রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
logo
সুবর্ণ জয়ন্তী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী উৎসব
চাঁদপুর গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুলের গৌরবময় অতীত ঐতিহ্য জানান দিলো
প্রকাশ : ১২ মার্চ, ২০১৭ ১০:৩৯:১৬
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব
চাঁদপুর: রাত পোহালেই বহুল প্রত্যাশিত ও কাঙ্ক্ষিত উৎসব। অথচ সে রাতেই মুষলধারে বৃষ্টি। মাঝ রাতে বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু না। প্রকৃতির বৈরী আচরণ আবার শুরু হয়ে গেলো ভোরের আকাশে আলো না ছড়াতেই। শুরু হয়ে গেলো আবার মুষলধারে বৃষ্টি। কোনো বিরতি নেই, একাধারে যেনো আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরছে। ওই দিকে প্রস্তুত বর্ণিল সাজে সাজানো ঘোড়ার গাড়ি ও ব্যান্ড পার্টিসহ আরো নানা রং বেরংয়ের আয়োজন। সমবেত হয়ে আছে অর্ধশতাব্দী জুড়ে পড়ুয়া বিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী। অনেকেরই মন খারাপ-প্রকৃতি কেনো আমাদের আনন্দে বাধ সাধলো। কিন্তু না, ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলেন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন কৃতী ছাত্র (১৯৭১ ব্যাচ) আলহাজ্ব অ্যাডঃ মোঃ ইকবাল-বিন-বাশার। সাথে প্রস্তুত হয়ে গেলেন আরো শত শত প্রাক্তন শিক্ষার্থী। বৈরী আবহাওয়ার কোনো বাধা মানা হলো না। বর্ণিল সাজে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়ি আর দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সত্তরোর্ধ্ব বয়সী থেকে শুরু করে এ প্রজন্মের তরুণরা। সকলেই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলতে লাগলো বর্ণাঢ্য র‌্যালী।


বাঁধভাঙ্গা আনন্দই ছিলো চাঁদপুর গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী উৎসব জুড়ে। মূল চাঁদপুর শহরের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থেকে একটু দূরে শান্ত সুনিবিড় এক মনোরম পরিবেশে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁষে দক্ষিণ পাশে বিরাট পরিসরে গড়ে উঠেছে চাঁদপুর গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুল। ১৯৬৫ সালে এ স্কুলটির যাত্রা শুরু। ২০১৫ সালে সরকারি এ বিদ্যালয়টি ৫০ বছর পূর্ণ করলো। ৫০ বছর পূর্তিতে সুবর্ণ জয়ন্তী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী উৎসব অনুষ্ঠিত হলো গতকাল ১১ মার্চ শনিবার। ঝড়-বৃষ্টি তেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, যদিও উৎসবে কিছুটা ছন্দ পতন ঘটিয়েছে। তবে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছিলো পুরো উৎসব জুড়ে। আর এ উৎসবটিই জানান দিয়ে গেছে চাঁদপুরের সরকারি এ বিদ্যাপীঠটির অতীত ঐতিহ্যের কথা। যেটি না হলে এ প্রজন্ম হয়ত জানতো না চাঁদপুর গভর্নমেন্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুলটি যে অতীতে ভালো একটি বিদ্যাপীঠ ছিলো। সত্তর-আশির দশকে এ বিদ্যালয় থেকে যে কতো মেধাবী ছাত্র কৃতিত্বের সাথে বোর্ডের মেধা তালিকায় ৫ম থেকে ২০তম স্থান করে নিয়েছে তা এ প্রজন্মের অনেকেরই অজানা ছিলো।


বৃষ্টিমুখরতায় বিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালিটি বের হয়ে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়ক ধরে বাসস্ট্যান্ড, আঃ করিম পাটওয়ারী সড়ক হয়ে শপথ চত্বর ঘুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক, স্টেডিয়াম রোড ও পুনরায় বাসস্ট্যান্ড হয়ে টেকনিক্যাল স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।


