, হাসন এবং শাহ আব্দুল করিমের মত বাংলার এই বিখ্যাত মানুষদের জীবন দর্শন পৌঁছে দিচ্ছেন লোক গানের মধ্য দিয়ে। শুধু ভারত নয়, বিশ্বব্যাপী বাংলার লোক গানকে অসাধারণ ব্যঞ্জনায় পরিবেশন করে যাচ্ছেন একজন অকৃত্রিম বাংলাভাষার শিল্পী হিসেবে। ঈদের বিশেষ আয়োজনে ভারত থেকেই কথা বললেন আমাদের সঙ্গে। কথায় কথায় জানা গেল হাসন, লালন আর আব্দুল করিমের প্রতি তার ভালোবাসার কথা, বাংলা লোক গান নিয়ে তার পথচলা, আশা প্রত্যাশার কথা...
     
আপনি চট্টগ্রামের সন্তান। বাংলাদেশের লোকগান নিয়ে টানটা কি এ জন্যই একটু বেশি?
সেটা একশো ভাগ। আমি চাঁটগাইয়্যা। আমার বাবা কখনোই এই ভাষা থেকে বঞ্চিত কিংবা বিচ্ছিন্ন করেননি আমাকে। সারাক্ষণ তার নিজের ভাষাতেই কথা বলেন তিনি। লোকগান গাইতে গিয়ে তাই আমাদের গ্রামীন সাজতে হয়নি। এটা আমার পাওনা। অনেক মাইজভান্ডারি গান বা আঞ্চলিক গান জানতে চাই আমি।  
সম্প্রতি ফকির ফেস্টিভাল ও মনসুর হাল্লাযের গানের সাথে দূরবীন শাহ’র গানের ফিউশন নিয়ে পেছনের গল্পটা শুনতে চাই
ইরানিয়ান সুফি সাধক মনসুর আল হাল্লাজ এবং আমার বাংলার আরেক সুফি সাধক দূরবীন শাহ-এর গান মিলে মিশে গেছে। আমরা একদম ভাবিনি এভাবে তারা দুজন এসে ধরা দিবেন। নিশিথ মেহতা সম্প্রতি আমাকে নিয়ে যান আহমেদাবাদে। তারসাথে বিমানবন্দর থেকে একদম রিহার্সেল রুমে যাই। সেখানে ভিনদেশি শিল্পী মরিয়ম বসেছিলেন, হাতে তার যন্ত্র ধরা। তিনি গান শুরু করলেন, হঠাৎ তার গানে মগ্ন হতে হতে কখন যেনো আমিও গেয়ে উঠলাম ‘নামাজ আমার হইলো না আদায়’।
আমি জানতাম না মরিয়ম-এর গাওয়া গানের অর্থ, তবুও এসময় দূরবীন শাহের গান আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। পরে মরিয়ম যখন আমাকে তার গাওয়া গান সম্পর্কে বিস্তারিত বুঝিয়ে বললো গানের অর্থ তখন আমিও দেখলাম মনসুর হাল্লাজের গানের অর্থকে দূরবীন শাহ’র গানের অর্থও কমপ্লিমেন্ট করছে। আসলেই আমি আগেই বলেছি যে, সঙ্গীত কেউ জোর করে না। সঙ্গীত ধরা দেয়। আমরা তাদের নাম রাখি ফিউশন মিউজিক, পিওর মিউজিক এমন আরো কতো কি….!
আপনার বেড়ে উঠার পরিবেশটায় আসলে আপনাকে লোক গানের প্রতি আগ্রহ যুগিয়েছে, বা এরজন্যই আপনি আজকে ফোকশিল্পী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নিভৃতে যখন ভাবেন তখন কি আপনার কখনো মনে হয় যে, লোকগান গাইতে আসাটা ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?
নিঃসন্দেহে ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এটাকে সিদ্ধান্ত বলতে রাজি নই আমি। বলা ভালো এটা এমনিতেই হয়ে গেছে। আমিতো লোক গানের শিল্পী হবো বলে আগে থেকেই ঠিক করে রাখিনি যে এর প্রেমে পড়বো। তবে বাড়িতে আমরা মনসা মঙ্গলের পূজায় ধুয়া ধরতাম, আর সেই থেকে শুরু।
গান না গাইলে পেশা হিসেবে অন্য কী হতে পারতো আপনার?
না। গান ছাড়া অন্যকিছু করতে পারতাম কিনা জানি না, তবে গান যদি না গাইতাম তাহলে হয়তো নৃত্যশিল্পী হতে চাইতাম। কিংবা মিউজিকের কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাতাম না।   
হাসন, লালন, শাহ আব্দুল করিমকে নিয়ে কাজের অনুপ্রেরণাটা কিভাবে পেলেন…?
