শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
logo
চাঁদপুরে মাসব্যাপী বিজয় মেলা মঞ্চে স্মৃতিচারণে স্কোয়াড্রন লিডার (অবঃ) কাজী মফিজুল ইসলাম
বিমান বাহিনীতে ফিরে না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাই
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১০:০০:০০
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব
চাঁদপুর: ‘এসো মিলি মুক্তির মোহনায়’ শ্লোগানকে লালন করে গতকাল ১৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চাঁদপুর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা মঞ্চে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে প্রধান স্মৃতিচারকের বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা স্কোয়াড্রন লিডার (অবঃ) কাজী মফিজুল ইসলাম। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, প্রথমে স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল শহীদদের। সে সাথে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ১৯৭১ সালে যাদের রক্ত ও ঘামে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশ পেয়েছি সে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেপথ্য ও পরোক্ষভাবে বুদ্ধি দিয়ে সহযোগিতা করে গেছেন সে সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের, যারা দেশপ্রেমের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তাঁদের প্রতি।
    তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে নির্বাচন হয় তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে পাকিস্তানিরা বাঙ্গালীদের ক্ষমতা দেয়নি। সেসময় আমি বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলাম। ছুটি নিয়ে দেশে আসি। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিলে আমি আর বিমান বাহিনীতে অর্থাৎ পাকিস্তানে ফিরে যাইনি। চলে যাই মুক্তিযুদ্ধে। পেয়ে যাই ১০/১২ জন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। তাদের পেয়ে বুকে সাহস বেড়ে যায়। তরুণদের বুঝাতে সক্ষম হই, যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। প্রথমে আমরা যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখি। তখন এক হৃদয় বিদারক ঘটনার সৃষ্টি হয়। ছাত্র, কৃষকসহ সবাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়। আমি তাদের বুঝালাম আগে আমরা যুদ্ধে যাই। তারপর তোমাদের নিয়ে যাবো। শাহরাস্তি থেকে পায়ে হেঁটে কচুয়া দিয়ে রওনা হই ভারতের উদ্দেশ্যে। ৭/৮ দিন হাঁটার পর ভারতে পৌঁছি। বৃষ্টির কারণে নবাবপুরে ৪দিন আমরা আটকা থাকি। সেখানে মা-বোনরা আমদের রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলো। বৃষ্টি কমে গেলে ভারতের উদ্দেশ্যে যখন ঐ স্থান ত্যাগ করি তখন মা বোনরা কান্নাকাটি করতে থাকে।
    তিনি আরো বলেন, আমরা ভারতের কাছাকাছি গেলে সেখানে কেউ আমাদের আশ্রয় দেয়নি, এক কৃষক আশ্রয় দেওয়ার জন্য আমাদের এক বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে এক ছাত্রকে পেলাম সেই ছাত্র ভাত আর ডাল নিয়ে এলো আমরা তা তৃপ্তিসহকারে খেলাম। পাকিস্তানিরা জানতে পারলে বাড়িটি পুড়িয়ে দেবে ভেবে সেখান থেকে চলে গেলাম। কংস নগর দিয়ে নদী পার হয়ে বক্সনগরে চলে যাই। অনেক হাঁটার পর আমরা নবীনগর ক্যাম্পে পৌঁছি। সেখানে গিয়ে চাঁদপুরের অনেকের সাথে দেখা হয়। যখন আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নেই তখন আমার ভাবি আমার ব্যাগের মধ্যে চিড়া আর গুর দিয়ে দেয়। যখন মনে পড়ে তখনি কান্নায় বুক ফেটে যায়। একদিন আমি ক্যাম্প থেকে ছুটি নিয়ে যাদেরকে রেখে গিয়েছিলাম তাদের নেয়ার জন্য দেশে আসি। হাজীগঞ্জের জগন্নাতপুরে এসে আশ্রয় নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবকদের সংঘবদ্ধ করি। মরহুম আব্দুল করিম পাটওয়ারী ৭০জন মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে নৌকাযোগে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। গুণবতি রেলস্টেশন এলাকায় রাজাকার সিদ্দিকের সহায়তায় নদী পার হয়ে ভারতে চলে যাই।    
    তিনি বলেন, বাঙালিরা বীরের জাতি, তারা কখনো কারো কাছে মাথা নত করে না। তাদেরকে দমিয়ে রাখা যায়নি। তার প্রমাণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। স্বাধীনতার ইতিহাস একদিনের নয়, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হয়েছেন একদিনে নয়। এর জন্যে অনেক সংগ্রাম-আন্দোলন করতে হয়েছে বাঙালিকে। ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। মূলত ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনই স্বাধীনতার বীজ বপণ হয়েছিলো। এ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস শুনতে ও পড়তে হবে। বুদ্ধি, মনোবল ও হৃদয় দিয়ে দেশকে ভালোবাসতে হবে।
    সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার আঃ মান্নান মিয়াজীর সভাপতিত্বে এবং সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহকারী কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ছানাউল্যাহ খানের পরিচালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন শাহরাস্তির বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম, কাজী রফিকুল ইসলাম।
    এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিজয় মেলার স্মৃতিচারণ পরিষদের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা মহসীন পাঠান, সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব আলী মাস্টার, শাহরাস্তির বীর মুক্তিযোদ্ধা শামছুল আলম, হাজীগঞ্জের আবুল কালাম আজাদ, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক আমেরিকার প্রবাসী কাজী সফিকুল ইসলাম।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর