বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০
logo
আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি : আড়ালে পরিকল্পনাকারীরা
প্রকাশ : ০২ জুন, ২০১৬ ১৬:৪৮:১০
প্রিন্টঅ-অ+

গ্রেপ্তারকৃত ১০ আসামি : আবুল বাতেন, বাবুল সরদার, বোরহান উদ্দিন, জসিমউদ্দিন, মাহাফুজুল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে শামীম, মিন্টু প্রধান, মোজ্জামেল হক, শাজাহান জমাদার, সাইফুল ওরফে আলামিন ও উকিল হাসান

দেশ ওয়েব

ঢাকা : ঢাকার আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতি ও ৮ জনকে হত্যার প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিল দুজন। তাদের একজন জেএমবি নেতা আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ওরফে হাফিজ গত বছরের ২৫ নভেম্বর রাজধানীতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়।
অপর পরিকল্পনাকারী আসিফ আজওয়াদকে শনাক্তই করতে পারেনি পুলিশ। তাই এই দুজনকে বাদ দিয়েই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ডাকাতিতে অংশ নেয়া জঙ্গিদের মধ্যে অন্যতম ছিল সাইফুল ও পলাশ। পুলিশ সাইফুল ও পলাশকেও শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
গত মঙ্গলবার (৩১ মে) আদালত দেশের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় যে রায় দিয়েছেন সেখানে অর্ন্তভুক্ত হয়নি তিন আসামি। পলাশকে পলাতক বলে রায় শোনানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ১০ আসামির মধ্যে সাতজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওই চারজনের নাম জানিয়েছিল। আসামিরা জানায়, জেএমবির একটি দলছুট পক্ষ তিনটি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটায়। তবে এই দলের নেতৃত্বের ব্যাপারে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তাই আসিফ আজওয়াদসহ আর কারা জড়িত আছে, সে ব্যাপারে তথ্য মেলেনি।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকাতির পর পালানোর সময় গণপিটুনিতে নিহত একজনের পরিচয় জানা যায়নি। ওই নিহত ব্যক্তিই সাইফুল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পলাতক আসামি পলাশ রাজধানীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযদ্ধে নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আরেক পরিকল্পনাকারী আসিফের হদিস মেলেনি।
মামলাটির তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) নাজমুল হাসান ফিরোজ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসিফ আজওয়াদ এই ঘটনার মাস্টার মাইন্ড ছিল। তবে আমরা অনেক খোঁজ-খবর করেও তাকে শনাক্ত করতে পারিনি। আর মাহফুজ ওরফে হাফিজ ঢাকায় ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। ১৩-১৪ জনের নাম আসলেও পরে ১১ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘সাইফুল ও পলাশ নামে দুজনকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি, যাদের নাম এসেছে। ঘটনার পর গণপিটুনিতে নিহত হয় এক ডাকাত। তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। সে-ই সাইফুল বলে ধারণা করছি আমরা। আর পলাতক থাকা পলাশ ঢাকায় বন্দুকযদ্ধে নিহত হয়েছে। এটি পরে জানা গেছে।’
এএসপি নাজমুল হাসান ফিরোজ আরও বলেন, ‘জেএমবির একটি দলছুট গ্রুপ টঙ্গীতে অবস্থান নিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতি করে। ত্রিশালের জঙ্গি ছিনতাইয়ের পর তারা আলাদা হয়ে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানীর গ্রুপে যায়। তবে তারা মূলত জেএমবি। এই দলটির পেছনে আর কেউ আছে কি না তা জানা যায়নি।’
গত বছরের ২১ এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে ডাকাতির সময় ডাকাতদলের হামলায় ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ওয়ালীউল্লাহ, নিরাপত্তাকর্মী কাজী বদরুল আলম, ইব্রাহিম মণ্ডল, ব্যাংকের গ্রাহক শাহাবুদ্দিন মোল্লা ও নূর মোহাম্মদ, স্থানীয় ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান ও জমির আলী এবং অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য আইয়ুব আলী নিহত হন।