দিনব্যাপী এ উৎসব জুড়ে ছিলো সুবিশাল কেক কাটা, জমজমাট আড্ডা, বৃক্ষরোপণ, সুবর্ণ জয়ন্তীর ফলক উন্মোচন, বেলুন উড়ানো, স্মৃতিচারণ, আনন্দ-উল্লাস, বর্ণিল আতশবাজি, জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সকালের নাস্তা, মধ্যাহ্নভোজ ও বৈকালিক পিঠা উৎসব এবং সর্বশেষ ছিলো র‌্যাফেল ড্র। র‌্যালী শেষ করে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্ররা 'পিদিম' নামে সুবর্ণ জয়ন্তীর ফলক উন্মোচন করেন। এরপর প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কেক কাটেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। পরে নাস্তার পর্ব চলে। উৎসবে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, তাদের পরিবারের সদস্য ও অতিথিসহ প্রায় আড়াই হাজার অংশগ্রহণকারী পর্যায়ক্রমে নাস্তার পর্ব সেরে নেন। এরপর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াত করেন র‌্যালী উপ-পরিষদের আহ্বায়ক সালেহ উদ্দিন আহমেদ (জিন্নাহ)। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা সালমা খাতুন। এ সময় বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য ক'জন প্রাক্তন ছাত্র সাথে ছিলেন। এরপর শুরু হয় জম্পেশ আড্ডা। দীর্ঘ ৩০-৪০ বছর পর সহপাঠী বন্ধুদের কাছে পেয়ে আনন্দে মেতে উঠে অনেকে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে স্মৃতিময় সেই শৈশব ও কৈশোরকালীন দিনগুলোতে যেনো ফিরে গেছেন।


উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রূপায়ন গ্রুপের এমডি, নৌ-বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী জহির উল্লাহ (১৯৭০ ব্যাচ), চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতি ও চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডঃ মোঃ ইকবাল-বিন-বাশার (১৯৭১ ব্যাচ), কবি ও ছড়াকার মুক্তিযোদ্ধা খান-ই-আজম (১৯৭২ ব্যাচ), টাকশাল-এর মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন চৌধুরী (১৯৭৫ ব্যাচ), ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল ওয়াসেত সাহিন (১৯৭৮ ব্যাচ), বিকেএসপির মহাপরিচালক ব্রিঃজেঃ মোঃ শামছুর রহমান (১৯৮০ ব্যাচ), উপ-সচিব মোঃ মাসুম পাটওয়ারী (১৯৮৪ ব্যাচ) প্রমুখ। পুরো উৎসব অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক শেখ মনির হোসেন বাবুল (১৯৮১ ব্যাচ), সদস্য সচিব আবু নাছের বাচ্চু পাটওয়ারী (১৯৮২ ব্যাচ), প্রধান সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আনিছুর রহমান পবন (১৯৮৩ ব্যাচ), সমন্বয়ক মোঃ খায়রুল আলম কামাল চৌধুরী (১৯৮০ ব্যাচ), যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ ফোরকান উদ্দিন খান (১৯৮১ ব্যাচ), সালেহ উদ্দিন আহমেদ জিন্নাহ (১৯৮৩ ব্যাচ), স্মরণিকা উপ-পরিষদের আহ্বায়ক খান-ই-আজম এবং সদস্য সচিব মির্জা জাকির, অভ্যর্থনা উপ-পরিষদের আহ্বায়ক পাটোয়ারী জহির উল্লাহ ও সদস্য সচিব অ্যাডঃ ইকবাল-বিন-বাশার।


মধ্যাহ্ন ভোজের পর অনুষ্ঠান মঞ্চে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্ব উপস্থাপনা করেন প্রকৌশলী মোঃ আনিছুর রহমান পবন। এ সময় উৎসবের উদ্যাপন পরিষদ, উপদেষ্টা পরিষদ ও বিভিন্ন উপ-পরিষদের কর্মকর্তাগণকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এরপর জমকালো সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়। নাচ ও গানের ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতাও চলে। সন্ধ্যায় আতশবাজি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে র‌্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে এ বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো টেকনিক্যাল এলাকায় যেনো আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর