মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯
logo
আমেরিকা প্রবাসী পল্লবী চৌধুরীর ২৫ হাজার টাকা অনুদান
হাইমচরের শিশু গৃহকর্মীকে অমানসিক নির্যাতন
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৩:৫৪:৫৪
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব ডেস্ক

চাঁদপুর: চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায় ৯ বছরের ছোট্ট এক শিশু অভাবের তাড়নায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিল ঢাকার গাজীপুরে। ঈদে বাড়ি যেতে তার খুব মন চাইতো। গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীর কাছে এ নিয়ে আবদার করতো।
    আর এ আবদারের ‘অপরাধে’ তাকে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও ক্ষত নিয়ে সে এখন চাঁদপুরের ২শ’ ৫০ শয্যা সরকারি জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে।
    হাইমচর থানার পুলিশ ও শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ সন্তানকে রেখে শিশুটির বাবা অন্যত্র চলে গেছেন। পরে মা ফিরোজা বেগম শিশুটিকে মানুষের বাসায় কাজের জন্য দেন।
    ১ বছর আগে হাইমচরের মোস্তফা সরদার নামের একজন শিশুটিকে গাজীপুরের জয়দেবপুরে বিমান বন্দরের কর্মকর্তা ওমর ফারুক ও শিক্ষিকা মনি বেগম দম্পতির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে নিয়ে যান।
    সম্প্রতি শিশুটি বাড়ি যাওয়ার জন্য গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীর কাছে আবদার করে। এ কারণে তারা শিশুটিকে প্রচ- মারধর ও নির্যাতন করে।
    শিশুটি চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নয়ানী গ্রামের মোঃ মন্টু মাতাব্বরের ৯ বছরের কন্যা গৃহকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌস।
    ঢাকার গাজীপুর বিমানবন্দরে চাকুরীরত মোঃ ওমর ফারুকের বাসায় ঝিয়ের কাজ করতো ৯ বছরের শিশু। বছরজুড়ে বর্বর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দিয়েছে তার পুরো শরীর।
    গত ১৪ সেপ্টম্বর রাতেই এ ঘটনার সাথে জড়িত দালাল মেয়ের খালু মোস্তফা সরদারকে আটক করেছে হাইমচর থানা পুলিশ। শিশু জান্নাতুল ফেরদৌসকে গত বছর মোস্তফা সরদার জোরপূর্বক মেয়ের মা ফিরোজা বেগমের কাছ থেকে ঢাকা গাজীপুরে বসবাসরত তার শালিকা মনি বেগমের বাসায় কাজের জন্য নিয়ে যায়।
    কাজে থাকা অবস্থায় অসহায় ৯ বছরের শিশু জান্নাতুল ফেরদৌসের উপর গৃহকর্তা ওমর ফারুক ও তার স্ত্রী মনি বেগম নানা অজুহাতে শরীরে ইলেক্ট্রিক সর্ট দিয়ে অমানসিক নির্যাতন চালাতো। মেয়েটির পিঠে ক্ষত চিহ্ন ছাড়াও মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
    গৃহকর্মীর উপর নির্যাতনের খবর পেয়ে চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার, সির্ভিল সার্জন ডাঃ রথীন্দ্রনাথ মজুমদার, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ নুর হোসেন পাটওয়ারী চিকিৎসাধীন শিশুটিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখতে যান এবং তার উন্নত চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার শিশুটির এ অবস্থা দেখতে পেয়ে তিনি নিজেইে হাইমচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের পেইং বেডে এনে ভর্তি করেন। তিনি নরপশুদের আটকের জন্যে হাইমচর থানা পুলিশ ও চাঁদপুরের পুলিশদের নির্দেশ দেন।
