সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
logo
অভিজিৎ হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় শরীফ, সিসিটিভিতে চেহারা স্পষ্ট
প্রকাশ : ১৯ জুন, ২০১৬ ১৭:২৬:৪৮
প্রিন্টঅ-অ+
রাজধানী ওয়েব

ঢাকা : বিজ্ঞানলেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যার সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের শীর্ষ নেতা শরীফ ওরফে সাকিব ঘটনাস্থলে ছিল। ঘটনাস্থলের সিসিটিভির ফুটেজে তার চেহারা স্পষ্ট দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও মেড়াদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসীদের’ গোলাগুলিতে শরীফ নিহত হয়। এর আগে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ বললেও রোববার সকাল ১১টার দিকে পুলিশ পরিচয় প্রকাশ করে।
পুলিশ জানায়, নিহত ওই যুবকই আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের শীর্ষ সংগঠক শরীফ। ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক ও প্রকাশক হত্যায় আনসারুল্লাহর যে ছয় সদস্যকে ধরতে পুলিশ ১৮ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, শরীফ তাদের মধ্যে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’। তাকে ধরতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল পুলিশ।
রোববার (১৯ জুন) সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডিবি ডিসি (দক্ষিণ) মাশরুকুর রহমান খালিদ, ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, আনসারুল্লাহর ৬ সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক শরীফ। সে জাগৃতি প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন, তেজগাঁওয়ে ওয়াশিকুর রহমান বাবু, সূত্রাপুরে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নাজিমউদ্দিন সামাদ এবং কলাবাগানে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা ও সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও নাট্যকর্মী তনয় হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী।
এ ছাড়া যারা উল্লিখিতদের হত্যা করেছে, শরীফ তাদের রিক্রুট করে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে।
ডিবির উপ-কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালিদ বলেন, ‘শরীফ বিভিন্ন সময়ে সাকিব, সালেহ, আরিফ ও হাদি নাম ব্যবহার করে পরিচয় গোপন করে আসছিল। সে অভিজিৎ রায় হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়।’
গত ১৫ জুন একই দলের সদস্য সুমন হোসেন পাটোয়ারি ওরফে শিহাব ওরফে সাকিব ওরফে সাইফুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, শিহাবের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার রাতে রামপুরা বনশ্রী এলাকার জে ব্লকে অভিযান চালায় ডিবি।
ওই সময় একটি মোটরসাইকেলে ৩ জন দ্রুত গতিতে ডিবির চেকপোস্ট অতিক্রম করার সময় তাদের থামার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তারা নির্দেশ অমান্য করে দ্রুত গতিতে পালানোর চেষ্টা করে এবং একই সাথে তারা ডিবিকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে।
পরে ডিবিও পাল্টা গুলি চালালে মোটরসাইকেলসহ ৩ আরোহীই রাস্তায় পড়ে যায়। পরে দুজন দৌড়ে পলিয়ে যেতে সক্ষম হলেও গুলিবিদ্ধ এক যুবক ঘটনাস্থলেই পড়ে থাকে।
ওই যুবককে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। পরে মোস্ট ওয়ান্টেড ৬ জঙ্গির ছবির সাথে মিলিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়, নিহত ব্যক্তিই এবিটির সামরিক শাখার শীর্ষ নেতা শরিফুল ওরফে শরীফ ওরফে হাদি-১।
সকালে উপ-কমিশনার মাশরুকুর রহমান খালিদ সংবাদকর্মীদের বলেন, “লেখক-ব্লগার হত্যার যতগুলো ঘটনা ঘটেছে ‘তার প্রত্যেকটি’ শরীফ জানত। প্রকাশক টুটুল হত্যাচেষ্টার দিন লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ের বাইরে সে অবস্থান করছিল। ব্লগার নীলাদ্রি নিলয়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রিয়াজ মোর্শেদ বাবু হত্যার মিশনেও সে সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিল।”
গত ১৯ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ওয়েবসাইটে মোস্ট ওয়ান্টেড ছয় জঙ্গির নাম-ঠিকানা ও ছবি প্রকাশ করে। তারা হল— শরীফ, সেলিম, সিফাত, রাজু, শিহাব ও সাজ্জাদ। ওই ছয় জঙ্গির প্রথমেই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত শরীফের নাম ছিল।
ডিএমপির ওয়েবসাইটে শরীফকে এবিটির গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সংগঠক উল্লেখ করে বলা হয়, সে সংগঠনে শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে শরিফ ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদি-১ নামে পরিচিত। তার বাড়ি বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে। সে সংগঠনের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া ছাড়াও আইটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো কথিত বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনাকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে আসছে।
শনিবার সকালে মাদারীপুরে শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর উপর হামলার সময় হাতেনাতে আটক ‘শিবিরকর্মী’ গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিমও কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।
ওই ঘটনায় ‘বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা’ করে সরকার প্রকৃত ঘটনা ‘আড়ালের’ চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি।
রোববার দুপুরেও মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘ওই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। রিমান্ডে থাকা কাউকে এভাবে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
তবে একইদিন ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেছেন, ‘পুলিশের কাছে সরকারি অস্ত্র থাকার পরেও তারা যদি আক্রান্ত হয়, সেটা হয় না। আইন অনুযায়ীও বিষয়টি যায় না। কর্তব্যরত অবস্থায় আক্রান্ত হলে পুলিশ অবশ্যই পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’

রাজধানী এর আরো খবর