তারা আমাদের কাছে ঈশ্বর। তাদের কাজ আমাদের প্রার্থনা সমান। তাই অনুপ্রেরণা কিভাবে পেলাম এটা বলতে গেলে বলতে হয় যে এটা তাদের আশির্বাদ। তাদের এমনই সৃষ্টি, এমনই সেই সব গানের আকর্ষণ কেউ সেই আকর্ষণ এড়াতে পারবেন না।  
বাংলা লোক গান নিয়ে আপনাকে ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষি রাজ্যে বিরাট সব কনসার্টেও গাইতে শোনা যায়, অন্যভাষাভাষিদের রেসপন্স কেমন পান?
খুব ভালো রেসপন্স পাই। খুব আশির্বাদ করেন সকলে। আমি খুব আনন্দিত হই এবং গর্ব অনুভব করি যখন একজন অবাঙালির কাছে লালন সাঁইজির গান, শাহ আব্দুল করিম, ইদাম শাহ-এর গান তুলে ধরি। তারা গানটার প্রতিটা শব্দ না বুঝলেও আমি গান এর অন্ত:নিহিত অর্থের একটি কাঠামো তাদের সামনে তুলে ধরি। এবং গানটা শেষ হলে পরে তারা বলে আমরা পুরোটা না বুঝলেও গানের ঘোরে কোথাও যেন হারিয়ে গেলাম! এটুকুই আসলে আমার পাওনা। এমনটা বহুবার ঘটেছে। এমনকি যারা ভারতের বাইরের মানুষ যেমন চাইনিজরাও লালন, করিমের গানে ঘোরগ্রস্ত হয়েছেন আর সেখানেই আমার মনে হয় বাংলার এই গ্রাম্য কবিদের সফলতা। তারা যে কিভাবে তাদের গানের সুর এবং কথার খোঁচায় মানুষকে ঘায়েল করতে পারেন। আর এইজন্যই তারা আমদের কাছে তিনি ঈশ্বর। সমস্ত লোক কবিদের আমার শ্রদ্ধাপূর্বক প্রণাম জানাই।   
লোকগান। একেবারে ন্যাচারাল। এখানে আরোপিত কোনো ব্যাপার থাকে না আসলে। কিন্তু এই সময়ে লোকগানের যে ফিউশন অনেকে করছেন, অনেকে তা মেনে নিতে পারছেন না। আপনার কাছে কি তা আরোপিত মনে হয়?
মিউজিকে আরোপিত ব্যাপারটায় চলে না। যে যে ধরনের মিউজিকই গান করুন না কেন তা প্রাণ থেকেই আসে। আর সেটা সবার ভালো লাগবে এমনটা ঠিক নয়। অনেকের ভালো লাগবে আবার অনেকের লাগবে না। এই বিতর্ক থাকবেই, তা বলে প্রাণ থেকে যে সঙ্গীত চর্চা করেন তার সঙ্গীত সাধনা এইসব বিতর্কে বন্ধ হবে না। ফিউশন যারা করছেন তারাও সেটা অন্তত ভালোবেসে মন প্রাণ ঢেলে দিয়েই  করছেন। তাদের এই নব সৃষ্টি নিয়ে বিতর্ক চলুক। সঙ্গীত তার নিজস্ব ধারায় আপন গতিতে বয়ে চলুক। এর ভালো মন্দের বিচারক হয়ে উঠুক কাল। এক সময় শুধু রাগ সঙ্গীত কেবল ধ্রুপদ দমে গাওয়া হতো, পরবর্তীকালে তা বিলম্বিত খেয়ালে পরিণত হয়। এবং আজকের দিনে আমরা দ্রুত খেয়াল শুনতে বেশি পছন্দ করি। সঙ্গীতের এই নিজস্ব ধারা মেনে নিতে হবে।
আপনিতো রাজস্থানি কামরুপিসহ অনেক লোকগান গেয়ে থাকেন। এরমধ্যে বাংলা লোকগানের মূল শক্তিটা আসলে কোথায়?
এভাবে আলাদা করি ভাবিনি কখনো। আসলে লোক গান নিজেই অত্যন্ত শক্তিশালি এক রূপ। এর আকর্ষণ এড়ানোর শক্তি আমাদের নেই। না ভালোবাসে কেউ পালাতে পারে না। সেটা যে ভাষাতেই হোক না কেন। তবে হ্যাঁ, যেহেতু আমি মা বলে ডাকি বাংলা ভাষায় তাই বাংলা গান অনেক বেশি মনের কাছের। বাংলা লোক গানে প্রেম বিরহ বা যে কোনো তত্ত্বের গান এর আবেদন বড়ই অন্তরের কাছের। সব কিছু নাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলা লোক গান নিয়ে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির জায়গাটা যদি বলেন...
প্রত্যাশা বা প্রাপ্তি নিযে একদম ভাবি না। তবে আরো আরো বেশি করে ভালোবাসতে চাই।
শাহ আব্দুল করিমের উপর আপনার মুগ্ধতার কথা অনেক শুনেছি। তার উপর আপনার কাজও আছে। তার প্রতি এই মুগ্ধতা বা এই আগ্রহটা প্রথম কিভাবে তৈরি হল?
