শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০
logo
বিশ্ববিদ্যালয় জঙ্গি বানাচ্ছে, না কি তারাই হচ্ছে?
প্রকাশ : ১৪ জুলাই, ২০১৬ ১২:২১:৩৫
প্রিন্টঅ-অ+
শিক্ষা ওয়েব

ঢাকা : জঙ্গিবাদে শিক্ষার্থীদের জড়িয়ে পড়ার ঘটনা যখন অহরহ ঘটছে তখন প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জঙ্গি তৈরি করছে না কি শিক্ষার্থীরা নিজেরাই জড়িয়ে পড়ছে?
শিক্ষাবিদরা বলছেন, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্তদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম যেমন আসছে, শিক্ষকদের জড়িত থাকার বিষয়টিও বাদ যায়নি। এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে যেমন বলা যাচ্ছে না, তেমনি কাউকে বাদও দেয়া যাচ্ছে না। তাদের মতে, অপূর্ণ পাঠক্রম, পারিবারিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাবের সুযোগ নিচ্ছে জঙ্গিরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘কোনো কোনো জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জঙ্গি তৈরি করছে। আবার শিক্ষার্থীরাও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি ঘটনা আলাদা। জঙ্গিবাদের ঘটনাকে সাধারণীকরণ করা ঠিক হবে না।
‘শিক্ষার্থীদের মানসিকতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে অবহেলা, সমাজের নানা অপকর্মের কারণে জঙ্গিবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যেও সন্ত্রাসী আচরণ ফুটে উঠছে, উগ্রবাদকে উসকে দেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এ জঙ্গিবাদের সৃষ্টি।’
তিনি মনে করেন, প্রতিটি ঘটনাকে গভীরভাবে তদন্ত ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। যে কয়টি নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আসছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব একটা মূল্যায়ন জরুরি। বিশেষ করে যারা পরিচালনা করছেন, তাদের মূল্যায়নটা জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই সন্ত্রাসী না। দু’একজন সন্ত্রাসী আছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করছেন তাদের উচিত বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
‘কোনো কোনো পরিবারে সন্ত্রাসী কার্যকালাপ আছে। সেগুলো দেখে সে বড় হয়েছে। সন্ত্রাসীরা কোনো না কোনো জায়গা থেকে প্রভাবিত হচ্ছে’, বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
পরিপূর্ণ শিক্ষাক্রম না থাকায় এক ধরনের শূন্যতা আছে, যে কারণে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাঠক্রমে নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শিক্ষা না দিলে শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। অপূর্ণ শিক্ষার সুযোগে অন্য কিছু এসে সেখানে যুক্ত হয়, মনে করেন এ অধ্যাপক।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে তারা সাধারণত ১৭-১৮ বছরের। এর আগেও তাদের শিশুকাল, কিশোরকাল ছিল। সেখানে তারা কিভাবে প্রতিপালিত হয়েছে, কী শিক্ষা পেয়েছে, তার পরিবার-বন্ধুবান্ধব; এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই যে তারা জঙ্গি হয়েছে, এমন নয়; এমনও হতে পারে, আগেই হাতেখড়ি ছিল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম, সিলেবাসের মধ্যে এমন কিছু থাকা উচিত, যেগুলো মানুষের মনকে প্রসারিত করে, অন্ধকার দূর করে। আর ছেলেমেয়েদেরকে ওইসবে যুক্ত রাখার মত দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সঙ্গীত-গান-বাজনা-নাটক-বিতর্ক প্রতিযোগিতাগুলো কমে গেছে বলে জানান জবি উপাচার্য। এগুলো বাড়ালে জঙ্গিপ্রবণতা কমে যাবে বলেও মনে করেন তিনি।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কেউ যদি জঙ্গি ভাবাদর্শের থাকে, তবে কর্তৃপক্ষের উচিত তাকে খুঁজে বের করা। আমরা অতীতে দেখেছি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’চার শিক্ষক আছেন; যারা এ ধরনের চেতনা পোষণ করে’, বলেন মীজানুর রহমান।
উচ্চবিত্তের অনেক সন্তানকে ‘এতিম’ আখ্যা দিয়ে জবি উপাচার্য বলেন, ‘যাদের মা-বাবা সত্যিই মারা গেছেন, তারা এতিম। তারা এতিমখানা বা মাদরাসায় সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করে। তাদের এক ধরনের হতাশা-ক্রোধ আছে সমাজের প্রতি।
‘অনেক বড়লোকের সন্তানও এতিম। মা-বাবা আছে, প্রচুর টাকা-পয়সা আছে, কিন্তু তারা ব্যস্ত। সন্তানের খোঁজখবর নিতে পারেন না।  এদের মধ্যেও ক্রোধ কাজ করে। সমাজের প্রতি বিতৃঞ্চা তৈরি হয়’, বলেন এই শিক্ষক।
পিছুটান না থাকায় ‘এতিমদের’ জঙ্গিগোষ্ঠী সহজে দলে ভেড়াতে পারে বলে মনে করেন মীজানুর রহমান। বলেন, ‘আমাকে যদি কেউ বলে সুইসাইড করলে বেহেশতে চলে যাব; আমি আমার মা-বাবা-পরিবারের কথা চিন্তা করব। কিন্তু তারা এসব ভাবে না।’
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হয় না বলে আক্ষেপ করেন মীজানুর রহমান। বলেন, ‘যারা মেসে থাকে তাদেরও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। এর জন্য কালচারাল বাজেট বাড়াতে হবে।’
‘গতবার এর বাজেট ছিল ৩৬৫ কোটি টাকা। এ টাকায় কালচারাল মিনিস্ট্রির বেতন বাদ দিলে কালচারাল অনুষ্ঠান করার মতো কোনো টাকাই থাকে না। এ বছর ১০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আমি বলেছিলাম, আমাদের অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় যে খাত আছে সেগুলো না করে; যেমন গ্রামের রাস্তা পাকা করার চেয়ে খেলার মাঠ, ক্লাব, পাঠাগার এগুলো বেশি জরুরি।’
উচ্চশিক্ষায় নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপ-পরিচালক জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘এথিকস এডুকেশন কিন্তু হায়ার এডুকেশনে শেখানো যায় না। স্কুল থেকে শুরু করতে হয়।’
জঙ্গিবাদের জন্য পরিবার অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারগুলো বাইরে থাকতে পছন্দ করে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কতক্ষণ থাকে?’

শিক্ষাঙ্গন এর আরো খবর