শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯
logo
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার
চাঁদপুরে যথাযথ মর্যাদায় ৪৫তম বিজয় দিবস উদযাপিত
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৬:৫২:২০
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব
চাঁদপুর: বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গত ১৬ ডিসেম্বর শুক্রবার জাতি স্মরণ করলো মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী মহান শহীদদের। পাকিস্তানের অপ্রশাসনের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার অনন্য গৌরবে উদ্ভাসিত করায় কৃতজ্ঞ জাতি মহান বিজয় দিবসের ৪৫তম বার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জানিয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের। এ অনন্য দিনটিকে কেন্দ্র করে উৎসব-আনন্দে মেতে ওঠে গোটা চাঁদপুরবাসী।  
মহান বিজয় দিবসের আলোচনা সভা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আত্মনিয়োগের অঙ্গীকারের মধ্যদিয়ে চাঁদপুরে মহান বিজয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। বাঙালি জাতির গৌরব, অহংকার, পরম প্রাপ্তির দিন মহান বিজয় দিবস। আজকের এ দিনে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার অসামান্য অবদানকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দিয়েছে ৩০ লক্ষ বাঙালি এবং সম্ভমহানি ঘটেছে ২ লক্ষ মা-বোনের। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন সাবভৌম বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বাঙালি জাতির অকুন্ঠ সমর্থন ছিলো মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে। তাদের সমর্থন ও স্বাধীনতার অর্জনের অদম্য ইচ্ছায় চরম আত্মত্যাগ করেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সবুর মন্ডল আরো বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলাম। বিজয় আনন্দের, বিজয় গৌরবের। আমরা আজ বিজয়ের কথা বলবো। বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। পোশাক খাত, নারী অধিকার, খাদ্য উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার হারের দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনেক অনেক উন্নত রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে। সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যের দিকে।
তিনি আরো বলেন, আগামীতে এদেশে কোনো বেকার থাকবে না। এদেশে কোনো অশিক্ষিত মানুষ থাকবে না। বাংলাদেশের মানুষ সারাবিশ্বে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নেতৃত্ব দিবে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে বাংলাদেশ বিশ্বকে আলোকিত করবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চার করে সবাইকে কাজ করার জন্যে জেলা প্রশাসক আহ্বান জানান।
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, বিশ্বের কাছে পেয়েছি সম্মান। যে কোনো কিছু অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। আমাদের স্বাধীনতা রক্ষা করতে কাজ করে যেতে হবে। সত্যিকার অর্থেই দেশকে ভালোবাসতে হবে। শুধু দেশকে ভালোবাসি এই কথা কেবল মুখে বললে হবে না। দেশপ্রেমকে অনুভব করে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। আপনাদের সন্তানদেরকে সঠিক ইতিহাস জানতে দিন। অন্তত বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ শুনতে দিলেও আপনার সন্তান বাঙালি সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। তারা সোনার বাংলা গঠনে কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, আমরা একাত্তরে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছি। আমরা পারবো, পারবোই। আমাদের সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আমাদের দৃঢ়তা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেই।
তিনি আরো বলেন, বিজয় দিবসের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ৩০ লক্ষ শহীদদের রক্তের বিনিময়ে সূচিত হয় মহান বিজয় গৌরবময় অধ্যায়, আসে আমাদের কাঙ্খিত বিজয়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন বাঙালির অধিকার আদায়ের যে পটভূমি রচনা করে, তা ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং টালমাটাল ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথ্যান ফেরিয়ে প্রবল আকাঙ্খায় ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার নতুন সূর্য। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পৃথিবীর বুকে রচিত হয় নতুন পতাকা, প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ নামে নতুন একটি মানচিত্র। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতাকে অপশক্তি নশ্বাৎ করতে চেয়েছিল। বিশ্বদারে বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দিতে চাইছিল না। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন করে দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। ভীষণ ২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হয়েছে। এখন আর বাংলাদেশকে বর্হিবিশ্বের কাছে হাত পাততে হয় না বরং বাংলাদেশ থেকে খাদ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছে। এভাবে বুঝা যায়, বাংলাদেশ অনেক উন্নতি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচে’ গৌরবদীপ্ত অধ্যায় রচিত হয়েছে ডিসেম্বরে। তাই প্রতি বছর ডিসেম্বরে পা দিয়ে সবাই আমরা অনুভব করি শক্ত মাটির স্পর্শ এবং অধিকার আদায় হওয়ার আত্মবিশ্বাস। মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিলো মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নিশ্চয়তা বিধান ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে একটি পতাকা, স্বাধীন ভূ-খ- অর্জনের জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণের জীবন-মরণ সংগ্রামের আত্মনিবেদন ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ ছিলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, পরাধীনতার, মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য যুদ্ধ। আলোচনা সভায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে ও জেলা কালচারাল অফিসার আবু সালেহ মোঃ আব্দুল্লাহ’র পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এম.এ ওয়াদুদ, জেলা প্রশাসক পতœী আক্তারী জামান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জীবন কানাই চক্রবর্তী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ হোসেন, প্রেসক্লাব সভাপতি বি.এম হান্নান, বিজয় মেলার চেয়ারম্যান অ্যাডঃ জহিরুল ইসলাম, বাবুরহাট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তপন সরকার, বিজয় মেলার মাঠ ও মঞ্চ ব্যবস্থাপনা পরিষদের আহ্বায়ক হারুন আল রশীদ, জেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডঃ রঞ্জিত রায় চৌধুরী প্রমুখ।
১৬ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিট মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য অঙ্গিকার পাদদেশে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। তোপধ্বনি শেষে অঙ্গীকার বেদীতে শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রাদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও পৌরসভা পূষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এমনিভাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি,  জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, সদর উপজেলা পরিষদ, চাঁদপুর প্রেসক্লাব, যুবলীগ, জেলা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শ্রমিকলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, বাসদ, গণফোরাম, বিএমএ, স্বাচিপ, ন্যাপ, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, সাহিত্য একাডেমী, কমিউনিস্ট পার্টি, জেলা আইনজীবী সমিতি, উদীচী, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁদপুর রোটারী ক্লাব, বিজয় মেলা, সাংস্কৃতিক চর্চা বাস্তবায়ন কেন্দ্র, চাঁসক ছাত্রলীগ, শহর ছাত্রলীগ, এলজিইডি, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, জাকের পার্টি, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, পুরাণবাজার কলেজ, জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সিডিএম, সংগীত নিকেতন, চাঁদপুরস্থ ফরিদগঞ্জ ফাউন্ডেশনসহ আরো অনেক রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন অঙ্গীকার পাদদেশে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এছাড়া অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও পরিবার-পরিজন নিয়ে এসে অঙ্গীকারে ফুল দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাতের আঁধার ভেদ করে অগণিত মানুষের পদচারণায় অঙ্গীকারের সামনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক মুখরিত হয়ে ওঠে। মানুষের ভীড় সামলাতে পুলিশ, বিএনসিসি ও স্কাউটস্ কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়।
    বিজয় দিবসে সকাল সাড়ে ৮টা চাঁদপুর স্টেডিয়ামে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের শারীরিক কসরত প্রদর্শন করে। অনুষ্ঠানে চাঁদপুরবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল। সকাল ১১টায় চাঁদপুর সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। একইভাবে চাঁদপুর পুলিশ লাইনে পুলিশ সুপার শামসুন্নাহারের আয়োজনে চাঁদপুর জেলায় কর্মরত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এমনিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসনের বিজয় দিবসের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর