বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
তামাক চাষে কৃষি-জনস্বাস্থ্য হুমকিতে
প্রকাশ : ০৭ মার্চ, ২০১৬ ১২:৩৩:১৫
প্রিন্টঅ-অ+
জেলা ওয়েব

কুষ্টিয়া: জেলায় বেড়েই চলেছে তামাকের চাষ। তামাক কোম্পানিগুলোর চাতুর্য ও লোভনীয় ফাঁদে ধরা দিয়ে দিন দিন এ পেশায় ঝুঁকছেন চাষীরা। কিন্তু  এতে তারা সাময়িক অর্থ চাহিদা মেটাতে পারলেও এর করাল গ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদের মানুষেরা। শুধু জনস্বাস্থ্যই নয়, পুরো কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাই দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নিরুৎসাহিত করার নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও থামছে না তামাকের এই আগ্রাসন। বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, ঢাকা টোব্যাকো এবং আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানির মতো শীর্ষ তামাক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়ার উর্বর ভূমিতে কৃষি আবাদের বদলে তামাক চাষে প্রলুব্ধ করেছে। তাদের সেই প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে। তামাকের নানামুখী অপকারিতার বার্তাও আর কৃষকের কানে পৌঁছাচ্ছে না। সাময়িক লাভের আশায় তারা পা দিচ্ছেন তামাক কোম্পানির ফাঁদে।
কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদে একসময় যেখানে ধান, গমসহ অসংখ্য শস্যের ক্ষেত দিগন্ত বিস্তৃত সবুজশোভা নিয়ে চোখে ধরা দিতো সেখানে এখন তামাকের আধিপত্য।
তামাক চাষের জন্য পূর্বে রংপুর অঞ্চলকে বেছে নিয়েছিল বিভিন্ন কোম্পনিগুলো। কিন্তু ক্রমাগত তামাক চাষে আর মাত্রাতিরিক্ত সার-কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সেসব অঞ্চলে তামাক চাষ আর আগের মতো হয় না।
বর্তমানে কুষ্টিয়ায় উৎপাদিত তামাক উৎকৃষ্টমানের হওয়ায় বড়বড় তামাক উৎপাদনকারী, প্রক্রিয়াজাতকারী, বিড়ি, সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো এই এলাকায় জেঁকে বসেছে। মাঠের পর মাঠ শুধু তামাকের চাষ হলেও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই খোদ কৃষি অফিসে।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় সর্বমোট আবাদি জমির পরিমাণ ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৭৮হেক্টর জমি। চলতি মৌসুমে এখানে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ করা হলেও জেলা সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বলছেন সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টরের কথা।
তামাক চাষ বিরোধী সচেতনতা তৈরির কাজ করা এনজিও কর্মীরা জানান, তামাক কোম্পানিগুলোর লোভনীয় বিজ্ঞাপন, ধুমপানে আকৃষ্ট করতে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা ও ধুমপায়ীদেরকে পুরস্কার প্রদানের কারণেই বন্ধ হচ্ছে না এই আগ্রাসন।
এনজিও কর্মীরা আরো জানান, আত্মঘাতী ব্যাপার হচ্ছে- দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে তামাক চাষ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় বলেন, ‘তামাক পাতা মাঠ থেকে আনার পর তা আগুন দিয়ে জ্বালানোর প্রয়োজন পড়ে। এর জন্য নিধন করা হচ্ছে প্রচুর গাছপালা। ফলে বৃক্ষশূন্য হয়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এছাড়া পাতা ছাড়ানোর পর তামাক গাছের আঁটিগুলোকে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে স্থানীয়রা। ফলে এসব জ্বলন্ত আঁটি থেকে নির্গত ধোঁয়া মারাত্মক স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে স্থানীয় লোকজনের। যা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।’
কুষ্টিয়ার তামাকবিরোধী এনজিও সাফ’র নির্বাহী পরিচালক মীর আব্দুর রাজ্জাক জানান, সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন করলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন না করায় তামাক চাষ বেড়ে চলেছে। মাঝে মধ্যে দুই এক জন ধুমপানকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও নামমাত্র জরিমানা করা হচ্ছে। এতে ধুমপান বন্ধ হচ্ছেনা। তামাক চাষের নিয়ন্ত্রণ ও ধুমপান থেকে সাধারণ মানুষকে বিরত রাখতে হলে সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করার দাবি জানান তিনি।
কুষ্টিয়ার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. তাপস কুমার সরকার জানান, ধুমপানের কারণে করোনারী, হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা, প্যারালাইসিস, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা, গ্যাংগ্রিণ, ফুসফুসে ক্যান্সার, চোখের সমস্যা, দাঁত ও মাড়ির সমস্যাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় এসব উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
নারীদের তামাক চাষে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে এই চিকিৎসক জানান, অনেক সময় নারীরা তামাকের কাজ করে থাকে। এর ফলে অনেক সময় সন্তানধারণ করতে সমস্যা হয় তাদের। এছাড়া গর্ভাবস্থায় এ কাজে সম্পৃক্ত থাকলে শিশুর বিকলাঙ্গ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
তামাক কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি মুনাফার কথা স্বীকার করে মিরপুর উপজেলার চুনিয়াপাড়া গ্রামের আব্দুল মালেক নামে এক তামাক চাষী বলেন, ‘আমি এবার ২ একরের কার্ড পেয়েছি। টোব্যাকো কোম্পানিগুলো আমাদের সার, বীজ, কীটনাশক সরবরাহসহ অধিক মূল্যে তামাক ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছে। পরিশ্রম করে বছরে একবার তামাক বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতে পাই। তাই প্রতিবছরই তামাকের চাষ করে থাকি।’
তিনি আরো জানান, তামাক লাগানো থেকে শুরু করে তামাক ভাঙা, জ্বালানো এমনকি বিক্রি পর্যন্ত প্রতি বিঘায় খরচ হয় ১২-১৫ হাজার টাকা এবং বিক্রি হয় ২৫-৩০ হাজার টাকার মতো।
ভেড়ামারা উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের চাষী শাহাবুল ইসলাম বলেন, ‘অন্য ফসলের তুলনায় দ্বিগুণ লাভ হওয়ায় তামাক চাষ করছি। তাছাড়া তামাক কোম্পানির দায়িত্বরত কর্মকর্তারা মাঠে তামাক লাগানোর পর থেকে তামাক ভাঙা পর্যন্ত কোনো সমস্যা আছে কিনা এরও খোঁজখবর নেন।’
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কিংকর চন্দ্র দাস বলেন, ‘এবার ১৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। গতবছর ১৬ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন কৌশলে চাষীদের তামাক চাষে বিরত থাকার জন্য বোঝাচ্ছি। কিন্তু ততে তেমন একটা লাভ হচ্ছে না। কিন্তু আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
বছরের পর বছর তামাক উৎপাদনের ফলে একদিকে আবাদি জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। অন্যদিকে এক জমিতে তামাক আর পাশের জমিতে ধান বা অন্য ফসল আবাদ করলে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে ওই ফসলি জমির ওপর। এতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা। তাই তামাকের রাহুগ্রাস থেকে বেরোতে প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ।

জেলা এর আরো খবর