আমার গুরু শ্রদ্ধেয় অভিজিৎ বোসের কাছে ‘কেনো পিরিতি বানাইলারে বন্ধু’ গানটা শুনি। গুনগুন করতে থাকি। কখন যেনো গানটা আমার হয়ে যায়। নিজের অজান্তেই কিভাবে গানটা আমার মনে প্রাণে মিশে গেছে তা টেরই পায়নি। শুধু ভাবি একজন গ্রামের মানুষ কতো দারিদ্র‌্যতার শিকার, অথচ সঙ্গীত তাঁকে ছেড়ে যায়নি। শক্তি পাই এটুকু ভেবেই। তাঁর চরণে আমার প্রণাম।
ক’দিন আগে ‘মায়ামৃদঙ্গ’ নামের একটি সিনেমাতেও আপনি গেয়েছেন, ছবিটি নাকি গ্রাম বাংলার লোকশিল্পীদের নিয়ে?
হ্যাঁ। সৈয়দ মুজতবা সিরাজের লেখা ‘মায়া মৃদঙ্গ’ বই থেকে ছবিটি করছেন রাজা সেন। তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারজয়ী নির্মাতা। তার বিখ্যাত সিনেমা ‘দামু’। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের বিশেষ ধরনের লোকধারা ‘আলকাপ’-এর শিল্পীদের নিয়ে লেখা ‘মায়া মৃদঙ্গ’ ছবিটি তিনি করেছেন। ছবিতে আমি ‘চৈতি রাতের শেষে’ শিরোনামের একটা গান গেয়েছি। গানটা এরইমধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এটিও একটি আলকাপ গান।
সিনেমায় মূলত লোকশিল্পীদের এড়িয়ে যেতেই দেখি। বাংলা সিনেমাতে লোকশিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রটা কি বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন?
এই ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে। আমরা যেহেতু মেইনস্ট্রিম-এর শিল্পী নই তাই আমরা ব্রাত্য। সিনেমা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় মাধ্যম তাই লোকশিল্পীরা এই মাধ্যমে কাজ করলে লোকগান অনেক পরিচিত হবে।
বাংলাদেশে প্রথমবার হয়ে গেল ‘ফোক ফেস্টিভাল’। বাংলায় ফোক গানের চর্চাকে এগিয়ে নিতে এমন ফেস্টিভালকে কিভাবে দেখছেন?
এমন আয়োজনকে সাধুবাদ জানাই। প্রাণ থেকে বলছি এমন ফেস্টিভাল অনেক অনেক চাই। অন্তত লোক গানের চর্চায় এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।   
ফোকের জন্য বাংলাদেশে অর্ক, পাপনেরা মোটামুটি বেশ জনপ্রিয়, তাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে বলুন...?
অর্ক আমার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও বেশ ভালো বন্ধু আমরা দুজন। ইনফ্যাক্ট অর্কের হাত ধরেই শহুরে শিল্পীদের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। প্রথমে অর্কের একটি ফেস্টিভালে গাইবার আমন্ত্রণ পাই এবং সেখান থেকেই বাকিদের সাথে পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে তাদের নিয়েই আমি আমার ফোক ফাউন্ডেমন গড়ে তুলি। অর্কের পরিচালনায় আমি টিভি শোতেও অংশ নিয়েছি। তার গানের বিশেষ ভক্ত আমি। হঠাৎ দেখা হলে কাছে এসে ‘দীপান্বিতা দি’ বলে ডেকে উঠে, এটা আমার খুব ভালো লাগে। আনন্দেরও।  
সঙ্গীত আসলে কী?
সঙ্গীত বহতা নদীর মতো এক প্রেম। এক সরল প্রেম। সেই প্রেম এসে ধরা দেয় সঠিক প্রেমিকের কাছে। তাই বলি ‘প্রেম রাখিও অন্তরের ভেতর…’। জয় গুরু।
আপনার বর্তমান ব্যস্ততা কি নিয়ে?
বর্তমানেতো অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত আমি। প্রথমত ফোক ফাউন্ডেশন-এর দ্বিতীয় অ্যালবাম নিয়ে পুরোদমে ব্যস্ত। এর কাজ চলছে। সাথে একটি দুর্দান্ত মিউজিক ভিডিও নির্মাণের পরিকল্পনা করছি। সিনেমাতেও গাওয়া ও মিউজিক দেয়ার কথা চলছে। ফোক ফাউন্ডেশন ছাড়াও ‘ব্যান্ডিশ’ ফিউশন-এর আমি একজন ভোকালিস্ট।সেখানেও অ্যালবাম করার কাজ চলছে। এবং বিদেশে ট্যুর নিয়েও ব্যস্ত আছি। আর সলো অ্যালবাম আপাতত না করলেও এই বছরের শেষের দিকে হয়তো গান রিলিজ দিতে পারি। আর এখন নতুন কিছু শেখা নিয়ে ব্যস্ত আছি। কি শিখছি সেটা আপাতত বলছি না।

বিনোদন এর আরো খবর