শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯
logo
চট্টগ্রামের লোকশিল্পী আমানউল্লাহ গায়েন আর নেই
প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০১৬ ১০:৩৮:২৫
প্রিন্টঅ-অ+
চট্টলা ওয়েব

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার ও গায়ক, নিভৃতচারী লোকশিল্পী আমানউল্লাহ গায়েন আর নেই। বুধবার রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। বুধবার সন্ধ্যার দিকে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসরারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি স্ত্রী, তিনি ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কক্সবাজারের সংস্কৃতি অঙ্গণে। তার মৃত্যুর খবর শুনে অসংখ্য ভক্ত, অনুরাগী গতকাল রাতেই কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভীড় করেন। ছুটে যান কক্সবাজারের সংস্কৃতি সংগঠক, নবীন-প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠেনের নেতারা।
কক্সবাজার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নজিবুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমানউল্লাহ গায়েনের মৃত্যুতে শুধু কক্সবাজার নয় বাংলাদেশ একজন গুণী মরমী শিল্পীকে হারালো। আমরা আমাদের প্রবীন এ শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’
আজ দুপুর ১২টায় সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মীদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ দৌলত ময়দানে আমানউল্লাহ গায়েনের মরদেহ আনা হবে বলেও জানান নজিবুল ইসলাম। তিনি জানান, দুপুর ২টার দিকে শহীদ দৌলত ময়দানেই তার জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে বেলা ১১টার দিকে কক্সবাজার বেতার প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন আমানউল্লাহ গায়েনের ছেলে শিল্পী তারিক নিপান হাসান।   
গত ১৭ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আমান উল্লাহ গায়েন
এদিকে আমানউল্লাহ গায়েনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক সাংবাদিক কামাল লোহানী ও সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার।
তারা এক শোক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমানউল্লাহ গায়েনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশ এক সম্পদকে হারালো। তার অসাধারণ মরমী, বিচ্ছেদী, মারফতি ও খেটে খাওয়া মানুষের সংগ্রাম নিয়ে রচিত গানগুলো বাংলাগানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে গেছে। অথচ তিনি ছিলেন নিভৃতচারী শিল্পী।’
তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ‘গত ডিসেম্বরে আমানউল্লাহ গায়েন উদীচীর জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসেছিলেন ঢাকায়। সেটিই ঢাকায় তার শেষ আগমন। উদীচী কর্মীদের সঙ্গে তার প্রচুর আনন্দমুখর স্মৃতি জমা হয়েছে ওই সম্মেলনের সুবাদে। তার মৃত্যুতে সারাদেশের উদীচীর বন্ধুরা শোকাহত।’    
আমানউল্লাহ গায়েনের জন্ম ১৯৩৬ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার মরিচ্যা গ্রামে। তারা বাবা হাবিবুল্লাহ ও মা ছিলেন গুলফরাজ বেগম। ছোটবেলা থেকেই গানের জন্য ঘরছাড়া হয়েছিলেন আমানউল্লাহ গায়েন। মানচিত্র না মানা বাউণ্ডুলে স্বভাবের এ গায়েন ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ-দেশান্তর। বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন গান নিয়ে। এরপুর ছুটে গেছেন বার্মায়, বার্মা থেকে ছুটে গেছেন ভারতেও। সবসময় হাতে থাকতো একটা মেন্ডোলিন। সেই মেন্ডালিনের তারে ঝংকৃত হতো চাটগাঁ ভাষার সব জনপ্রিয় গান। দেশের একসময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সোলস গেয়েছিল তার গান ‘আইচ্চা পাগল মনরে, দিন গেলে তুই ঘাড়ত বই বই হান্দিবি।’ এছাড়া তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- ‘ও, হালাচান গলার মালা, পেট পুরেদ্দে তোয়াঁরলায়’, ‘গুরাপুতু ঘুম যা, ঘুম যা’ ইত্যাদি।
যে ক’জন শিল্পীকর্মীদের উপর নির্ভর করে কক্সবাজার বেতার যাত্রা শুরু করেছিল আমানউল্লাহ গায়েন তাদের একজন। শেষ বয়সে এসে তিনি কক্সবাজার বেতারে মেন্ডোলিন বাজাতেন। এছাড়া তিনি বেতারের তালিকভূক্ত একজন শিল্পীও ছিলেন। ঘরহারা এ শিল্পী থাকতেন কক্সবাজার লিঙ্করোডস্থ বেতারের কোয়ার্টারেই।   
তার সন্তান কক্সবাজারের জনপ্রিয় শিল্পী তারিক নিপান হাসান বাংলামেইলকে বলেন, ‘বাবা প্রায় ৭শ গান লিখে গেছেন। অক্ষরজ্ঞান ভাল না থাকাতে এসব গান তিনি লিখে যেতে পারেন নি। সব গান তার সবসময় মনেও থাকতো না। তবে গ্রামগঞ্জে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরতো সেসব গান। আমি তার প্রায় দেড়শ গান সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেছি। মানুষের মুখে মুখে ফেরা বা সেই সময় অনেকের কাছে থাকা রেকর্ড থেকে বাবার আরো গানগুলো উদ্ধার করার চেষ্টা করব।’
আমানউল্লাহ গায়েন জীবদ্দশায় তার কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন কক্সবাজার শিল্পী সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমি পদক ও অন্তরা শিল্পীগোষ্ঠী সম্মাননা।

২য় রাজধানী এর আরো খবর