শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
logo
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা মঞ্চে প্রথম দিনের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে ফরিদগঞ্জ উপজেলা কমান্ডার আবুল খায়ের পাটোয়ারী
আমাদের স্বাধীনতা ৭৫-এর ১৫ আগস্ট হারিয়ে গিয়েছিলো
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১২:৪৯:৪০
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব
চাঁদপুর: চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা গৌরবের ২৫ বছর রজতজয়ন্তী উৎসবের পঞ্চম দিনে স্মৃতিচারণ পরিষদের ব্যবস্থাপনায় প্রথম স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে স্মৃতিচারণ করেন ফরিদগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাবেক কমান্ডার আবুল খায়ের পাটোয়ারী।
    চাঁদপুর সদর থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সামছুল আলম মোঃ আবুল কালাম চিশতীর সভাপতিত্বে ও স্মৃতিচারণ পরিষদের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা মহসীন পাঠানের পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল খায়ের পাটোয়ারী বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন স্বাধীনতা অর্জন করা সহজ কিন্তু তা রক্ষা করা কঠিন। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু সে স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়েছিলো ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর সকল স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স হয়ে গিয়েছে এটা ভাবলে চলবে না। আমি বলি, মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স বলতে কোনো কিছু নেই। এখনো তাদের শরীরে শক্তি রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমরা অনেক স্থানে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত ছিলাম। সেজন্যে কোমড় সমান কবর খুঁড়ে রেখেছিলাম। ৯ মাসে অনেক সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের অস্ত্রের রেঞ্জ তেমন একটা ছিলো না। ভারত থেকে অস্ত্র দেরিতে আসায় আমরা থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে যুদ্ধে প্রথম অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। পরবর্তীতে ভারত থেকে অস্ত্র এসে পৌঁছলে তা দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করি। আমরা সর্বপ্রথম নিজস্ব থানার অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের জন্যে ট্রেনিং শুরু করি। পরে সে অস্ত্র দিয়েই শত্রু মোকাবেলায় অংশ নেই। তিনি আরো বলেন, প্রথমে ইচুলী ঘাটের উত্তর পাশে একটি বাঁশ ঝাড়ে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার সাথে ছিলো আমিনুল হক মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার কোরের সৈনিক আবু তাহের, আবু তাহের পাটোয়ারী, আবদুল মতিন পাটোয়ারী, সামাদ পাটোয়ারী, বেঙ্গল রেজিমেন্টের আবুল হোসেন। আমি ছিলাম শট সার্ভিস কোরের সদস্য। সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ছিলেন আবদুর রব বিএসসি, সেক্রেটারী আমিনুল হক মাস্টার, আনসার ট্রেইনার ফজলুল হকসহ আমরা অপেক্ষা করছিলাম। পাকিস্তানী আর্মিরা হেলিকপ্টার নিয়ে আসতো আবার ফিরে যেতো। ইচুলীতে থ্রি নট থ্রি ১০টি বন্দুক আর ১২৫ রাউন্ড গুলি নিয়ে আমরা অবস্থান করি। শত্রু মোকাবেলার জন্যে এ অস্ত্র আর গোলাবারুদ আমাদের রেঞ্জে ছিলো না। ৭/৮ দিন এখানেই আমাদের থাকতে হয়। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেলিটারী এসে সিলিং করে আবার চলে যেতো। গাছতলা ডাকাতিয়া নদী নৌকায় পারি দিয়ে আমরা অপর পাড়ে অবস্থান নেই। এখান থেকে চলে যাই ফরিদগঞ্জের এ আর পাইলট হাই স্কুল মাঠে। সেখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে আবার ট্রেনিং শুরু করি। আর সে ট্রেনিং ছিলো পজিশন ট্রেনিং। তার জন্যে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে বাঁশির লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। শক্তিশালী অস্ত্র হাতে টার্গেট দিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ দেই। পরবর্তীতে শিল্পী হাসেম খানের পৈত্রিক পরিত্যক্ত ভবনে আমরা একটি কন্ট্রোল রুম চালু করি। এখান থেকে জানতে পারি কলন্তর গাজীর বাড়িতে ২ জন পাঞ্জাবীকে আটক রেখেছে। ৭/৮ দিন রাখার পর তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ফরিদগঞ্জ বাজারে ওই ২ জন আবার মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। আমিনুল হক মাস্টার নির্দেশ দেন তাদেরকে চাঁদপুর কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসতে। আমি ও ফজলু তাদেরকে নিয়ে রিক্সাযোগে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। বাঘড়া বাজারের পশ্চিম পাশে গোলপাতার একটি ছাউনি দেয়া দোকানে এসে দাঁড়াই। এখানেই তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলি। ওয়াপদার একটি জিপ গাড়ি নিয়ে আমরা মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আসম আবদুর রবকে বেলুনিয়ায় পার করে দেই। আউশা পাড়া ও কানকিরির হাটে আমরা শত্রুসেনার সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হই। আর সেখানে আমাদের সাথে ছিলেন শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন। কানকিরির হাটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ভাসানী। এভাবেই আমরা ৯ মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করি।
    বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এমএ ওয়াদুদ বলেন, বাল্যবিয়ে, সন্ত্রাস ও নারী নির্যাতন আর চলতে দেয়া যাবে না। এসব বন্ধ করতে হবে। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের এসব বিষয়ে এখনো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা বাঙালিরা কোনো বাঙালিকে হত্যা করিনি, শত্রুদের হত্যা করেছি। তিনি আরো বলেন, জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সকল দিক থেকে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ক্ষমতা বিতাড়িতরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ থেকে এ হাসান আলীর মাঠটি আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ব্যবহার শুরু করি। চাঁদপুরের বীর সৈনিকরা এবি সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটি বাহিনী গঠন করে এখানে প্রশিক্ষণ শুরু করে। ৭ এপ্রিল পাকিস্তানীরা যুদ্ধ বিমান নিয়ে চাঁদপুরে প্রবেশ করে বোমা নিক্ষেপ শুরু করে। তাতে পুরাণবাজারের পাটের গুদামে আগুন ধরে যায়। এমনকি একজন বৃদ্ধ নিহত হয়। তখন আমাদের কাছে ভারি অস্ত্র ছিলো না। তারপরও শত্রু সেনাদের প্রতিহত করতে আমরা চেষ্টা করি। সেদিন বিকেলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাযোয়া বাহিনী চাঁদপুরের অভিমুখে রওনা করে। পথিমধ্যে তারা অনেক ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে টেকনিক্যাল স্কুলে এসে ক্যাম্প তৈরি করে। এমনিভাবে পাকিস্তানীরা গুলি করে চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করে। বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ইসমাইল বলান্টিয়ারকে গুলি করে হত্যা করে। ৩ এপ্রিল চাঁদপুর শহরের ট্রাক রোড পোদ্দার বাড়িতে শত্রুর মোকাবেলায় বোমা বানাতে গিয়ে কালাম, খালেক, সুশীল, শংকর প্রথম শহীদ হন। এভাবেই আমরা যুদ্ধ করে দেশমাতৃকা স্বাধীনতা এনে দেই।
    এ সময় আরো বক্তব্য রাখেন হাজীগঞ্জ উপজেলার সাবেক কমান্ডার মোঃ আবু তাহের। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও বিজয় মেলার স্মৃতিচারণ পরিষদের সদস্য সচিব মোঃ ইয়াকুব আলী মাস্টার।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর