রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন
নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সব কাজ করলেও পর্দার দোহাই দিয়ে শুধু ভোটদান থেকে বিরত থাকছে
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল, ২০১৬ ১০:৫৫:৩৫
প্রিন্টঅ-অ+
চাঁদপুর ওয়েব ডেস্ক

চাঁদপুর; ফরিদগঞ্জ উপজেলার প্রবাসী অধ্যুষিত রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের তথ্য সেবা কেন্দ্রটি প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে। এর ইনচার্জ বেলায়েত হোসেন তার দুই সহযোগী নারী সদস্য নিয়ে এটি বেশ বছর পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ২০/২১জন সেবাগ্রহিতা আসেন এই কেন্দ্রে। এর মধ্যে ১২/১৩ জনই নারী। যারা ভিডিও কনফারেন্স, ই-মেইল পাঠানো, জন্ম নিবন্ধন সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজ করছেন এখান থেকে।
রোকেয়া বেগম ওই ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রতিটি নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করলেও ভোট দেন না। এই ইউপির নির্বাচিত নারী সদস্য জাহানারা বেগম। কিন্তু কোনো নারীর ভোটে নয়, শুধু পুরুষের ভোটেই তিনি নির্বাচিত ইউপি সদস্য। নিজেও ভোট দেন না। আর এজন্যে তার আক্ষেপের কোনো শেষ নেই। তারও আশা নারীরা এগিয়ে এসে ভোট দিয়ে জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করুক। কিন্তু সেই আশা তার এখনও পূরণ হয়নি। এবারও তা হবে কি? সেই জবাব তার জানা নেই। কারণ, প্রায় অর্ধশত বছর ধরেই এ ইউনিয়নের নারীরা তাদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করা থেকে বিরত রয়েছে।
শুধু একটি কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে এমন রীতি চলে আসছে এখানে। এখানকার নারীরা ধরেই নিয়েছেন তাদের ভোটের অধিকার নেই। কী সেই অপপ্রচার এ তথ্য জানাতে গিয়ে ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা সাবেক সেনা কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা রমিজ উদ্দিন বলেন, বহু বছর পূর্বে এ এলাকায় মহামারি আকারে কলেরা দেখা দেয়। তখন জৈনপুরের এক পীর সাহেব নারীদের পর্দার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেন। তখন থেকেই পর্দার মধ্যে রাখতে নারীদের ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়। পরবর্তীতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও এনজিও নারীদের ভোট প্রদানে উৎসাহ প্রদান করলেও স্থানীয় লোকজনের অসহযোগিতায় তা ভেস্তে যায়।
এদিকে শুধু ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকা ছাড়া বাকি সবকাজই এখানকার পুরুষদের থেকে এগিয়ে নারীরা। হাট-বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা সব ক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার হারেও এখানকার নারীরা এগিয়ে। অথচ পর্দার দোহাই দিয়ে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ ইউনিয়নের নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি সমানতালে সব কাজ করছে এ ক্ষেত্রে পর্দা বিনষ্ট হচ্ছে না, অথচ ভোট দিলে বেপর্দা হয়ে যাবে এটা কেমন কথা তা সচেতন মহলের বুঝে আসছে না।
২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই ইউনিয়নের কাউনিয়া ওয়াই এম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিন শতাধিক নারী লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রদান করলেও অন্য ৮টি কেন্দ্রে ২/১ জন ছাড়া দেখা যায়নি। বরং ভোট দিতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন এমন গুজব ছড়িয়ে পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচনে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বন্ধ করে দেয় এক শ্রেণির সুবিধাভোগী।
আগামী ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য ইউপি নির্বাচনে আবারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই এলাকার ৮ সহস্রাধিক নারী ভোটারের ভোট দেয়ার বিষয়টি। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, এবার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে এনে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী বলেন, নারীরা ভোট দিলে ভাল, না দিলে আরো ভাল। এটা কেমন কথা, প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, এখানকার জনপ্রতিনিধিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়া ও বাড়তি খরচ থেকে বাঁচতে কুসংস্কারকেই পীরের নির্দেশ বলে ফায়দা লুটছে।
এ ব্যাপারে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া চেয়ারম্যান প্রার্থী বিল্লাল হোসেন খান বলেন, একটি কুসংস্কারে বিশ্বাস করে নারীরা ভোটকেন্দ্রে যান না। তবে বর্তমানে নারী ভোটার নিয়ে নোংরা রাজনীতিও রয়েছে। তারা চান না নারীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক।
আওয়ামী লীগ মনোনীত দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসকান্দার মিয়া বলেন, নারীদের ভোট দানে বিরত থাকার বিষয়ে পীরের নিষেধ আছে কথাটি ঠিক নয়। পীর সাহেব নারীদের পর্দা করতে বলেছেন, ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেননি।
স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এমিলি বেগম বলেন, এই এলাকার নারীরা সবক্ষেত্রেই এগিয়ে কিন্তু তারা ভোট দিতে পারবেন না এটা মেনে নেয়া যায় না। তবে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের মা, দাদি-নানীরা ভোট দেন না। তাই ইচ্ছা থাকার পরও আমরা ভোট দিতে পারছি না।
ফরিদগঞ্জ মজিদিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক ড. একেএম মাহবুবুর রহমান বলেন, পর্দার মধ্যে থেকে ভোট দেয়া নারীদের জন্যে নিষেধ নেই। এখানকার নারীরা চাইলে পর্দার সাথে তাদের ভোট দিতে পারেন। কারণ ভোট যে কোনো নাগরিকের অধিকার।
ওই ইউনিয়নে অবস্থিত গৃদকালিন্দিয়া হাজেরা হাসমত কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ মোহেবুল্লাহ খান বলেন, অর্ধশত বছর পূর্বের পারিপাশ্বর্িক অবস্থা আর বর্তমান চিত্র এক নয়। সময়ের প্রয়োজনে সবকিছুই বদলেছে। পর্দাসীন থেকেই নারীরা আজ সকল কিছুতেই এগিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ভোট প্রদান করবে না কেনো।
এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নাল আবেদিন বলেন, বিগত বছরগুলোতেও নির্বাচনের আগে প্রশাসন নানাভাবে নারীদের ভোটদানে উৎসাহিত করে এসেছে। এবারও আমরা সে চেষ্টা করব। প্রয়োজনে আলেম ওলামা ও স্থানীয় মসজিদের ইমামদের কাজে লাগানো হবে।
 

চাঁদপুর : স্থানীয় সংবাদ এর আরো খবর