ঘটনার পর জনতা তিন ডাকাতকে ধরে ফেলে এবং গণপিটুনিতে তাদের একজন মারা যায়। লুট করা হয় ছয় লাখ ৮৭ হাজার ১৯৩ টাকা, যা পরে উদ্ধার করে পুলিশ। ২২ এপ্রিল ব্যাংকের কর্মকর্তা ফরিদুল হাসান আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। পরে পুলিশ আরো ৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে বোরহানউদ্দিন, সাইফুল ওরফে আলামিন, জসিমউদ্দিন, বাতেন, মোজ্জামেল হক, শাজাহান জমাদার এবং মাহাফুজুল ইসলাম ওরফে সুমন ওরফে শামীম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। অপর আসামিরা হলো : বাবুল ওরফে বাবুল সরদার, মিন্টু প্রধান ও উকিল হাসান।
গ্রেপ্তারকৃত ১০ জন এবং পলাতক পলাশকে আসামি করে গত বছরের ১ ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা দীপক চন্দ্র সাহা আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সম্প্রতি তিনি আশুলিয়া থানা থেকে বদলি হয়েছেন।
জানতে চাইলে পরিদর্শক দীপক বলেন, গত বছরের ২৫ নভেম্বর গাবতলীতে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় মাহফুজ ওরফে হোজ্জা। গত ১৩ জানুয়ারি রাতে হাজারীবাগে আরেক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় জেএমবির দুই ‘কমান্ডার’ হিরণ ওরফে কামাল ও আবদুল্লাহ ওরফে নোমান। তারা তিনজনই হোসনি দালানে বোমা হামলা, গাবতলী ও আশুলিয়ায় এবং ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় জড়িত। তাদের নেতা ছিল মাহফুজ ওরফে হোজ্জা, যে ব্যাংক ডাকাতির আগে টঙ্গীর আইচপুরে হাফিজ পরিচয় বাসা ভাড়া নেয়। মাহফুজের বাড়ি শেরপুরের নকলা উপজেলার কেজাইকাটা কাজির মোড় এলাকায়। তার বাবার নাম মৃত মজিবুর রহমান। পলাশ সেখানে সোহেল রানা পরিচয় দেয়। হাজারীবাগে নিহত দুজনের মধ্যে একজন সেই পলাশ।
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আসামিরা সবাই আসিফ নামটি বললেও তার পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানাতে পরেনি। সাইফুল নামের লোকটি আসলে কে তাও জানা যায়নি।’
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, আশুলিয়ার ব্যাংক ডাকাতির তদন্ত করতে গিয়ে তিনটি ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি জেএমবির একটি দল ময়মনসিংহের ত্রিশালে হামলা চালিয়ে তিন জেএমবি সদস্যকে ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধে কয়েকজন মিলে একটি নতুন দল গঠনের লক্ষ্যে টঙ্গীতে অবস্থান নেয়। প্রথমে হকারি করে টাকা উর্পাজনের চেষ্টা করে তারা। পরে গাজীপুরের বোর্ড বাজারে দুই বিকাশ এজেন্ট হত্যা করে প্রায় সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। ওই টাকায় কেনা অস্ত্র ও বোমা দিয়ে কাঠগড়ায় ব্যাংক ডাকাতির চেষ্টা করে। ওই দলটি আশুলিয়ার কবিরপুরে শিল্প পুলিশ সদস্য মকুলকে হত্যা করে। মাহফুজ ওরফে হোজা ঢাকার হোসেনি দালানে বোমা হামলা এবং কথিত পীর খিজির খানকেও হত্যা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডাকাতির অপারেশনে নেতৃত্ব দেয়া মাহফুজুল ইসলাম শামীম ওরফে সুমন জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। সে ত্রিশালের জঙ্গি ছিনতাইয়ে জড়িত। গাজীপুরের বোর্ড বাজারে দুই বিকাশ এজেন্ট হত্যায় জড়িত ছিল সুমন, মাহফুজ ওরফে হোজ্জা (বন্দুকযুদ্ধে নিহত), সাইফুল ওরফে আলামিন ও পলাশ ওরফে সোহেল রানা এবং কবিরপুরে শিল্প পুলিশ মুকুল হত্যায় জড়িত ছিল হোজ্জা ও পলাশ। আসামিরা একে-অপরের ছদ্মনাম বা সঠিক নাম জানালেও তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত জানে না বলেই দাবি করে।
ব্যাংক ডাকাতির সময় হাতে তৈরি বিশেষ গ্রেনেড এবং জঙ্গিবাদের আস্তানায় বোমা তৈরির বিশেষ ম্যানুয়াল ব্যবহার করা হয়। এসবের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল তাও পুলিশের তদন্তে বের হয়নি।
ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান বলেছেন, ডাকাতির কাজে তারা কয়েকটি গ্রেনেড ব্যবহার করেছিল। এসব গ্রেনেডের উপাদান চায়না ব্র্যান্ডের। তবে গ্রেনেডগুলো কীভাবে তারা সংগ্রহ করেছে তা জানা যায়নি।

দেশ এর আরো খবর