    নির্দেশ পেয়ে চাঁদপুর পুলিশ ও জয়দেবপুরের থানা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধা ৭টায় জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দরের কর্মকর্তা শিশু নির্যাতনকারী মোঃ ওমর ফারুককে আটক করে। এর পূর্বে স্থানীয় জনতা শিশু জান্নাতকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা থেকে হাইমচর নিয়ে আসা মোস্তফা সরদারকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
    জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল বলেন, এ শিশুটি আমাদের সন্তানও হতে পারতো। আজ শিশুটির উপর যে অমানবিক ও অমানসিক নির্যাতন করা হয়েছে তা শিশুটির প্রতি তাকালেই শরীর শিউরে উঠে। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিশুটির চিকিৎসার জন্য যা করণীয় আমরা তা করে যাবো। এ অবুঝ শিশুটি যেনো সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারে।
    গতকাল ১৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার শিশু জান্নাতের আহত ছবিটি তথ্য প্রযুক্তি ও মিডিয়ায় দেখতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান ও সচিব প্রণব চৌধুরীর জেষ্ঠ্যকণ্যা আমেরিকা প্রবাসী পল্লবী চৌধুরী মর্মাহত ও দুঃখ প্রকাশ করে তার ব্যক্তিগত তহবিল হতে ২৫ হাজার টাকা জান্নাতের চিকিৎসার জন্য জেলা প্রশাসক ও তার পতœী অধ্যাপিকা আকতারি জামান দুপুর ১২টায় হাসপাতালে তাকে দেখতে গিয়ে ওই টাকা প্রদান করেন।
    পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার জানান, পিতা হারা শিশু জান্নাতকে যারা নির্যাতন করেছে আমরা তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার কার্য চালিয়ে যাবো। যেনো আর কোনো গৃহকর্তা-গৃহকত্রী গৃহপরিচারিকা শিশুদের উপর এ ধরনের অমানবিক নির্যাতন করতে না পারে।
    নির্যাতিত শিশুর মা’ ফিরোজা বেগম বলেন, ‘আমি বড় অসহায় আমার স্বামী আমাদের কোন খোঁজ খবর নেয় না। সে থেকেও নেই। আমার বৃদ্ধ মা’ ভিক্ষা করে আমার ও সন্তানদের দু’বেলা খাবার যোগান দেন। আমার এ অসহায় অবস্থা দেখে মোস্তফা সরদার আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দেখিয়ে আমার মেয়ে ভালো থাকবে বলে ঢাকায় তার শ্যালিকার বাসায় নিয়ে যায়। এক বছর ধরে আমি আমার মেয়ের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলেও তারা যোগাযোগ করতে দেয়নি।’
    তিনি আরো জানান, ‘গত ১৪ সেপ্টেম্বর বুধবার সন্ধায় মোস্তফা সরদার আমার মেয়েকে বাড়ির সামনে রেখে চলে যায়।’
    এ ব্যাপারে মোস্তফা সরদার জানায়, ‘আমি জান্নাতুল ফেরদৌসকে আমার শ্যালিকার বাসায় কাজে নিয়ে দিয়ে ছিলাম। তারা প্রথমে ভালোই ছিলো। হঠাৎ করে আমার শ্যালিকার টাকা পয়সা হওয়ায় তার অহংকার বেড়ে যায়। তার অহংকারে এ শিশুটির ওপর অমানসিকভাবে নির্যাতন চালায়। শ্যালিকা মনি আমাকে খবর দিয়ে আহত অবস্থায় শিশুটিকে আমার কাছে দিয়ে দেয়। আমি ৭ দিন ঢাকাতে তার প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা করে গতকাল (১৪ সেপ্টেম্বর) তাদের বাসায় পৌঁছে দেই।’
    নির্যাতিত শিশুর চিকিৎসক হাইমচর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাঃ দীপন দে জানান, ‘শিশুটির অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
    পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে মোস্তফা সরদার শিশুটিকে ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে গাজীপুরের ওই বাড়ি থেকে হাইমচরে নিয়ে আসেন। পরে শিশুটির অবস্থা দেখে স্থানীয় লোকজন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। আর মোস্তফা সরদারকে পুলিশে সোপর্দ করে।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর