বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯
logo
ঢাকা মেডিকেলে অগি্নদগ্ধদের পাশে ডাঃ দীপু মনি
চাঁদপুর শহরে জ্বালানি তেলের দোকানে অগ্নিকান্ডে ১ জনের মৃত্যু আরো ২ জন মৃত্যুপথযাত্রী
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১২:০৪:৪০
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব ডেস্ক

চাঁদপুর: চাঁদপুর শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে যমুনা অয়েল এজেন্সী নামে একটি জ্বালানি তেলের দোকানে (গোডাউন) গত বুধবার দিবাগত রাতে যে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তাতে অগি্নদগ্ধ রায়হান (২৩) মারা গেছেন। গতকাল রাত প্রায় ৮টায় ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে রায়হান মারা যান। তিনি ওই দোকানের মালিক মিজানের ছেলে। তার শরীরের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পুড়ে যায়। এ দিকে এ অগি্নকা- দুর্ঘটনা না কি নাশকতা সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এলাকাবাসীসহ শহরবাসীর কাছে। আর এ জন্যে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ওই দুর্ঘটনায় অগি্নদগ্ধ পাঁচজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হলে রায়হান গত রাতে মারা যান। আরো ২ জন বলতে গেলে মৃত্যুপথযাত্রী। এ ২ জন হচ্ছেন ওই দোকানের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ (২১) ও তেলের লরির হেলপার মাসুদ (২৮)। এদের শরীরের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ পুড়ে গেছে। আর অগি্নদগ্ধ অপর দু'জন হচ্ছেন দোকানের মালিক মিজানুর রহমান (৫০) ও তেলের লরির চালক বাদশা (৫০)। এদের শরীরের ৪০ থেকে ৫০ ভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া আগুনে পোড়া গেছেন বেলাল ভূঁইয়া ও খোকন (৩০)। চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ পাঁচ জনকে ঘটনার পর পরই চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। আর আগুন নেভাতে গিয়ে অগি্নদগ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন চাঁদপুর ফায়ার সার্ভিস উত্তর ইউনিটের ফায়ারম্যান খোকন মজুমদার (৩৫)। তিনি চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ দিকে ভয়াবহ এ অগি্নকা- এবং অগি্নদগ্ধদের খবর জানতে পেরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ দীপু মনি ঢাকা মেডিকেলে ছুটে যান। তিনি অগি্নদগ্ধ পাঁচ জনের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং বার্ন ইউনিটের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাদের সুচিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি এ দুর্ঘটনার জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানান।
৩১ আগস্ট বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে চাঁদপুর শহরের বঙ্গবন্ধু রোডস্থ সেলিনা ভিলার সামনে পদ্মা অয়েল কোম্পানীর একটি তেলের লরিতে প্রথমে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ লরির আগুনই মুহূর্তের মধ্যে সেলিনা ভিলার নিচতলায় যমুনা অয়েল কোম্পানীর তেলের দোকান ও গোডাউনে ছড়িয়ে পড়ে। ফরিদগঞ্জের মিজানুর রহমান হচ্ছেন এর ডিলার। তিনিই তিন তলা বিশিষ্ট নির্মাণাধীন সেলিনা ভিলার নিচতলার পুরো ইউনিট ভাড়া নেন। ভবন মালিকের ছেলে চাঁদপুর শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সোহেল রানা জানান, তাদের বাসার নিচতলার পুরোটা মিজানুর রহমান ভাড়া নেন। নিচতলার এক ইউনিটে মিজানুর রহমানের ব্যবসার কাজে নিয়োজিত পিকআপ গাড়ি থাকতো আর আরেক ইউনিটে সয়াবিন তেল, জ্বালানি তেল, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান ছিলো। এখানে তিনি জ্বালানি তেল ড্রাম ভর্তি করে রাখতেন। আর এখান থেকে নিয়ে রাস্তার দক্ষিণ পাশে তারাই আরেকটি দোকানে খুচরা বিক্রি করতেন। সোহেল রানা জানান, তাদের বাড়ির দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশের ইউনিটে মিজানুর রহমান সপরিবারে থাকেন। আর পূর্ব পাশের ইউনিটে তার এক আত্মীয় থাকেন। তৃতীয় তলা নির্মাণাধীন। সোহেলরা ওই বাসায় থাকেন না। ঘটনার রাতে খবর পাওয়ার সাথে সাথে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। দাহ্য পদার্থের এ ভয়াবহ আগুনে তাদের পুরো ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত পদ্মা অয়েল কোম্পানির তেলের লরি থেকে মিজানের তেলের গোডাউনে তেল আনলোড করর সময় যে ঘটেছে তা অনেকটা নিশ্চিত। কারণ, তেলের লরিটি মিজানের দোকানের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলো এবং মিজান, তার ছেলে ও দোকানের কর্মচারীও তখন দোকানে ছিলো। যারা অগি্নদগ্ধ হয়ে বর্তমানে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।
এখন এই অগি্নকা- কি দুর্ঘটনা না কি নাশকতা তা-ই এখন ভাবছে এলাকাবাসী। এলাকাবাসী কয়েকজন জানান, গত ক'দিন আগে মিজানুর রহমানের মেয়ের বিবাহ নিয়ে একটি সমস্যা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবেই এ বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ে মজলিশেই ওই বিয়ে ভেঙ্গে যায়। এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমাও হয়েছে। এলাকার কেউ কেউ ধারণা করছেন, ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কেউ হয়তো সুযোগ বুঝে এ নাশকতা ঘটাতে পারে। আবার কেউ বলছে, এটি দুর্ঘটনাও হতে পারে।
তেলের লরিতে আগুন লাগার পাঁচ মিনিটের মাথায় ঘটনাস্থালে ছুটে আসা পার্শ্ববর্তী ঘরের বাসিন্দা সংবাদকর্মী কবির মিজি জানান, তিনি তখন ঘরে বসে ভাত খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ শুনে তিনি ঘরে থেকে বেরিয়ে এসে দেখেন সেলিনা ভিলার সামনে তেলের লরিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মুহূর্তে আগুন মিজানের দোকানে ছড়িয়ে যায়। তখন শুধু আগুনের লেলিহান শিখা ও আগুনের কু-লীই দেখা যায়। এ অবস্থা দেখে কবির মিজি তখন শুধু 'আগুন আগুন' বলে দৌড়ে ঘরে গিয়ে তার স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে যান। শুধু কবির মিজি নয়, ওই এলাকার সব বাসা বাড়ি থেকেই মানুষজন ছুটতে থাকে। আর দুর্ঘটনা কবলিত ভবনটির দোতলার লোকজন ভবনের ছাদে উঠে যায়। সেখান থেকে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাদের মই দিয়ে এবং এলাকাবাসী রশি দিয়ে তাদের নিচে নামিয়ে আনে।
এদিকে ঘটনার ৮/১০ মিনিটের মাথায়ই চলে আসে ফায়ার সার্ভিস উত্তর ইউনিটের কর্মীরা। তারা আগুন নেভাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। কিন্তু আগুনের ব্যাপ্তি বাড়তে থাকায় ফায়ার সার্ভিস দক্ষিণ (পুরাণবাজার) ইউনিটকে খবর দেয়া হয়। তারাও ঘটনাস্থলে দ্রুত পেঁৗছে। পরে রাতে হাজীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস দলও ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভানোর কাজে লেগে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ওই তিনটি ইউনিট প্রায় আড়াই ঘণ্টা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে সর্বশেষ পানি ছিটানোর পাইপে বিশেষ কেমিকেল 'ফোম' দেয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে ওই ভবনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশে আতিকুর রহমান বাবুলের ঔষধের দোকান ও একটি সিমেন্টের দোকানও পুড়ে যায়। রাস্তার দক্ষিণ পাশে রেলের লেকের উপর মমিন বেপারীর মুদি দোকানও পুড়ে যায়। রাতেই খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক আঃ সবুর মন্ডল ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তিনি সেখানে অনেকক্ষণ অবস্থান করেন। এছাড়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ ওয়ালী উল্যাহ অলি তার পুলিশ বাহিনী নিয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সাথে কমিউনিটি পুলিশের অনেক সদস্যও ছিলেন। তারা নিরাপত্তার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে যান শিক্ষা সচিব মোঃ সোহরাব হোসেন, জেলা প্রশাসক মোঃ আব্দুস সবুর মন্ডল ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান। তাঁরা এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জেলা প্রশাসক এ দুর্ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। কমিটির অপর ২ সদস্য হচ্ছেন এএসপি (সদর সার্কেল) মোঃ নজরুল ইসলাম ও ফায়ার সার্ভিস উত্তর, চাঁদপুর-এর সহকারী পরিচালক।
এদিকে গতকাল দুপুরে মডেল থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মিজানুর রহমানের রাস্তার দক্ষিণ পাশের দোকানে থাকা সিসি ক্যামেরা জব্দ করে নিয়ে যায়। রাতে বিভিন্ন সূত্র থেকে শোনা গেছে, ওই সিসি ক্যামেরায় না কি এমন দৃশ্য আছে যে, তেলের লরিটিতে আগুন ধরার আগ মুহূর্তে পাশ দিয়ে একটি মোটরসাইকেল যায়। তবে পুরো বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে শহরবাসী আশা করছে।

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর