সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০
logo
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা ॥ এ বছর রজত জয়ন্তী
১ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শুরু হচ্ছে
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর, ২০১৬ ১১:৩৬:৩৪
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব
চাঁদপুর: চাঁদপুর জেলাবাসীর প্রাণের উৎসব হিসেবে খ্যাত মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা। এ বছর বিজয় মেলার রজত জয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিজয় মেলার কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়ে আসছে। মূলতঃ ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর তৎকালীন চাঁদপুর মহকুমা হানাদার মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সে দিবসটিকে ঘিরে চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের সুধিজনের সমন্বয়ে এ মেলার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। এমনকি চাঁদপুরের স্থানীয় সাংসদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেলার কর্মকাণ্ডের সাথে একাত্মতা পোষণ করে প্রয়োজনীয় সকল সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে আসছেন।
যার প্রেক্ষিতে চাঁদপুরের সুযোগ্য জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুস সবুর মণ্ডলের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা ব্র্যান্ডিং হিসেবে দ্বিতীয় স্থানের জায়গা করে নিয়েছে। চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় রয়েছে অনেক ঐতিহ্য ও সুনাম। অসামাজিক কর্মকাণ্ড বা কোনো লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে বিজয় মেলার উদ্যোক্তা ও কর্মকর্তারা এটিকে বাংলাদেশের মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। অথচ, ১৯৯২ সালে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার পাশাপাশি চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা বা চাঁদপুরের আদলে দেশের বিভিন্ন জেলায় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা শুরু করলেও তা আর শেষ করতে পারেনি। এর পেছনের কারণ ছিলো, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার নামে অসামাজিক কর্মকাণ্ড (যেমন: জুয়া, পুতুল নাচে জীবন্ত পুতুল দিয়ে নাচানো, চমক লটারীর নামে মানুষের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া)।
কিন্তু চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত বিজয় মেলা এ ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পেরেছে। ১৯৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার শুরুর বছরটি ছিলো অনেকের কাছে স্মরণীয়। মাত্র ৮ দিনের জন্য এ মেলার কর্মকাণ্ড সে বছর পরিচালিত হয়। কিন্তু ১৯৯৩ সাল থেকে চাঁদপুর জেলাবাসীর আন্তরিক সহযোগিতায় এবং তাদের গ্রহণযোগ্যতার কারণে বিজয় মেলার কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি ঘটে। টানা মাসব্যাপী বিজয় মেলা ধারাবাহিকভাবে শুরু এবং শেষ হয়ে আসছে। চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার প্রধান আকর্ষণ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ। স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সংগঠকরা চাঁদপুরের বিজয় মেলা মঞ্চে তাদের লৌমহর্ষক ’৭১-এর স্মৃতিচারণ করে গেছেন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার মাসব্যাপি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রদর্শনী স্টল ও চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত পোশাক থেকে শুরু করে তাদের মূল্যবান ও দুর্লভ দালিলিক প্রমাণ প্রদর্শনী। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী ভয়ঙ্কর বন্যার কারণে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্লভ দালিলিক প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা মাঠে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের সমাগম ঘটে থাকে। এরা শুধু চাঁদপুর জেলার নয়; পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা ও শরীয়তপুর জেলা থেকে আসা মানুষজনও রয়েছে। এরা দীর্ঘ ১১ মাস অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে ডিসেম্বর মাসের জন্যে। ডিসেম্বর মাস আসলেই শিশু-কিশোরদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা মাঠে পদচারণা দিয়ে থাকেন। এ যেনো তাদের পরিবারের রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে পরিণত হয়েছে। শিশুরা মনের আনন্দে বিজয় মেলা মাঠ পরিভ্রমণ শেষে তাদের বিনোদনের মেরি ঘোড়া, চর্ককা ও পুতুল নাচে ভিড় জমায়।