শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০
logo
চলে গেছে রোয়ানু, রেখে গেছে ক্ষত
প্রকাশ : ২৫ মে, ২০১৬ ১৬:২৯:২৫
প্রিন্টঅ-অ+
দেশ ওয়েব

কক্সবাজার: ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র আঘাতে কক্সবাজারে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বেড়িবাঁধে। শুধুমাত্র কৃষিখাতে (চিংড়ি ঘের, মৎস্য খামার, জমির ফসল, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি) ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮ কোটি টাকা। তবে ঘরবাড়ি, সড়ক, বেড়িবাঁধ ও জলাশয়ে ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র মতে, কক্সবাজারের ৮ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩১টি ইউনিয়নের ৩৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকায় সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত হয়েছে ১৩ হাজার ঘরবাড়ি। এছাড়াও ১৬ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ২২ হাজার ১২৮টি পরিবারের ৯৬ হাজার ৬৪০ জন মানুষ। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ৮৪৫টি পরিবারের ২৮ হাজার ৭২৫ জন মানুষ। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ হাজার ২৮৩টি পরিবারের ৬৭ হাজার ৯১৫ জন মানুষ।
৪৫টি চিংড়ি ঘের সম্পূর্ণরুপে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে ভেসে গেছে ২ হাজার ৭৭৭টি মৎস্য খামার। ২৭ একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬১ একর ফসলি জমি। ১৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক। ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এছাড়াও ২ হাজার জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৭৫টি গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে। হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫১২টি।
জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখা সূত্র জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র প্রভাবে জেলায় ১৭ কোটি ৬৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি নিরুপণ করা হয়েছে। তবে এতে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বেড়িবাঁধ ও জলাশয়ের ক্ষতির পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ত্রাণ শাখা থেকে পাওয়া ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ‘রোয়ানু’র প্রভাবে জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্য খাত। চকরিয়া উপজেলায় এক হাজার ৭৪৩টি মৎস্য খামার পানিতে ভেসে গেছে। এছাড়াও পেকুয়া উপজেলায় ৪৫৫টি, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ২৪০টি, মহেশখালী উপজেলায় ২০০টি, উখিয়া উপজেলায় ৭৫টি, টেকনাফ উপজেলায় ৪২টি ও রামু উপজেলায় ২২টি মৎস্য খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে।  এইসব মৎস্য খামারে ক্ষতি হয়েছে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার। জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যাওয়া ৪৫টি চিংড়ি ঘেরে ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার। ২৭ একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকার, ৬১ একর জমির ফসল আংশিক নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার।
ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ সবেচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া ও কক্সবাজার সদর উপজেলায়।
সূত্র মতে, কুতুবদিয়ার ৬টি ইউনিয়নের ৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এইসব এলাকায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৮০০টি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ হাজার ৩০০ পরিবার। সেখানে ৬ হাজার বাড়িঘর সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ঘরবাড়ি। ৪৭৫টি গবাদি পশুর ক্ষতি হয়েছে। ওই খাতে আর্থিক ক্ষতি ধরা হয়েছে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও ৫১২টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ টাকা। কুতুবদিয়ায় ৭২ হাজার টাকা মূল্যের ফসল নষ্ট হয়েছে, আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার টাকার ফসলের। এই উপজেলায় ৬টি চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ৩৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও ২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, ৬ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ কিলোমিটার।
মহেশখালীর ৫ ইউনিয়নের ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এইসব এলাকায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৯০০টি পরিবার, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩০০টি পরিবার। সেখানে ৪ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণরুপে ও ৫ হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ১৩টি চিংড়ি ঘের। এতে এক কোটি ১২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও পানিতে ২০০টি মৎস্য খামার ভেসে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে এক কোটি টাকার। ৯ একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকার। ১২ একর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এক লাখ ৬০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মহেশখালীতে ২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ৭ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৩ কিলোমিটার।
চকরিয়ার ৬ ইউনিয়নের ৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এইসব এলাকায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৫২৫টি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৪৩০টি পরিবার। সেখানে ৫৭০টি বাড়ি সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত ও এক হাজার ৬৫০টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়ায় ১৭৪৩টি মৎস্য খামার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকার। এছাড়াও ১১ একর চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। এতে ৮০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়া ৫ একর জমির ৬০ হাজার টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ১৮ একর জমির ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার ফসলের। চকরিয়ায় ৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত ও ৪ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
পেকুয়ার ৩টি ইউনিয়নের ২ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এইসব এলাকায় এক হাজার ২০০ পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ২ হাজার ৫০০ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত হয়েছে ২ হাজার বাড়ি, আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার বাড়ি। পেকুয়ায় ৪৫৫টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার। ৫টি চিংড়ি ঘের পানিতে ভেসে যাওয়ায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ৩ একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৩৬ হাজার টাকার। ৬ একর জমির ফসলের আংশিক ক্ষতি হওয়ায় ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। পেকুয়া ৩ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
কক্সবাজার সদর উপজেলার ৫ ইউনিয়নের ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এইসব এলাকায় ২১১টি পরিবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ৯৬৩ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণরুপে বিধ্বস্ত হয়েছে ২৮০টি বাড়ি, ৯৮০টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সদর উপজেলায় ৭টি চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২৪০টি মৎস্য খামার ভেসে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকার। পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক। এছাড়াও ৭ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কক্সবাজার কার্যালয়ের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শবিবুর রহমান জানান, রোয়ানুর আঘাতে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফের উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিকভাবে ৪৫ কিলোমিটারের বেশি বেড়িবাঁধ আংশিক ও সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে সম্পূর্ণভাবে ১৪ কিলোমিটার এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ কিলোমিটার।
অপরদিকে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ শাখা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।
ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ দিনের বেলায় আঘাত হানায় জানমালের ক্ষতি কম হয়েছে দাবি করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানায়, নতুন করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় অরক্ষিত থাকার কারণে উপকূলীয় এলাকায় সম্পদের ক্ষতি এবং ৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, কুতুবদিয়ার ৬টি ইউনিয়ন, মহেশখালীর ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি ইউনিয়ন আর পেকুয়ার ৩টি ইউনিয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই ক্ষতি লাঘবের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

দেশ এর আরো খবর