রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
logo
রংপুর মেডিকেলে র‌্যাগিং
৩ ছাত্রী আহত, হোস্টেলে ভাঙচুর
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১২:৩৯:৪৯
প্রিন্টঅ-অ+
শিক্ষা ওয়েব

রংপুর: রংপুর মেডিকেল কলেজের মহিলা হোস্টেলে নেত্রীদের র‌্যাগিংয়ের নামে ছাত্রীদের ওপর মানুসিক নির্যাতনের ঘটনায় মুমূর্ষ অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ওই ঘটনার প্রতিবাদে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় কক্ষ ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করাসহ অপর এক ছাত্রীর ওপর চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে এলাকায়। ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ক্ষুব্ধ হয়েছেন অভিভাবকরাও।
অপরদিকে আবারও নির্যাতনের আশঙ্কায় অনেক ছাত্রী হোস্টেল ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। তবে ওই ঘটনায় অভিযুক্তদের রুম সিলগালা করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভুক্তভোগী, পুলিশ এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাতে রংপুর মেডিকেল কলেজছাত্রী হোস্টেলের নেত্রী আশা, মুমুর নেতৃত্বে তন্বি ও প্রজ্ঞাসহ বেশ ক’জন ছাত্রলীগ নেত্রী কলেজেরর ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার মুমু ও পুনমকে রাত ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত র‌্যাগের নামে দাঁড় করিয়ে রাখে। এ সময় বিভিন্ন অশালীন ভাষাও প্রয়োগ করে মানসিক নির্যাতন চালানো হয় ওই ছাত্রীদের ওপর।
শুধু তাই নয়, মাঝে মাঝে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালায় আশা ও মুমুরা। এক পর্যায়ে র‌্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রীরা অজ্ঞান হয়ে গেলে অন্য শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান।
এদিকে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একই ব্যাচের শিক্ষার্থী আনিকা রাজ মঙ্গলবার তার ফেসবুকে লেখেন, “র‌্যাগ খাও, মাথা ঘুড়ানি দিয়ে পড়ো, ঠাসঠুস করো, অন্যকারো গায়ে গিয়ে পড়ো, তাদের এই প্যানিকে কেউ কেউ মরতে বস যখন, অটো ডাকো, এমার্জেন্সিতে ঢুকাও, এই যাও সেই যাও, কি করবে রাতে এতুগুলা মেয়ে, আপুরা বিদায় দিয়ে হাফছেড়ে বাঁচে। যাদের ভোগের তারা ভুগছে ভুগবে। সবাই পুনমের জন্য দোয়া করবেন।”
সূত্র বলছে, ওই স্ট্যাটাসে ক্ষুব্ধ হয়ে আশা ও মুমুর নেতৃত্বে হলের ছাত্রলীগ নেত্রীরা আনিকার রুমে গিয়ে তার বেড, চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করে। তার বেড শিট ও পোশাক পরিচ্ছদ কেচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করেন বিক্ষুব্ধ ওই দুই নেত্রী। বইপত্র খাতাসহ সব জিনিস ছিন্ন ভিন্ন করে দেন তারা।
ছাত্রীরা জানান, ঘটনার এক পর্যায়ে তারা হলে ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে আনেন ওই নেত্রীরা। মঙ্গলবার রাত ১২টায় ছাত্রলীগ নেতারা গিয়ে আনিকাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং আনিকাকে শারীরিকভাবে মারধোর করে বলেও অভিযোগ মিলেছে।
এতে আনিকার চোখ মুখ ও হাত মারাত্বকভাবে জখম হয়। হলের ওই দৃশ্য যখন মাত্রা বাড়ছিল তখন হলের শিক্ষার্থীরা পুলিশ ও হল প্রশাসনকে খবর দিয়ে তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা বাইরে চলে যান। পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে।
তবে তাদের হুমকিতে এরই মধ্যে অনেক ছাত্রী হোস্টেল ছেড়ে নগরীর বিভিন্ন আত্মীয় স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই বাড়ি চলে গেছেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কলেজের অধ্যক্ষ প্রাধ্যক্ষ এবং রংপুর ডিসিকে জানানো হয়। আনিকাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
জানা গেছে, ঘটনার শিকার আনিকার বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন বড় কর্মকর্তা। তার মামা সরকারের উপসচিব।
এদিকে বুধবার পাবনা থেকে ছুটে আসেন তার মা ফাতিমা বেগম।
ফাতিমা বেগম বুধবার সন্ধ্যায় কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আশা ও মুমুর নামে ওই ছাত্রলীগ নেত্রীরা প্রতিদিন হলের বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের র‌্যাগের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করছে। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে তাদেরকে ২০০ করে টাকা চাঁদা দিতে হয়। এসব ভালো লাগেনি। তাই আমার মেয়ে ফেসবুকে এসব নিয়ে কিছু কথা লিখেছে। ওর বান্ধবীর জন্য দোয়া চেয়েছে। এটা কোনো অপরাধের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু এ কারণে আশা আর মুমু এবং বাইরে থেকে এসে ছাত্রলীগ নেতারা যেভাবে আমার ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে মেরেছে। ওর চোখ, মুখ, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “ওরা মেয়ের রুম ভাঙচুর করেছে। কুচি কুচি করে বেড পোশাক কেটেছে। এটা কেমন নিয়ম। এই মেয়েরা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কাজ করলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তারা এখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”
আনিকার মা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আরও বলেন, “কলেজের অধ্যক্ষ, হলের প্রাধ্যক্ষকে আমি জানিয়েছি। তারা বুধবার এসে ওই মেয়ে দুটির রুম সিলগালা করে দিয়েছে। আমার মেয়ের রুমের ছবি তুলে নিয়ে গেছে। তারা বলেছেন, ওদের বহিষ্কার করা হবে। আমি তাদের বলেছি, আপনারা যদি অ্যাকশন নিতে না পারেন, তা হলে আমাদের বলেন। আমরাই অ্যাকশন নিবো। কিন্তু কোনো জবাব পাইনি।”
তিনি বলেন, “যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে আমি বৃহস্পতিবার (কাল) ডিসির সঙ্গে দেখা করবো, প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।”
এ ব্যপারে হলের প্রাধ্যক্ষ ডা. চন্দনা বলেন, “সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীর রুম সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে। ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। অসুস্থ দুজনের সু-চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।”
বিষয়গুলো জানতে আশা ও মুমুর মোবাইলে একাধিকবাার মোবাইল করেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সৈয়দ আবু তালেব বলেন, “বুধবার  আমার শেষ দিন। বিষয়টি আমার নলেজে এসেছে। আমি এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।”
 

শিক্ষাঙ্গন এর আরো খবর