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বর মাস চাঁদপুর শহর যেনো উৎসব নগরীতে পরিণত হয়। এ বছর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা গৌরবের ২৫ বছর (রজত জয়ন্তী)। সেজন্যই এ বছর ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্ত দিবস থেকে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পর্যন্ত চাঁদপুরে লেকের উপর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য অঙ্গীকার, চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মোলহেডে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক ভাস্কর্য রক্তধারা, চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে চাঁদপুর পৌরসভা কর্তৃক নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ভাস্কর্য শপথ এবং স্টেডিয়ামের ভিআইপি প্যাভিলিয়নের সামনে নির্মিত ইলিশ চত্ত্বর ও ১৯৭১ সালে চাঁদপুর প্রথম শহীদ কালাম-খালেক-সুশীল-শঙ্কর স্মৃতিস্মারক ভাস্কর্য মুক্তিসৌধ এবং ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত চাঁদপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণকে আলোকসজ্জা ও লাল-সবুজের পতাকা দ্বারা সজ্জিতকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্তদিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং মুক্ত দিবসের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে ৩০ লাখ শহীদদের স্মরণে মুক্তিযুদ্ধের স্মারকভাস্কর্য অঙ্গীকার পাদদেশে মোমবাতি প্রজ্জ্বলনসহ ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়; এ বছর বিগত ২৪ বছর ধরে বিজয় মেলা মঞ্চে স্মৃতিচারণের জন্যে আসা দেশবরেণ্য মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রীবর্গসহ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিদের আগমণের স্বচ্চিত্র তথ্য সংযোজন করে ২৫ বছরের বিজয় মেলার অর্জন ও দালিলিক প্রমাণসহ স্যুভিনর ও ক্রোড়পত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গৌরবের ২৫ বছর রজত জয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে বিজয় মেলার উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতাদের সংবর্ধনা প্রদান করা হবে। এছাড়া চাঁদপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারী মৃত বা জীবিত ২৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ সন্মাননা প্রদান করা হবে। এ বছর জাতীয় পর্যায়ে থাকা তারকা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত বিজয় মেলায় এনে স্মৃতিচারণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 
শুধু তাই নয়; মাসব্যাপি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে খ্যাতনামা নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলাকে সুন্দর ও সফল করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উপদেষ্টা পর্ষদ, স্টিয়ারিং কমিটি, উদ্যাপন পরিষদ ও বেশক’টি উপ-পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এ বছর বিজয় মেলার সকল আয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লক্ষ্যে অর্থ উপ-পরিষদের মাধ্যমে আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সকল লেন-দেন ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। যা ইতিমধ্যে বিজয় মেলার সর্বোচ্চ ফোরাম স্টিয়ারিং কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
১৯৯২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার কর্মকাণ্ড যারা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন। এরা হচ্ছেন ঃ ১৯৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জাবেদের মাতা মোসাম্মৎ জুলেখা খাতুন; ১৯৯৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম আবু জাফর মাঈনুদ্দিনের স্ত্রী মিসেস জেবুন্নাহার জাফর; ১৯৯৪ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের মাতা সৈয়দের নেছা; ১৯৯৫ সালে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মিসেস আয়েশা বেগম; ১৯৯৬ সালে যৌথভাবে শহীদ জয়নালে আবেদীনের মাতা মেহেরজান বানু ও শহীদ সলিম উদ্দিন শেখের মাতা কুলসুমা বেগম; ১৯৯৭ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম ফ্লা: লে: (অবঃ) এ.বি সিদ্দিক; ১৯৯৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক পানি সম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক; ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মরহুম অ্যাডঃ আব্দুল আউয়ালের স্ত্রী মিসেস শিরিন আউয়াল; ২০০০ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এম.এ ওয়াদুদ; ২০০১ সালে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী লে: কর্নেল (অবঃ) আকবর হোসেন বীর প্রতিক; ২০০২ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মেজর (অবঃ) মোঃ কামরুল ইসলাম এমপি; ২০০৩ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিজয় মেলার প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক মরহুম ফজলুল হক তালুকদার; ২০০৪ সালে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান সিরাজ; ২০০৫ সালে জঙ্গি তৎপরতার কারণে বিজয় মেলার কাজ সম্পন্ন হওয়া সত্বেও মেলার কর্মকাণ্ড স্থগিত রাখা হয়; ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আইনজীবি মরহুম আবুল ফজল; ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার হোসাইন জামিল; ২০০৮ সালে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আ.ক.ম. শাহীদুর রহমান; ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফ্লা: লে: (অবঃ) মরহুম এ.বি. সিদ্দিক; ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নুরুল হক বাচ্চু মিয়াজী; ২০১১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডঃ সিরাজুল ইসলামের সহধর্মিণী ছায়েরা খাতুন; ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৮নং সেক্টর কমান্ডার লে: কর্নেল (অবঃ) আবু ওচমান চৌধুরী; ২০১৩ সালে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি; ২০১৪ সালে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি; ২০১৫ সালে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর