সোমবার, ১২ এপ্রিল ২০২১
logo
কুইচায় জীবন-যাপন
প্রকাশ : ২৫ মে, ২০১৬ ১৩:১৮:২২
প্রিন্টঅ-অ+
জেলা ওয়েব

যশোর: যশোরের সহস্রাধিক মাছ শিকারীর এখন প্রধান পেশা কুইচা ধরে বিক্রি করা। ভারত মহাদেশের সর্বত্র এ মাছ জাতীয়টি প্রাণী পাওয়া যায়। অল্প কাঁদা-পানির এ প্রাণীটি  কাঁকড়াকে তাড়িয়ে দিয়ে তার গর্তেই অবস্থান নেয়।
কুইচা সাধারণত ২০ থেকে ৬৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এক একটির ওজন হয় ৫০০ গ্রাম থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। এটিকে অঞ্চাল ভেদে মানুষ কেউ কুচে, কেউ কুইচা, কেউবা কুচ্ছে বলে থাকেন। আবার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কোথাও কোথাও কুইচানও বলে থাকে। তবে যে নামই হোক না কেন।
অল্প কাদা পানির এ প্রাণীটির দিকে এখন তীক্ষ্ণ নজর শিকারীদের। কারণ খাল-বিলের মুক্ত জলাশয়ের মাছের যোগান কমে যাওয়া শিকারীদের নজর এ প্রাণীটির দিকে।  
প্রতিদিন সকাল হলেই এলাকার প্রায় শতাধিক শিকারী একটি ছোট লাটির মাথায় বড়শি নিয়ে চিরুনি তল্লাশী করেন এলাকার ডোবা, খাল, বিল এলাকায়। যেখানে এসব শিকারী একটু পানি দেখে সেখানেই নেমে পড়ে সংগ্রহের জন্য। এর পর বড়শি বাঁধা লাটির গুড়াটি কাঁকড়ার গর্তে চালিয়ে দিয়ে সনাক্ত করে গর্তটিতে কুইচা আছে কি না। কুইচা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে লাঠির অপার প্রান্তের মাথায় সুতা পরানো বড়শিটিতে কেঁচে পরিয়ে গর্তের ভিতরে প্রবেশ করান। গর্তে সুতা পরানো বড়শিটি ফেলার সঙ্গে সঙ্গে একটি পর্ণাঙ্গ কুইচা বড়শি খায়। শিকারী মুখে এক ঝলক হাসি নিয়ে গর্ত থেকে বের করে নিয়ে আসে কুইচাটাকে।
এভাবেই চলে একজন কুইচা শিকারীর সারাটি দিন। সারা দিন ধরলে দিন চার থেকে পাঁচ কেজি কুইচা ধরা যায়। এর পরে সন্ধ্যায় বিক্রির জন্য নির্ধারিত বাজারে গেয়ে বিক্রি করেন। যা পায় তা দিয়ে চলে এসব শিকারীর পরিবারের জীবন-যাপন।
কুইচা শিকারী স্বরজিত মন্ডল বলেন, “আগে বিল-খালে মাছ ধরে জীবন চালাতাম।বর্তমানে বিল-খালে আর মাছ পাওয়া যায় না। তাছাড়া সরকারি  বিল-খাল এখন ক্ষমতাসীনদের দখলে চলে গেছেন। তারা সেই সমস্ত জায়গা দখল করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করছে।”
তার মতো কয়েক হাজার লোক যারা বিল-খালে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বহ করত তাদের জীবন হয়ে পড়েছে দুর্বিসহ। অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়ে ভ্যান ও ইজিবাইক চালান। আবার অনেকে আমার মতো খাল-বিলের ডোবা-নালায় কুইচা ধরার কাজ করেন। তবে কুইচা তো আর সব সময় ধরা যায় না। এখন নতুন আকাশের বৃষ্টি হওয়ায় ডিমপাড়ার জন্য নদী ও খাল-বিল থেকে মা কুইচা ডোবাই উঠে আসে। এ সময়ের মধ্যে এসব কুইচা ডোবায় ডিম পাড়ে। আবার বড় পানি হলে নদী-খাল-বিলের পানিতে নেমে যায়। বড়জোর মাসখানেক এ কাজ করা যায়। বর্তমানে এক কেজি কুইচার দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বলেও তিনি জানান।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিভাগের প্রফেসার আনিসুর রহমান বলেন, “দেশে মুক্তজলাশয়ে মাছ কমে যাওয়ায় মাছ শিকারীরা এ নতুন পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তবে এ কুইচা মাছ উপমহাদেশে অনেকেই খায়। তবে সম্প্রতি এ প্রাণীতে ওষুধীগুণ থাকায় অনেকে এটি খাচ্ছে। যে কারণে বর্তমানে বাজারে এটির দামও ভালো। দাম ভালো হওয়া ও বাজারে চাহিদা থাকায় অনেক মানুষ এখন এ পেশার দিকে ঝুকছে। তবে এভাবে ডোবা-নালায় অভিযান চালিয়ে নিধন করলে পরিবেশের ভারসম্য নষ্ট হবে। এটি আমাদের পরিবেশেরই একটি অংশ। আগের দিন ডোবা-নালা-খাল-বিলে নানা প্রজাতির মাছ নিধোনের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি রক্ষায় এখন থেকে কাজ না করলে এ প্রাণীটিও এক দিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।”

জেলা এর আরো খবর